আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতের আত্মনির্ভরতার উপর জোর, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে স্বেচ্ছাচারিতার আহ্বান

নয়াদিল্লি, ২৮ আগস্ট : নয়া দিল্লিতে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস)-এর শতবর্ষ উদ্যাপন উপলক্ষে আয়োজিত তিন দিনের বক্তৃতা সিরিজের দ্বিতীয় দিনে সংঘ প্রধান মোহন ভাগবত আত্মনির্ভরতা এবং স্বদেশী ধারণাকে কেন্দ্র করে একটি সুস্পষ্ট বার্তা দেন। ‘সংঘের ১০০ বছরের যাত্রা – নতুন দিগন্ত’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠান বুধবার অনুষ্ঠিত হয় রাজধানীর বিজ্ঞান ভবনে, যেখানে উপস্থিত ছিলেন বিশ্বের ৫৫টিরও বেশি দেশের কূটনীতিক এবং ৩০টির বেশি আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা। এদিনের বক্তৃতায় মোহন ভাগবত বলেন, ভারতের জাতীয় নীতিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এমনভাবে হওয়া উচিত, যা সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় এবং স্বাধীন সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে হয় — কোনও রকম বিদেশি চাপের ফলে নয়। তাঁর এই বক্তব্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ৫০ শতাংশ আমদানি শুল্কের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, যা একই দিন থেকে কার্যকর হয়েছে এবং ভারত-মার্কিন বাণিজ্য সম্পর্কে নতুন উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “আমরা কেন সেইসব পণ্য আমদানি করব, যা আমাদের দেশে উৎপাদন করা সম্ভব? কেবলমাত্র সেই সমস্ত জীবনধারনের জন্য অপরিহার্য বস্তু আমদানি করাই যুক্তিযুক্ত, যা দেশীয়ভাবে উৎপাদিত হয় না।”

মোহন ভাগবতের ভাষণে আত্মনির্ভরতাকে স্বদেশী নীতির কেন্দ্রে রেখে বলা হয় যে, আত্মনির্ভরতা মানে কোনওভাবেই আমদানি বন্ধ করে দেওয়া নয় বা বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া নয়। বরং বিশ্ব যে পারস্পরিক নির্ভরতার ভিত্তিতে চলে, তা স্বীকার করেই রফতানি-আমদানি অব্যাহত থাকবে। তবে তাতে যেন কোনও দেশ রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ না করে — এটাই হওয়া উচিত ভারতীয় নীতির অন্যতম স্তম্ভ। তিনি ব্যাখ্যা করেন, প্রকৃত স্বদেশী মানে নিজের পণ্যকে প্রাধান্য দিয়ে জাতীয় অর্থনীতিকে মজবুত করা, সেই সঙ্গে বিশ্বের সঙ্গে এমন বাণিজ্যিক সম্পর্ক রাখা, যা সম্মানের এবং সমতার ভিত্তিতে গঠিত। সংঘ প্রধান আত্মনির্ভরতার গোড়ার কথা বলেন পরিবার ও গ্রাম স্তর থেকে, যেখানে মানুষের চাহিদা, উৎপাদন ও বিনিময়ের মাধ্যমে এক ‘ধার্মিক অর্থনীতি’র ভিত্তি গড়ে তোলার কথা তিনি বলেন।

মোহন ভাগবত তাঁর বক্তৃতায় মহাত্মা গান্ধীর “সপ্ত সামাজিক পাপ”-এর প্রসঙ্গ তোলেন — যার মধ্যে ছিল নীতিহীন রাজনীতি, নৈতিকতাবিহীন বাণিজ্য এবং আত্মত্যাগবিহীন ভোগের প্রবণতা। তিনি বলেন, “সংযম ও ত্যাগ ছাড়া কোনও সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। অর্থনৈতিক উন্নয়ন তখনই টেকসই হবে, যখন তা নৈতিকতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের ভিত্তিতে গঠিত হবে।” তিনি এই প্রসঙ্গে ধর্মীয় আচরণ প্রসঙ্গেও বলেন, “ধর্ম প্রচারের বিষয় নয়, বরং তা নিজের জীবনে পালন করার বিষয় — যার মাধ্যমে এমন একটি উদাহরণ স্থাপন করা যায়, যা গোটা বিশ্ব অনুসরণ করতে পারে।”

এই বক্তৃতা আরএসএস-এর ভবিষ্যৎ দর্শনের একটি দিক নির্দেশ করে, যেখানে আত্মনির্ভর ভারত একটি ধার্মিক ও নৈতিক বিশ্বব্যবস্থার প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দেবে। এই বক্তব্যের মাধ্যমে সংঘ প্রধান একদিকে যেমন ভারতের নিজস্ব ক্ষমতা এবং উৎপাদনের উপর ভরসা রাখার বার্তা দেন, তেমনই বিশ্বমঞ্চে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে অংশগ্রহণেরও আহ্বান জানান — যা সংঘের শতবর্ষ উদ্যাপনের সময়ে এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বার্তা হিসেবেই ধরা পড়ছে।