ব্যাংকক/নমপেন, ২৭ জুলাই— থাইল্যান্ড এবং কম্বোডিয়া তাদের বিতর্কিত সীমান্তে চলমান সহিংসতা থামাতে অবশেষে যুদ্ধবিরতি আলোচনায় বসতে সম্মত হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ এবং সংকট সমাধানের জন্য কড়া সতর্কবার্তা দেওয়ার পর উভয় দেশ এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত ৩৪ জন নিহত এবং ১ লাখ ৬৮ হাজারেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে, এর মধ্যে অনেক বেসামরিক নাগরিকও রয়েছেন। তবে, যদিও উভয় দেশ যুদ্ধবিরতি আলোচনার জন্য সম্মত হয়েছে, রবিবার পর্যন্ত সংঘাতের কিছু অংশে গোলাবর্ষণ অব্যাহত ছিল এবং নতুন অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছিল।
থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার মধ্যে চলমান সীমান্ত বিরোধ আবারও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে গত বৃহস্পতিবার। ওই দিন, সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় একটি ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে পাঁচজন থাই সেনা আহত হন। এরপর উভয় দেশ একে অপরকে দায়ী করে পরিস্থিতি আরও উত্তেজিত করে এবং সীমান্তে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন শুরু হয়। এ ঘটনার পর থাইল্যান্ড কম্বোডিয়ার সাথে তাদের সীমান্ত পারাপার বন্ধ করে দেয় এবং উভয় দেশ তাদের রাষ্ট্রদূতদের প্রত্যাহার করে নেয়।
শনিবার, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম “ট্রুথ সোশ্যাল”-এ একটি পোস্টে জানান, তিনি থাইল্যান্ড এবং কম্বোডিয়ার নেতাদের সাথে কথা বলেছেন এবং উত্তেজনা কমানোর জন্য হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। ট্রাম্প বলেন, “যদি এই সংঘাত চলতে থাকে, তবে আমি উভয় দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আর এগোতে রাজি নই।” তিনি জানান, থাইল্যান্ডের ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী ফুমথাম ওয়েচায়াচাই এবং কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন মানেতের সাথে আলোচনা করে উভয় দেশের মধ্যে শান্তির জন্য পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, থাইল্যান্ড এবং কম্বোডিয়া উভয়ই যুদ্ধবিরতি চাচ্ছে এবং আলোচনায় বসতে প্রস্তুত। ট্রাম্প বলেন, “কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে থাইল্যান্ডের সাথে যুদ্ধ বন্ধ করার বিষয়ে আমি কথা বলেছি। থাইল্যান্ডও শান্তি চায়, এবং তারা দ্রুত যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে।”
কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন মানেত রবিবার তার একটি বিবৃতিতে জানান, তার দেশ “অবিলম্বে এবং শর্তহীনভাবে যুদ্ধবিরতি” মানতে প্রস্তুত। তিনি জানান, ট্রাম্পের হস্তক্ষেপের পর থাইল্যান্ডও হামলা বন্ধ করতে রাজি হয়েছে। হুন মানেতের দাবি, এটি উভয় দেশের সৈন্য ও জনগণের জন্য একটি ইতিবাচক খবর, এবং তিনি পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সাথে আলোচনা শুরু করেছেন।
থাই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবশ্য আরও সতর্ক ভাষায় মন্তব্য করে। তাদের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, থাইল্যান্ড নীতিগতভাবে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও, তাদের মূল উদ্বেগ হলো কম্বোডিয়ার পক্ষ থেকে শান্তির উদ্দেশ্য ও সদিচ্ছার প্রশ্ন। থাইল্যান্ডের মতে, আলোচনা শুরু না হওয়া পর্যন্ত সংঘাত থামানো সম্ভব নয়। থাই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাও জানিয়েছে, তারা শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য দ্রুত দ্বিপাক্ষিক আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে।
