দেহরাদুন, ১ জানুয়ারি: চলতি মাসের শুরুতে দেহরাদুনে খুন হওয়া ত্রিপুরার ২৪ বছরের যুবক অঞ্জেল চাকমার পরিবার পুলিশের সেই দাবিকে জোরালোভাবে চ্যালেঞ্জ করেছে, যেখানে বলা হয়েছে এই হত্যাকাণ্ডে কোনও জাতিগত বা বর্ণবিদ্বেষমূলক গালিগালাজের ভূমিকা ছিল না। পুলিশের এই প্রাথমিক সিদ্ধান্ত ঘিরে তদন্তের সংবেদনশীলতা ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
অঞ্জেলের কাকা মোমেন চাকমা পুলিশের অবস্থান নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তদন্তের শুরুতেই এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো অত্যন্ত হতাশাজনক। তাঁর অভিযোগ, পুলিশ অঞ্জেলের ভাই ও ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী মাইকেল চাকমার বয়ানকে গুরুত্ব দিচ্ছে না।
মোমেন চাকমার কথায়, “মাইকেল শুধু পরিবারের সদস্য নয়, এই মামলার অভিযোগকারীও। সে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল এবং সবকিছু কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঘটে যায়। এমন পরিস্থিতিতে কেউ কীভাবে আশা করতে পারে যে সাধারণ মানুষ ভিডিও তুলে রাখবে?”
এদিকে, পরিবারের অভিযোগের জবাবে দেহরাদুনের সিনিয়র সুপারিনটেনডেন্ট অব পুলিশ (SSP) অজয় সিং জানান, মাইকেলের প্রাথমিক অভিযোগে ‘জাতিভিত্তিক গালিগালাজ’-এর কথা উল্লেখ থাকলেও ‘জাতিগত বা বর্ণবিদ্বেষমূলক’ শব্দের উল্লেখ ছিল না।
তিনি বলেন, “পরিবার ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেহরাদুনে ছিল, কিন্তু সেই সময়ে তারা জাতিগত গালির কথা পুলিশকে জানায়নি। যদি নতুন কোনও তথ্য থাকে, আমরা অবশ্যই তা তদন্তে অন্তর্ভুক্ত করব।”
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, চার্জশিট দাখিলের আগে প্রমাণ জোরদার করার কাজ চলছে। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশের দাবি, অভিযুক্তদের মধ্যে কয়েকজন মণিপুর ও নেপালের বাসিন্দা হওয়ায় ঘটনাটিকে বর্ণবিদ্বেষমূলক হামলা বলা যায় না। পুলিশের এই যুক্তি নিয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন ও সমাজকর্মীরা তীব্র আপত্তি তুলেছেন। তাঁদের বক্তব্য, ভারতের মতো বহুভাষিক ও বহুজাতিক সমাজে পরিচয়ের প্রশ্ন অত্যন্ত জটিল, একে এত সরলভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না।
পরিবারের দাবি অনুযায়ী, ৯ ডিসেম্বর জনবহুল এলাকায় ছয় জনের একটি দলের সঙ্গে অঞ্জেল ও তাঁর ভাই মাইকেলের বচসা হয়। অভিযোগ, অভিযুক্তরা ‘চিঙ্কি’, ‘চাইনিজ’, ‘মোমো’—এর মতো শব্দ ব্যবহার করলে ভাইরা প্রতিবাদ করেন, এরপরই পরিস্থিতি হিংসাত্মক হয়ে ওঠে। হামলায় গুরুতর জখম হন অঞ্জেল, যিনি পরে ২৬ ডিসেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। মাইকেলও আহত হন।
তবে এসএসপি অজয় সিং বলেন, “এখনও পর্যন্ত তদন্তে জাতিগত গালির প্রমাণ মেলেনি। অভিযুক্তরা নিজেদের মধ্যেই হালকা কথাবার্তা বলছিল, ভিড়ের চাপে বিভ্রান্তি তৈরি হয় এবং চাকমা ভাইরা মনে করেন কথাগুলো তাঁদের উদ্দেশে বলা হয়েছে। পুরো ঘটনা কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঘটে যায়।”
তিনি আরও জানান, একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠন করা হয়েছে পলাতক অভিযুক্ত যজ্ঞ আওয়াস্থিকে গ্রেফতারের জন্য। অভিযোগ, কাছের একটি ডিমের দোকান থেকে নেওয়া ছুরি দিয়ে তিনিই অঞ্জেলকে আঘাত করেন।
এদিকে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইয়ের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তের একটি আবেগঘন ভিডিও পোস্ট করে মাইকেল চাকমা সংবাদমাধ্যমকে তাঁকে আর সাক্ষাৎকারের জন্য চাপ না দেওয়ার অনুরোধ জানান। তিনি লেখেন,
“আমি বিনীতভাবে সব সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের অনুরোধ করছি, দয়া করে আমাকে আর সাক্ষাৎকারের জন্য চাপ দেবেন না। আমি আমার ভাইকে হারিয়েছি। এই ক্ষতি মেনে নেওয়ার চেষ্টা করছি।”
তিনি আরও বলেন, “আমি বারবার এই যন্ত্রণা অনুভব করার মতো মানসিক অবস্থায় নেই। আমাকে ও আমার পরিবারকে শোক পালন ও সুস্থ হওয়ার জন্য কিছুটা সময় ও জায়গা দিন। আই লাভ ইউ মেরে ভাই।”
এই ঘটনাকে ঘিরে পরিবার ও পুলিশের অবস্থানের ফারাক ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে বর্ণ ও জাতিগত সংবেদনশীলতা নিয়ে পুলিশের ভূমিকা কতটা যথাযথ, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। দেশজুড়ে এই মামলা ইতিমধ্যেই ব্যাপক জনমনোযোগ ও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।



















