এসপ্লানেডের বাসগুমটি, দেড় দশকের জট নিষ্পত্তিতে ফের উদ্যোগী হাইকোর্ট

কলকাতা, ১০ জুন (হি. স.) : দেড় দশক আগের পরিবেশ-বিষয়ক আইনি নির্দেশ রূপায়ণ নিয়ে ফের উদ্যোগী হল আদালত। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল বাঁচাতে ২০০৭ সালে এসপ্লানেডের বাসগুমটিকে সরানোর নির্দেশ দেয় হাই কোর্ট। এর পর এক যুগ আগে, ২০১১-তে সর্বোচ্চ আদালত ওই নির্দেশ রূপায়ণের সঙ্গে ঐতিহ্যের ওই ভবন সংলগ্ন যান চলাচল কমানোর নির্দেশ দেয়। কিন্তু তা রূপায়িত হয়নি। উল্টে এসপ্লানেডে নির্মীয়মান মেট্রো প্রকল্পে একাধিক তলের পার্কিং ব্যবস্থা তৈরির পরিকল্পনা হচ্ছে।

এই অবস্থায় কলকাতা হাইকোর্ট ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হলের মার্বেলে যান দূষণের সম্ভাব্য খারাপ প্রভাব কমাতে ফের উদ্যোগী হয়েছে। ভিক্টোরিয়া যেখানে অবস্থিত সেই ময়দানের তত্ত্বাবধায়ক সেনাবাহিনীর মতামতও চেয়েছে আদালত। এই সঙ্গে ন্যাশনাল এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং রিসার্চ ইনস্টিটিউটকে (এনইআরআই) এসপ্ল্যানেড বা বাবুঘাটে একাধিক তলের একটি বাস পার্কিং ব্যবস্থা তৈরির সম্ভাব্যতা খতিয়ে দেখতে বলেছে। শনিবারই এনইআরআই (নিরি)-র কিছু বিশেষজ্ঞ বিষয়টি নিয়ে পারস্পরিক কথা বলেন।

এর আগে শুক্রবার বিষয়টির শুনানি ছিল বিচারপতি দেবাংশু বসাক ও বিচারপতি শম্পা সরকারের এজলাসে। যার পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মতলা বাসস্ট্যান্ডের বিকল্প পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করতে রাজ্য সরকারকে এগিয়ে আসতে বলে হাই কোর্ট। পাশাপাশি, হাই কোর্টের আইনজীবীদের গাড়ি রাখার জন্য কিরণশঙ্কর রায় রোডের এক জায়গায় পার্কোম্যাট তৈরির সুপারিশও করা হয়েছে।

এছাড়াও, শুক্রবার হাইকোর্ট শহরের কেন্দ্রে দূষণ কমাতে এ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ সরকার কী ব্যবস্থা নিয়েছে তা জানতে চেয়েছে। কলকাতা ট্র্যাফিক পুলিশকেও জিজ্ঞাসা করেছে যে যানজট কমাতে ট্র্যাফিক সঞ্চালন পরিকল্পনাটি পুনরায় চালু করা হয়েছে কিনা। সেই সঙ্গে ভিক্টোরিয়া সংলগ্ন এলাকার ট্র্যাফিক সিগন্যাল এমন ভাবে গড়ে তুলতে বলা হয়েছে, যাতে সেখানে স্টপেজ না থাকে বা যানবাহন বেশিক্ষণ না দাঁড়ায়। যানবাহন থামার অর্থই হল, সংলগ্ন এলাকায় ধোঁয়া-দূষণ বেড়ে যাওয়া।

ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হলের সাদা মার্বেলে দাগ হয়ে যাচ্ছিল। হাইকোর্ট ভবনটিকে রক্ষা করার জন্য এবং ময়দান এলাকায় দূষণ কমানোর বিষয়ে একটি জনস্বার্থ মামলার (পিআইএল) শুনানির সময় নিরি-কে জিজ্ঞাসা করে, দূষণ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য এসপ্ল্যানেডের বর্তমান বাস টার্মিনাসে বা বাবুঘাটে সবুজ অক্ষুন্ন রেখে বাসগুলির জন্য ভূগর্ভে একটি বহুতল পার্কিং ব্যবস্থা কি করা যেতে পারে?

এর আগে, মামলার আবেদনকারী পরিবেশ কর্মী সুভাষ দত্ত ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে দূষণের প্রভাব নিয়ে আপত্তি তুলেছিলেন। এনইআরআই (নিরি) রিপোর্টের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, যান দূষণের ‘কস্টিক ফ্যাক্টর’ স্মৃতিস্তম্ভকে প্রভাবিত করছে। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের আশেপাশে যানের সংখ্যা ন্যূনতম হওয়া উচিত। ভারী যানবাহনের উপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার আবশ্যিকতার কথা তিনি বলেন। তিনি আদালতকে বলেন যে এই কারণেই ‘নিরি’ পরামর্শ দিয়েছিল প্রস্তাবিত বাস টার্মিনাসটি ভিক্টোরিয়ার মেমোরিয়াল থেকে দূরে স্থানান্তর করা উচিত।

রাজ্য দূষণ প্রতিরোধ এবং ঐতিহাসিক স্মৃতিসৌধ সংরক্ষণের জন্য নিরি-র সুপারিশ বাস্তবায়নের বিষয়ে নীরব ছিলেন। এই অভিযোগ করে সুভাষবাবু বলেন সাঁতরাগাছিতে একটি বাস টার্মিনাস তৈরি করা হয়েছে। সেখানে এসপ্ল্যানেড এবং বাবুঘাট থেকে বাসগুলিকে স্থানান্তরিত করার কথা হলেও স্থানান্তর করা হয়নি। আগের আদেশে, হাইকোর্ট ‘নিরি’ অধ্যয়নের উল্লেখ করে ব্যাখ্যা করেছিল কীভাবে যানদূষণ ভিক্টোরিয়ার মার্বেলগুলির ক্ষতি করছে।

প্রসঙ্গত, ধোঁয়ার দূষণ থেকে ঐতিহ্যশালী ভিক্টোরিয়াকে রক্ষা করার জন্য ধর্মতলা বাসস্ট্যান্ড স্থানান্তরিত করার সুপারিশ করেছিল নিরি। তারই ভিত্তিতে দায়ের মামলার প্রেক্ষিতে সেই ২০০৭ সালে ওই বাসস্ট্যান্ডকে সরানোর নির্দেশ দিয়েছিল হাই কোর্ট। রাজ্য সরকার সুপ্রিম কোর্টে স্পেশাল লিভ পিটিশন (এসএলপি) পেশ করেছিল। ২০১১ সালে নিরির পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতেই হাই কোর্টের নির্দেশ বহাল রেখেছিল শীর্ষ আদালতও। কিন্তু জটিল সমস্যা বলে চিহ্ণিত করে ছয় মাসের মধ্যে বাস টার্মিনাস স্থানান্তরের নির্দেশিকার সময়সীমা তুলে দেয়।