তেহরান, ২২ জুন : ইরানের তিনটি প্রধান পারমাণবিক কেন্দ্রে যুক্তরাষ্ট্রের ‘বাঙ্কার-বাস্টিং’ বোমা হামলার জেরে বিশ্ব রাজনীতিতে উত্তেজনার পারদ চরমে। শনিবার রাতে ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বয় করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি এই হামলা চালায়। লক্ষ্যবস্তু ছিল ফোর্ডো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহান-এর গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনাগুলি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন, “এই অভিযানে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা চিরতরে ধ্বংস করা হয়েছে,” এবং আরও হামলার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “তেহরান যদি শান্তির পথে না আসে, তাহলে পরবর্তী ধাক্কা আরও বড় হবে।”
তবে ইরান দাবি করেছে, হামলার আগে পারমাণবিক কেন্দ্রে কর্মরত বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল, ফলে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি বলেন, “এই হামলা আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘ সনদ এবং এনপিটি চুক্তির সরাসরি লঙ্ঘন। এটা এক ভয়ঙ্কর নজির।” তিনি আরও বলেন, “ইরান তার সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য সব রকম প্রতিক্রিয়ার পথ খোলা রেখেছে।”
এরই মধ্যে ইরান জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠকের অনুরোধ জানিয়েছে। ১৫ সদস্যবিশিষ্ট পরিষদে তেহরানের দাবি, এই ‘অবৈধ ও আগ্রাসী হামলার’ উপযুক্ত আন্তর্জাতিক নিন্দা প্রয়োজন।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এক বিবৃতিতে বলেন, “আমি গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি, এই হামলা আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক। এর ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে এবং সাধারণ মানুষের ওপর বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।”
এদিকে রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের ডেপুটি চেয়ারম্যান এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ বিস্ফোরক দাবি করেছেন, এই হামলার পর একাধিক দেশ ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র সরবরাহে রাজি। তিনি বলেন, “হামলা ব্যর্থ হয়েছে। পারমাণবিক জ্বালানি চক্রের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো আঘাত পায়নি, এবং এখন বলতে দ্বিধা নেই—ইরান পরমাণু অস্ত্র উৎপাদনের পথে এগোচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, “এই হামলা বরং ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে আরও মজবুত করেছে। যারা আগে বিরোধিতা করতেন, তাঁরাও এখন ধর্মীয় নেতৃত্বের পক্ষে একত্র হচ্ছেন।”
হামলার পরপরই ইরান রাশিয়ার দিকে সাহায্যের হাত বাড়ায়। ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি মস্কো সফরে রওনা হন এবং ঘোষণা করেন, “রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হবে।” রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা এই হামলার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে এবং পারমাণবিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে রয়ে গেছে।
চীন এই হামলাকে ‘জাতিসংঘ সনদের সরাসরি লঙ্ঘন’ বলে অভিহিত করেছে। তারা এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, “এই হামলা মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বাড়াবে। চীন সমস্ত পক্ষকে আলোচনার পথে ফেরার আহ্বান জানাচ্ছে।”
হামাস এক বিবৃতিতে বলেছে, “আমরা ইরানের প্রতি সংহতি জানাচ্ছি। এই হামলা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবাদী মনোভাবের প্রতিফলন।” সৌদি আরব, কাতার, ওমান ও ইরাকের মতো দেশগুলোও পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে। ওমান, যেটি এতদিন মার্কিন-ইরান পারমাণবিক আলোচনার মধ্যস্থতাকারী ছিল, সরাসরি এই হামলার তীব্র সমালোচনা করে বলেছে, “এই ধরনের আগ্রাসী পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতাকে ধ্বংস করে দিতে পারে।”
ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি এবং ইতালি—সবাই ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফেরার আহ্বান জানালেও, মার্কিন হামলার বিষয়ে সরাসরি সমর্থন বা নিন্দা না করে কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিয়েছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেন, “ইরানের পরমাণু কর্মসূচি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি। তবে যুদ্ধ নয়, সমাধান দরকার আলোচনার মাধ্যমেই।”
ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জান-নোয়েল বারো মন্তব্য করেন, “টেকসই সমাধান কেবলমাত্র এনপিটি কাঠামোর মধ্যেই সম্ভব।” জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিক মার্জ আবার তেহরানকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ফিরতে বলেন। ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি বলেন, “এখন সময় যুদ্ধ নয়, বরং এক বিকল্প রাজনৈতিক পথ খোঁজার।”
হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভের ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফ্রিজ কড়া ভাষায় ট্রাম্প প্রশাসনের একতরফা পদক্ষেপের সমালোচনা করে বলেন, “এই সামরিক পদক্ষেপ কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই নেওয়া হয়েছে এবং এটি দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।”
মার্কিন মুসলিম অধিকার সংগঠন সিএআইএআর এই হামলাকে অবৈধ বলে দাবি করেছে, অন্যদিকে ইসরায়েলপন্থী লবি গোষ্ঠী এআইপিএসি ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়েছে। তারা বলেছে, “যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরানকে প্রতিহত করতে তার মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয় করে এগিয়ে যেতে হবে।”
জাপান, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, মেক্সিকো, চিলি, ভেনেজুয়েলা ও কিউবা—সব দেশই যুদ্ধ এড়িয়ে কূটনৈতিক সমাধানের পথকে অগ্রাধিকার দিতে আহ্বান জানিয়েছে। কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াজ-কানেল বলেন, “এই হামলা মানবতার জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।”
এই ঘটনার ফলে ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেল। এখন প্রশ্ন উঠেছে—এই সংঘাত বিশ্ব রাজনীতিকে কতটা বদলে দেবে? নতুন যুদ্ধের দ্বার কি খুলে গেল? জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের আসন্ন বৈঠকে এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজবে বিশ্ব। তবে স্পষ্ট, উত্তপ্ত মধ্যপ্রাচ্য এখন এক নতুন অগ্নিপরীক্ষার সামনে দাঁড়িয়ে।

