দেশের সেরা তালিকায় ত্রিপুরার বিদ্যুৎ পরিষেবা, ‘এ’ গ্রেড পেয়ে নতুন ইতিহাস গড়ল টিএসইসিএল

আগরতলা, ২৭ মার্চ : ত্রিপুরার বিদ্যুৎ পরিষেবা নিয়ে একসময় অনেক অভিযোগ থাকত লোডশেডিং, বিল সংক্রান্ত সমস্যা, দেরিতে পরিষেবা—এসব ছিল নিত্যদিনের বিষয়। কিন্তু গত কয়েক বছরে সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। এখন ত্রিপুরা শুধু নিজের বেশিরভাগ সমস্যা গুলো কাটিয়েই ওঠেনি, বরং দেশের সেরা বিদ্যুৎ পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলোর তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। ভারত সরকারের বিদ্যুৎ মন্ত্রক এবং রুরাল ইলেক্ট্রিফিকেশন কর্পোরেশন -এর যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘কনজিউমার সার্ভিস রেটিং অফ ডিসকমস’ তথা সিএসআরডি-এর সাম্প্রতিক মূল্যায়নে দেশের মোট ৬৬টি বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থার মধ্যে ত্রিপুরা স্টেট ইলেকট্রিসিটি কর্পোরেশন লিমিটেড ‘এ’ গ্রেড অর্জন করেছে।

এটা শুধু একটা রেটিং নয়, বরং ত্রিপুরার বিদ্যুৎ পরিষেবার মান কতটা উন্নত হয়েছে, তার এক শক্ত প্রমাণ। গত ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে যেখানে টিএসইসিএল ছিল ‘বি+’ গ্রেডে, সেখানে মাত্র এক বছরের মধ্যে সরাসরি ‘এ’ গ্রেডে উঠে আসা নিঃসন্দেহে বড় সাফল্য। আরও উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, ২০২২-২৩ সালে যেখানে সংস্থার অবস্থান ছিল ৫১ নম্বরে, ২০২৩-২৪ সালে তা উঠে আসে ৪৪ নম্বরে, আর এবার ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে ২৪ নম্বরে পৌঁছে গেছে। এই দ্রুত উন্নতি প্রমাণ করে যে, পরিকল্পনা এবং পরিশ্রম—দুটোই ঠিক পথে এগিয়েছে।

এই সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রয়েছে ত্রিপুরা স্টেট ইলেকট্রিসিটি কর্পোরেশন লিমিটেডের কর্মী, আধিকারিক এবং প্রকৌশলীদের। তারা নিরলসভাবে কাজ করে বিদ্যুৎ পরিষেবাকে মানুষের কাছে আরও সহজ, দ্রুত এবং নির্ভরযোগ্য করে তুলেছেন। একইসঙ্গে রাজ্যের বিদ্যুৎ মন্ত্রী রতন লাল নাথ, বিদ্যুৎ সচিব অভিষেক সিং এবং নিগমের ব্যবস্থাপক অধিকর্তা বিশ্বজিৎ বসু-এর নেতৃত্ব এই অগ্রগতিকে আরও শক্ত ভিত দিয়েছে।

বিদ্যুৎ মন্ত্রী রতন লাল নাথ এই সাফল্যে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, এটি নিগমের প্রতিটি কর্মীর কঠোর পরিশ্রমের ফল। তিনি আশা প্রকাশ করেন, যদি এই ধারা বজায় থাকে, তাহলে আগামী বছর টিএসইসিএল ‘এ প্লাস’ গ্রেডও অর্জন করতে পারবে। শুধু তাই নয়, তিনি সকলকে আহ্বান জানিয়েছেন, ত্রিপুরাকে দেশের অন্যতম সেরা বিদ্যুৎ পরিষেবা প্রদানকারী রাজ্যে পরিণত করতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

অন্যদিকে, ব্যবস্থাপক অধিকর্তা বিশ্বজিৎ বসুও এই কৃতিত্ব সম্পূর্ণভাবে কর্মীদের উৎসর্গ করেছেন। তিনি স্বীকার করেছেন, এই সাফল্যের ফলে মানুষের প্রত্যাশা আরও বেড়েছে। তাই আগামী দিনে আরও ভালো পরিষেবা দেওয়ার জন্য নিগম সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাবে।
নিগমের তরফ থেকে জানানো হয়েছে, সিএসআরডি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এই রেটিং দেওয়া হয়েছে মোট ১০০ নম্বরের ভিত্তিতে চারটি প্রধান ক্ষেত্রে। প্রথমত, অপারেশনাল রিলেয়াবিলিটি বা বিদ্যুৎ সরবরাহের স্থায়িত্ব। এখানে ত্রিপুরা জাতীয় গড়ের থেকেও অনেক এগিয়ে। বর্তমানে শহরাঞ্চলে দিনে গড়ে ২৩ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট বিদ্যুৎ সরবরাহ হচ্ছে। গ্রামাঞ্চলেও প্রায় ২৩ ঘণ্টা ৩৫ মিনিট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। শিল্পাঞ্চলে তো ২৪ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা হয়েছে। অর্থাৎ, এখন ত্রিপুরায় লোডশেডিং অতীত। শুধুমাত্র যান্ত্রিক গোলযোগ কিংবা প্রাকৃতিক কারণে পাওয়ার কাট ছাড়া লোডশেডিং কে বিদায় দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, ট্রান্সফরমার বিকল হওয়ার হারও অনেক কমেছে। আগে যেখানে এই হার ছিল ৫.৪০%, এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩.৬৩%-এ। জাতীয় গড় যেখানে ৫.০২%, সেখানে ত্রিপুরার এই উন্নতি বিদ্যুৎ পরিকাঠামোর শক্ত অবস্থানকে স্পষ্ট করে।

