পাঞ্জাবে বন্যা পরিস্থিতি উদ্বেগজনক: সতর্কতায় একাধিক জেলা, নদীগুলি প্রবল স্রোতে বিপদসীমার ওপরে

চণ্ডীগড়, ২৭ আগস্ট: টানা বৃষ্টির ফলে পাঞ্জাব জুড়ে বন্যা পরিস্থিতি মারাত্মক রূপ নিয়েছে। রাজ্যের প্রধান জলাধারগুলি—ভাকরা, পং, রঞ্জিত সাগর ও শাহপুর কান্ডি ড্যাম—তাদের সর্বোচ্চ অনুমোদিত জলস্তরের কাছাকাছি কিংবা তা ছাড়িয়েছে। এই অবস্থায় শুত্রুবার সকাল থেকে পাঞ্জাবের পাঠানকোট, গুরুদাসপুর, হোশিয়ারপুর, কপুরথলা ও ফিরোজপুর জেলা প্রশাসন হাই অ্যালার্ট জারি করেছে। ভারতীয় আবহাওয়া দপ্তর আগামী ২৪ ঘণ্টায় ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে, ফলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ভাকরা ড্যামের সর্বোচ্চ জলস্তর ১৬৮০ ফুট হলেও মঙ্গলবার সকালে তা ছিল ১৬৭১.৪৯ ফুট, মাত্র ৯ ফুট কম। ওই সময়ে ইনফ্লো ছিল ৩৯,১৩৩ কিউসেক, আর আউটফ্লো ছাড়িয়েছে ৪৩,৮০০ কিউসেক। পং ড্যাম (সর্বোচ্চ ১৩৯০ ফুট) ইতিমধ্যেই পূর্ণ ক্ষমতা ছাড়িয়ে গিয়ে ১৩৯৩.১৩ ফুটে পৌঁছেছে। ইনফ্লো ছিল ১.৯২ লক্ষ কিউসেক এবং আউটফ্লো ছুঁয়েছে ৯৪,৮৪৫ কিউসেক, যা বিস্তীর্ণ বিস-ক্যাচমেন্ট এলাকায় ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করছে। রঞ্জিত সাগর ড্যামেও জলস্তর ৫২৬.৬৭ মিটার পৌঁছেছে (সর্বোচ্চ ৫২৭.৯১ মিটার)। এর আউটফ্লো হয়েছে ২ লক্ষ কিউসেক, যা রবি নদীর ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করছে।

সুতলজ ও বেয়াস নদী সংলগ্ন অঞ্চলগুলি জলের চাপে বিপর্যস্ত। গিদ্দারপিণ্ডি এলাকায় সুতলজ নদীর প্রবাহ ছিল ৫৭,৯০০ কিউসেক। হারিকে এলাকায় (যেখানে সুতলজ ও বেয়াস একত্রিত হয়) বুধবার সকালেই জলস্তর পৌঁছায় ২.৬০ লক্ষ কিউসেক। হুসাইনিওয়ালার ডাউনস্ট্রিম, যেখানে জল পাকিস্তানের দিকে প্রবাহিত হয়, সেখানে জলের প্রবাহ রাতারাতি ২.৪৬ লক্ষ কিউসেক থেকে বেড়ে ২.৫৭ লক্ষ কিউসেকে পৌঁছায়। ঘগ্ঘর নদী, যা সাধারণত শান্ত থাকে, সেখানে সর্দুলগড় ব্রিজে জলের প্রবাহ ২৮,৪৮০ কিউসেক ছাড়িয়েছে।

নওশেরা মিরথলে বেয়াস নদীতে ৭০,০০০ কিউসেক জল প্রবাহিত হয়েছে। পাশি ও ধিলওয়ান এলাকায় ১.৮৫ থেকে ১.৬৭ লক্ষ কিউসেক প্রবাহ রেকর্ড হয়েছে। মাধোপুর এলাকায় রবি নদীর জলপ্রবাহ ২.১২ লক্ষ কিউসেকে পৌঁছেছে। রবি নদীর উপনদী উঝ-এ প্রবাহ হয়েছে ২.৫ লক্ষ কিউসেক, যা রবি নদীর জলস্তর আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

ড্রেনেজ বিভাগ জানিয়েছে, রোপড়-ফিল্লৌর অঞ্চলে সুতলজ নদীর জল বাড়ছে। গিদ্দারপিণ্ডি-ইউসুফপুর সেক্টরে ৫৭,৯০০ কিউসেক জল প্রবাহিত হচ্ছে, ফলে প্রায় ৩৫,০০০ একর কৃষিজমি ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা। হারিকে-হুসাইনিওয়ালা অঞ্চলেও পরিস্থিতি সঙ্কটজনক হয়ে উঠছে। প্রশাসনের মতে, যদি বর্ষণ এই হারে চলতে থাকে, তবে পাঞ্জাবের দোয়াবা ও মালওয়া অঞ্চলের বাঁধে ফাটল ধরার আশঙ্কা অস্বীকার করা যায় না।

পাঞ্জাব, হিমাচল প্রদেশ ও হরিয়ানায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ ২৪ ঘণ্টা নজরদারিতে রয়েছে। নিচু এলাকা থেকে মানুষকে সরানো এবং বিপদাপন্ন বাঁধগুলিতে বালির বস্তা বসানোর কাজ শুরু হয়েছে। নদীতীরবর্তী অঞ্চলের বাসিন্দাদের উঁচু স্থানে চলে যাওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে এবং নদীর ব্রিজের আশেপাশে অপ্রয়োজনীয় চলাচল থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।

এনডিআরএফ, সেনা ও অন্যান্য সংস্থার যৌথ উদ্ধার অভিযান চলছে। বুধবার অমৃতসর (গ্রামীণ) জেলার এসএসপি মনিন্দর সিং জানান, অজনালার প্লাবিত এলাকায় উদ্ধারকাজ চালাতে নৌকা নামানো হয়েছে। অমৃতসর ডেপুটি কমিশনার সাক্ষী সওহনি এলাকা পরিদর্শনে যান। পাঠানকোট জেলায় রবি নদীর জল বৃদ্ধি পেয়ে ভারত-পাক সীমান্ত সংলগ্ন বহু গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।

সুজানপুর, আটেপুর ও বাহেরি অঞ্চলে উদ্ধারকাজে এনডিআরএফ মোতায়েন করা হয়েছে। পাঠানকোট ডেপুটি কমিশনার আদিত্য উপ্পল সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন এবং জরুরি সহায়তার জন্য কন্ট্রোল রুমে যোগাযোগ করতে বলেছেন। পাঠানকোটে ‘সৎসঙ্গ বেয়াস সেন্টার’ ও ‘গোসাইপুর’-এ দুটি ত্রাণ শিবির খোলা হয়েছে।

পং, ভাকরা ও রঞ্জিত সাগর ড্যাম থেকে অতিরিক্ত জল ছাড়ার কারণে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। হিমাচল প্রদেশ ও জম্মু-কাশ্মীরের ক্যাচমেন্ট এলাকায় টানা বর্ষণের ফলে সুতলজ, বেয়াস ও রবি নদী তীরবর্তী পাঞ্জাবের বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বহু নিচু এলাকা ও কৃষিজমি ইতিমধ্যেই জলের নিচে চলে গেছে।

সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলি হল পাঠানকোট, গুরুদাসপুর, ফাজিলকা, কপুরথলা, তরণ তারণ, ফিরোজপুর ও হোশিয়ারপুর। প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সর্বাত্মক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।