যুদ্ধবিরতি আলোচনার প্রেক্ষিতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা শুরু হলেও, রবিবারেও থাইল্যান্ড এবং কম্বোডিয়ার সীমান্তের কিছু অংশে সংঘর্ষ চলতে থাকে। উভয় পক্ষই একে অপরকে গোলাবর্ষণ এবং সেনা মোতায়েনের জন্য দায়ী করেছে। থাই সেনাবাহিনীর উপ-মুখপাত্র কর্নেল রিচা সুকসোভাননট জানিয়েছেন, কম্বোডিয়ার বাহিনী সুরিন প্রদেশে বেসামরিক এলাকায় ভারী কামান ব্যবহার করেছে। পাল্টা জবাবে, থাই বাহিনী কম্বোডিয়ার রকেট লঞ্চার ধ্বংস করেছে। রিচা আরও বলেন, “যতক্ষণ না কম্বোডিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা শুরু করে, ততক্ষণ এই সংঘাত থামানো সম্ভব নয়।”
কম্বোডিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল মালি সোচেটা জানিয়েছেন, থাই বাহিনী কম্বোডিয়ার ভূখণ্ডে বোমাবর্ষণ করেছে, যার ফলে সহিংসতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি থাই বাহিনীর বিরুদ্ধে বড় আকারে সৈন্য পাঠানোর অভিযোগ করেন, যা শান্তিপূর্ণ সমাধানের প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করছে।
থাইল্যান্ড এবং কম্বোডিয়ার সীমান্ত অঞ্চলে সংঘর্ষের কারণে ব্যাপক মানবিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে। থাইল্যান্ডে ২০ জন নিহত এবং কম্বোডিয়ায় ১৩ জন নিহত হয়েছে। নিহতদের বেশিরভাগই বেসামরিক নাগরিক। থাইল্যান্ডে ১ লাখ ৩১ হাজারেরও বেশি মানুষ নিরাপদ স্থানে পালিয়ে গেছে এবং কম্বোডিয়ার তিনটি প্রদেশ থেকে ৩৭ হাজারেরও বেশি মানুষ সরে গেছে। বহু গ্রাম বর্তমানে জনশূন্য, এবং স্কুল ও হাসপাতালগুলো বন্ধ রয়েছে।
সুরিন প্রদেশে, যেখানে ব্যাপক গোলাবর্ষণ হয়েছে, আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দা পিচায়ুত সুরাসিত জানান, তিনি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তার পরিবারকে রক্ষায় ব্যাংকক থেকে বাড়ি ফিরে আসেন। তিনি বলেন, “খবর শুনে আমি কাজে মনোযোগ দিতে পারছিলাম না। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাড়ি ফিরতে চেয়েছিলাম।”
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ দুই দেশকে আঞ্চলিক শান্তির জন্য আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ক্লাস্টার যুদ্ধাস্ত্রের ব্যবহারের নিন্দা জানিয়ে বলেছে, এ ধরনের অস্ত্র ব্যবহার আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন। তারা উভয় দেশের সরকারের কাছে বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।
থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়া দীর্ঘদিন ধরে সীমান্ত নিয়ে বিরোধে জড়িত। ৮০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সীমান্ত বেশ কয়েকটি পুরোনো মন্দিরের মালিকানা নিয়ে বিতর্কিত। ১৯৫০ এর দশকে ফরাসি উপনিবেশিক শাসনকালে আঁকা মানচিত্রের কারণে এই বিরোধ সৃষ্টি হয়। অতীতে সীমান্তে সংঘর্ষ হলেও তা ছিল তুলনামূলকভাবে স্বল্পস্থায়ী। তবে, ২০১১ সালের পর থেকে প্রিয়া ভিহের মন্দির এবং তার আশপাশের এলাকায় বিভিন্ন সংঘর্ষের ফলে এই বিরোধ আবার তীব্র হয়।
বিশ্ব সম্প্রদায় এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সামনে এখনই একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। যদি উভয় দেশ সত্যিই শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথে এগিয়ে যায়, তবে পরিস্থিতি থামানো সম্ভব হতে পারে। কিন্তু যদি কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়, তাহলে সীমান্তে পরিস্থিতি আরও অবনতি হতে পারে, যার পরিণতি হতে পারে আঞ্চলিক অস্থিরতা।
2025-07-27

