মহিলাদের ঐতিহাসিক অংশগ্রহণের সাথে বুথ স্তর পর্যন্ত সংগঠন ও শরিকী সমন্বয় এনডিএ-কে বিহারে মসনদে ফিরিয়েছে

নয়াদিল্লি, ১৪ নভেম্বর : বিহারে এনডিএ যে ঐতিহাসিক জনাদেশ পেয়েছে, তা রাজনৈতিক মহলে বড় বিস্ময় তৈরি করেছে। একদিকে মহাগঠবন্ধনের ভয়াবহ পরাজয় নিয়ে আলোচনা চলছে। একইসাথে প্রশ্ন উঠছে, এনডিএ এমন বিশাল জয় কীভাবে পেয়েছে? রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এনডিএ অত্যন্ত হিসাবি কৌশল তৈরি করে তা মাঠে নিখুঁতভাবে প্রয়োগ করতে পেরেছে।

বিহারে বিধানসভা নির্বাচনে মহিলাদের ঐতিহাসিক অংশগ্রহণ বিরাট প্রভাব ফেলেছে। এই নির্বাচনে মহিলাদের ভোটিং নজিরবিহীন বলে আলোচনায় স্থান পেয়েছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এবার পুরুষের তুলনায় মহিলারা অধিক সংখ্যায় ভোটে অংশ নিয়েছেন। বিহারের অন্তত ৭টি জেলায় পুরুষদের চেয়ে ১৪ শতাংশ বা তার বেশি মহিলা ভোটার ভোট দিয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নারী–ক্ষমতায়ন ও সুরক্ষা নিয়ে এনডিএর প্রচার নারীদের মধ্যে আস্থা তৈরি করেছে। ফলে ভোটের দিন মহিলাদের ঢল এনডিএর পক্ষে বড় ফ্যাক্টর হয়েছে। তাছাড়া, ভোটের আগে মহিলাদের ১০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা এবং বৃদ্ধদের ভাতা বৃদ্ধি এনডিএ তথা নীতিশ কুমারের মাস্টার স্ট্রোক বলেই দেখা হচ্ছে।

এদিকে, বিরোধী দল সরকারবিরোধী ইস্যু তুললেও তা কার্যকর হয়নি। বরং এনডিএর সম্ভাব্য সবচেয়ে বড় দুর্বলতা পরিযায়ী শ্রমিকদের ব্যাপক রাজ্যন্তরী হওয়ার ঘটনা উল্টো এনডিএ-কে সুবিধা দিয়েছে। জানা যাচ্ছে, ছত্তিসগড়, মধ্যপ্রদেশ, উত্তর প্রদেশ–সহ বিভিন্ন রাজ্যে থাকা বিহারি শ্রমিকদের কাছে একাধিকবার বিজেপি কর্মীদের পাঠানো হয়েছে। কারা ভোট দিতে বিহারে ফিরবেন, তাঁদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। এ ছাড়া, অনেক পরিবারের নারী সদস্যরা নিজেদের স্বামীদের বাড়ি ফিরে এসে এনডিএকে ভোট দিতে উৎসাহ দিয়েছেন। এই ‘ঘরের সাথে যুক্ত করার রাজনীতি’ এনডিএ-কে বড় ফায়দা দিয়েছে।

মহাগঠবন্ধনের সঙ্গী কংগ্রেস পুরো প্রচারের মাঝখানে ভোট চোরি-কে বড় ইস্যু বানিয়েছে। তবে এটি প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। প্রথম দফার ভোটের আগের দিন রাহুল গান্ধীর অভিযোগ এবং দরভাঙায় তাঁর সভায় প্রধানমন্ত্রীর মাকে নিয়ে করা আপত্তিকর মন্তব্য, এই দুই বিতর্ককে বিজেপি বড় করে তুলে ধরেছে। কংগ্রেসকে ক্ষমা চাইতে বলা হয়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পুরো মহাগঠবন্ধনের ওপর পড়েছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নির্বাচনের ময়দানে এনডিএর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল বুথ–স্তরের নিখুঁত ব্যবস্থাপনা। বিজেপি, জেডিইউ, এলজেপি(আরভি), এইচএএম ও আরএলএসপি সবাই মিলেই সমন্বয় রেখে কাজ করেছে। অন্যদিকে, মহাগঠবন্ধন পুরো প্রচার জুড়ে অসংগঠিত, বিভক্ত ও দ্বন্দ্বে জর্জরিত ছিল। বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মনে করছেন, মহাগঠবন্ধন যদি একজোট হয়ে মজবুত কৌশলে লড়ত, ফলাফল পুরোপুরি বদলে যেতে পারত।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দাবি, বিরোধী শিবির যেসব ইস্যুতে লড়াই করছিল, তা জনমানসে প্রভাব ফেলতে ব্যর্থ হয়েছে। বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি, এসব বড় ইস্যু থাকলেও তা শক্তিশালী প্রচারের রূপ নিতে পারেনি। এদিকে, এনডিএ নিয়মিত যোগাযোগ, বাড়ি–বাড়ি পৌঁছে যাওয়া ও নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক প্রচারের মাধ্যমে ভোট ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। সব মিলিয়ে এনডিএর পরিকল্পনা ও সংগঠন ক্ষমতাই বিহারে ২০২৫-এর নির্বাচনে তাদের জয়কে অভূতপূর্ব উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।