ওয়াশিংটন/নয়াদিল্লি, ৬ আগস্ট : রাশিয়ার সঙ্গে ব্যবসা করা দেশগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর আর্থিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি জারি রেখেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে এবার কিছুটা সুর নরম করলেন তিনি। মঙ্গলবার এক সাংবাদিক সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, “আমি কখনো নির্দিষ্ট হার (শুল্কের) কথা বলিনি। কিন্তু আমরা এর ওপর কাজ করছি, বেশ কিছু কিছু পদক্ষেপ নেব। সামনে কয়েকদিনেই দেখা যাবে কী হয়।”
এই বক্তব্য এমন সময়ে এসেছে, যখন মাত্র কয়েকদিন আগেই ট্রাম্প সরাসরি ভারতকে রাশিয়া থেকে জ্বালানি এবং অস্ত্র কেনার জন্য দায়ী করে বলেছিলেন, ভারতই এখন রাশিয়ার “সবচেয়ে বড় শক্তি ক্রেতা”। এরপরেই তিনি ভারতের ওপর ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক ঘোষণা করেন, এবং হুমকি দেন যে আরও বেশি শুল্ক আরোপ করা হতে পারে।
ট্রাম্প মঙ্গলবার বলেন, “আমি কোনো নির্দিষ্ট শতাংশ বলিনি। তবে আমরা কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছি। আগামী কিছু সময়ের মধ্যেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে।” তিনি এ কথাগুলি বলেন একটি সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে, যিনি জানতে চেয়েছিলেন ট্রাম্প আদৌ কি তার আগের হুমকি অনুযায়ী “রাশিয়ান জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোর ওপর ১০০ শতাংশ ট্যারিফ” চাপাবেন কিনা। উল্লেখ্য, এই হুমকির আওতায় ভারতের পাশাপাশি চীনের নামও উঠে আসে।
তবে কিছুটা বিরোধাভাস থেকেই যায়, কারণ গত মাসে ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেছিলেন, রাশিয়া যদি ৫০ দিনের মধ্যে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে শান্তিচুক্তি না করে, তাহলে তিনি রাশিয়ার ওপর সরাসরি ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবেন এবং সেইসঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক রাখা দেশগুলোর ওপর “সেকেন্ডারি ট্যারিফ” প্রয়োগ করবেন।
এদিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানান, বুধবার রাশিয়ান কর্মকর্তাদের সঙ্গে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক নির্ধারিত রয়েছে, যেখানে এই ‘সেকেন্ডারি স্যাংশন’ বা গৌণ নিষেধাজ্ঞা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বৈঠকে অংশ নিতে মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ রাশিয়ায় যাচ্ছেন বলেও জানানো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা ভারত-আমেরিকা কূটনৈতিক সম্পর্কে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে নয়াদিল্লি কঠোর বিবৃতি জারি করে জানায়, রাশিয়া থেকে জ্বালানি কেনা ভারতের জন্য একটি “জাতীয় বাধ্যবাধকতা”, কারণ ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ঐতিহ্যবাহী জ্বালানি উৎসগুলো ইউরোপে চলে যাওয়ায় ভারত বিকল্প খুঁজে পেতে বাধ্য হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, “যুক্তরাষ্ট্র তখন ভারতকে রাশিয়ান তেল কিনতে সক্রিয়ভাবে উৎসাহিত করেছিল, যাতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে স্থিতি বজায় থাকে।”
বিষয়টি নিয়ে ট্রাম্পকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “আমি এ বিষয়ে কিছু জানি না। বিষয়টি খতিয়ে দেখে জানাব।” ট্রাম্পের এই মন্তব্য, বিশেষজ্ঞদের মতে, বোঝায় যে হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরীণ অবস্থানের সঙ্গেও তার বক্তব্য সব সময় মেলে না।
ট্রাম্পের মন্তব্য ও চাপের মাঝেই ভারত ও রাশিয়া নিজেদের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও গভীর করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। রাশিয়ার উপ-প্রতিরক্ষা মন্ত্রী কর্নেল জেনারেল আলেকজান্ডার ফোমিন এবং ভারতে নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূত বিনয় কুমারের মধ্যে মস্কোতে এক বৈঠকে এই বার্তা দেওয়া হয়। রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, “দুই পক্ষ প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে এবং বিদ্যমান কৌশলগত অংশীদারিত্ব আরও দৃঢ় করার অঙ্গীকার করে।”
২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারত রাশিয়া থেকে ৫০.২ বিলিয়ন ডলারের তেল কিনেছে, যা রাশিয়ার অন্যতম প্রধান জ্বালানি ক্রেতা হিসেবে ভারতের অবস্থানকে স্পষ্ট করে তোলে। অথচ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন নিজেরা এখনো রাশিয়া থেকে ইউরেনিয়াম, সার এবং রাসায়নিক পণ্য আমদানি করছে — এ বিষয়টিও ভারতের তরফ থেকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
সার্বিকভাবে, ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান ভারতের কূটনৈতিক কৌশলের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হোয়াইট হাউস এখনও পর্যন্ত ভারতের ‘স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি’ বা কৌশলগত স্বাধীনতার বিষয়টিকে যথাযথভাবে স্বীকার করছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অবস্থান যদি দীর্ঘমেয়াদে বজায় থাকে, তবে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হতে পারে।
বর্তমানে ভারত নিজের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক স্বার্থে নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু ট্রাম্পের পুনরায় হুমকিমূলক নীতি ও শুল্ক আরোপের কৌশল সেই অবস্থানকে কঠিন করে তুলতে পারে বলেই আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা।

