নয়াদিল্লি, ৫ সেপ্টেম্বর (আইএএনএস): ভারতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদী কৌশলে ফের বড়সড় পরিবর্তন আনছে পাকিস্তান। ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর পর সরাসরি পাকিস্তান-ভিত্তিক সন্ত্রাসবাদী সংগঠন বা হ্যান্ডলারদের সঙ্গে হামলার যোগসূত্র যাতে সহজে প্রতিষ্ঠা করা না যায়, সেদিকেই এখন বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে ইসলামাবাদ বলে দাবি করেছেন ভারতীয় নিরাপত্তা আধিকারিকরা।
সূত্রের খবর, ৩৭০ অনুচ্ছেদ বিলোপের পর ইসলামাবাদের আবপারা-তে ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স বা আইএসআই-এর সদর দফতরে গঠিত ‘কাশ্মীর স্টাডি গ্রুপ’-এর সুপারিশের ভিত্তিতে পাকিস্তান তার সন্ত্রাসবাদী কৌশলে একাধিক পরিবর্তন এনেছে। গত বছরের মে মাসে পাহেলগামে সন্ত্রাসবাদী হামলার জবাবে শুরু হওয়া ‘অপারেশন সিঁদুর’ পাকিস্তানকে তার সন্ত্রাসবাদী নীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে বাধ্য করেছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
এক আধিকারিকের মতে, আগে ইসলামাবাদ, করাচি বা রাওয়ালপিন্ডি থেকে সন্ত্রাসবাদী হ্যান্ডলাররা সরাসরি নির্দেশ দিতেন। এখন সেই ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। অভিযোগ, আইএসআই আল-কায়েদা এবং ইসলামিক স্টেটের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে হ্যান্ডলারদের কার্যক্রম পরিচালনার চেষ্টা করছে।
ভারতের তরুণদের আর সরাসরি পাকিস্তান থেকে যোগাযোগ করা হচ্ছে না বলেও দাবি করা হয়েছে। সূত্রের মতে, বিদেশে বসে থাকা হ্যান্ডলাররা বিশেষ করে সিরিয়া ও ইরাক থেকে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। ফলে কোনও সন্ত্রাসবাদী হামলার নেপথ্যে থাকা নির্দেশের উৎস অনুসন্ধান করতে গেলে পাকিস্তানের সঙ্গে সরাসরি যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
অপারেশন সিঁদুরের সময় ভারত স্পষ্ট করে দিয়েছিল যে ভবিষ্যতে কোনও সন্ত্রাসবাদী হামলাকে শুধুমাত্র সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদী হামলা হিসেবে দেখা হবে না। এমন হামলাকে ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
এক গোয়েন্দা ব্যুরোর আধিকারিকের দাবি, পাকিস্তান আর একটি অপারেশন সিঁদুরের মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার ঝুঁকি নিতে চাইবে না। তাঁর কথায়, ওই অভিযান পাকিস্তানের পরমাণু শক্তির হুমকির সীমাবদ্ধতা যেমন প্রকাশ্যে এনেছিল, তেমনই দেশটির নিরাপত্তা কাঠামোকে বিব্রত করার পাশাপাশি ভারতের বিরুদ্ধে সক্রিয় সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলির পরিকাঠামোকেও বড় ধাক্কা দিয়েছিল। ধ্বংস হয়ে যাওয়া সন্ত্রাসবাদী পরিকাঠামো পুনর্গঠনে পাকিস্তানকে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে লস্কর-ই-তৈবা, জইশ-ই-মহম্মদ বা হিজবুল মুজাহিদিনের মতো সংগঠনের পরিচিত সন্ত্রাসবাদী ‘ম্যানুয়াল’ ব্যবহার না করার কৌশলের কথা উঠে এসেছে। ভারতীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলির কাছে এই সংগঠনগুলির কার্যপদ্ধতি পরিচিত হওয়ায় সেগুলি ব্যবহার করলে পাকিস্তানের দিকে যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া সহজ হয়।
এর পরিবর্তে বিদেশে থাকা হ্যান্ডলাররা ইসলামিক স্টেট বা আল-কায়েদার উপকরণ ব্যবহার করছে বলে ভারতীয় আধিকারিকদের দাবি। তাঁদের বক্তব্য, এই সংগঠনগুলির সঙ্গে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার যোগাযোগ থাকলেও এগুলিকে সরাসরি পাকিস্তানি সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করা হয় না।
ভারতে ‘লোন উলফ’ বা একক হামলাকারীর মাধ্যমে হামলা চালানোর দিকেও জোর দেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে। নিরাপত্তা আধিকারিকদের মতে, এ ধরনের হামলা সংগঠিত সন্ত্রাসবাদী মডিউলের তুলনায় কম অর্থ, পরিকল্পনা ও জনবল দিয়ে পরিচালনা করা সম্ভব। অনলাইনে উগ্রপন্থী মতাদর্শে প্রভাবিত ব্যক্তিরা অনেক সময় কোনও সুসংগঠিত সন্ত্রাসবাদী কাঠামোর অংশ না হয়েই নিজেরাই হামলা চালাতে পারে।
এই ধরনের হামলার ক্ষেত্রে তদন্তকারীদের কাছে হামলার নেপথ্যে থাকা নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে এবং পাকিস্তানও দায় অস্বীকার করার সুযোগ পায় বলে দাবি করেছেন আধিকারিকরা।
সূত্রের দাবি, বিদেশে থাকা হ্যান্ডলাররা সমাজমাধ্যমে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুদের প্রোফাইল খুঁজে বের করে। এরপর তাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন, নিয়োগ, উগ্রপন্থায় প্ররোচিত করা এবং হামলার পরিকল্পনার দিকে এগোনো হয়।
ভারতীয় আধিকারিকদের মতে, পাকিস্তানের মূল লক্ষ্য ভারতের বিরুদ্ধে হামলা চালানো হলেও এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে নিজেদের যোগসূত্রের প্রমাণ আড়াল করা। ভারতের পরিবর্তিত সন্ত্রাসবিরোধী নীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংস্থা বিশেষ করে ফিনান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্স-এর চাপও পাকিস্তানের কৌশল পরিবর্তনের অন্যতম কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
— আইএএনএস



