দ্বিতীয়ত, নতুন সংযোগ এবং অন্যান্য পরিষেবা। আগে নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ পেতে অনেক সময় লাগত। এখন প্রায় ১০০% আবেদন অনলাইনে করা যাচ্ছে এবং দ্রুত পরিষেবা দেওয়া হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের সময় এবং ঝামেলা দুটোই কমেছে। প্রিপেইড মিটারের ব্যবহারও ধীরে ধীরে বাড়ছে। এতে গ্রাহকরা নিজের খরচ নিজের মতো করে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন এবং বিল নিয়ে বিভ্রান্তি কমছে।

তৃতীয়ত, মিটারিং, বিলিং এবং কালেকশন—এই ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে। এখন প্রায় ৬৫% মানুষ ডিজিটাল মাধ্যমে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করছেন, যা আগে ছিল মাত্র ১৩%। অর্থাৎ মানুষ এখন প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোচ্ছেন। এর পাশাপাশি ৯৯% গ্রাহক এখন মোবাইলে বিল সংক্রান্ত আপডেট পাচ্ছেন। ফলে আর বিল হারিয়ে যাওয়া বা দেরিতে পাওয়ার সমস্যা নেই। মিটার খারাপ হলে সেটাও খুব দ্রুত বদলে দেওয়া হচ্ছে। শহরাঞ্চলে গড়ে মাত্র ২.৯ দিনের মধ্যে এই কাজ সম্পন্ন হচ্ছে।

চতুর্থত, অভিযোগ প্রতিকার এবং পরিষেবা। টিএসইসিএল-এর ২৪ ঘণ্টার কনজিউমার কেয়ার সেন্টার এখন পুরোপুরি সক্রিয়। কোনো সমস্যা হলে দ্রুত অভিযোগ জানানো যাচ্ছে এবং সমাধানও পাওয়া যাচ্ছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, বিদ্যুৎ বিভ্রাট বা রক্ষণাবেক্ষণের কাজ হলে আগে থেকেই গ্রাহকদের সোশ্যাল মিডিয়া, প্রিন্ট মিডিয়া এবং মাইকিং এর মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই ক্ষেত্রে ত্রিপুরা ১০০% সাফল্য অর্জন করেছে, যা গত বছর ছিল মাত্র ১৪.৮%।

এই সবকিছু মিলিয়ে একটা বিষয় পরিষ্কার—ত্রিপুরার বিদ্যুৎ পরিষেবা এখন শুধু বিদ্যুৎ দেওয়া পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা হয়ে উঠেছে এক আধুনিক, স্বচ্ছ এবং গ্রাহকবান্ধব ব্যবস্থা। জাতীয় স্তরে যেখানে ৬৬টি সংস্থার মধ্যে খুব কম সংখ্যক সংস্থা ‘এ’ বা তার উপরের গ্রেড পেয়েছে, সেখানে ত্রিপুরার এই সাফল্য সত্যিই প্রশংসনীয়। বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ভারতের একটি ছোট রাজ্য হিসেবে এই অর্জন আরও গুরুত্বপূর্ণ। জানা গেছে গোটা দেশের ৬৬ টি বিদ্যুৎ বিতরক সংস্থার মধ্যে ৬ টি বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা অর্থাৎ ডিসকম এ প্লাস পেয়েছে। ত্রিপুরাসহ এই ক্যাটাগরি পেয়েছে মোট ২১ টি বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা। বি প্লাস ক্যাটাগরি পেয়েছে ২৭ টি ডিসকম। বি ক্যাটাগরি পেয়েছে দশটি, সি প্লাস একটি এবং সি ক্যাটাগরি পেয়েছে একটি ডিসকম।

ত্রিপুরা এখন শুধু নিজের রাজ্যের মানুষকেই ভালো পরিষেবা দিচ্ছে না, বরং গোটা দেশের সামনে একটি উদাহরণ তৈরি করছে—কীভাবে পরিকল্পনা, প্রযুক্তি এবং আন্তরিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে একটি পরিষেবা ব্যবস্থাকে বদলে ফেলা যায়।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ত্রিপুরা স্টেট ইলেকট্রিসিটি কর্পোরেশন লিমিটেড আজ এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে বিদ্যুৎ পরিষেবা শুধু প্রয়োজন মেটানোর বিষয় নয়, বরং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। আর এই পথ চলায় বিদ্যুৎ মন্ত্রী রতন লাল নাথ, বিদ্যুৎ সচিব অভিষেক সিং এবং নিগমের ব্যবস্থাপক অধিকর্তা বিশ্বজিৎ বসুর নেতৃত্ব নিঃসন্দেহে একটি বড় ভূমিকা পালন করেছে।

আগামী দিনে যদি এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকে, তাহলে ত্রিপুরা খুব শীঘ্রই দেশের সেরা বিদ্যুৎ পরিষেবা প্রদানকারী রাজ্যগুলোর শীর্ষে পৌঁছে যাবে—এমনটাই আশা করা যায়।

Leave a Reply