পাহাড়প্রমাণ বিদ্যুৎ বিল বকেয়া, পরিষেবা ক্ষেত্রে সংকটের আশঙ্কা, বিল পরিশোধে গ্রাহকদের এগিয়ে আসার আবেদন বিদ্যুৎ নিগমের

আগরতলা, ৬ ফেব্রুয়ারি: রাজ্যের বিদ্যুৎ পরিষেবা ব্যবস্থাকে সচল রাখতে ক্রমশ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে একাংশ গ্রাহকের বিদ্যুৎ বিল পরিশোধে অনীহা। ত্রিপুরা রাজ্য বিদ্যুৎ নিগম লিমিটেড জানিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে বিল বকেয়া থাকায় প্রশাসনিক কাজের পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং ভবিষ্যতের পরিকাঠামোগত উন্নয়ন গুরুতর সংকটের মুখে পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ গ্রাহকদের সহযোগিতা ছাড়া পরিষেবা ব্যবস্থাকে সুসংহত রাখা কার্যত অসম্ভব বলে সতর্ক করেছেন নিগমের ব্যবস্থাপক অধিকর্তা বিশ্বজিৎ বসু।

নিগম সূত্রে জানা গেছে, অমরপুর বিদ্যুৎ উপ-বিভাগের অধীন একাধিক এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ বিল বকেয়া রেখেই পরিষেবা চালু রাখার দাবি জানিয়ে আসছেন বহু গ্রাহক। সম্প্রতি কালামাটি, বিবারাম, গতিরাম, সোমবাজয় ও হাতিরায় পাড়ার বিদ্যুৎ গ্রাহকেরা প্রকাশ্যেই জানান, তাঁরা বিল পরিশোধ করবেন না। দীর্ঘদিনের বকেয়ার কারণে নিগম ওই এলাকাগুলিতে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার উদ্যোগ নিলে গ্রামবাসীদের একাংশ রাস্তায় বসে প্রতিবাদে সামিল হন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, বিল দেওয়া তাঁদের পক্ষে সম্ভব নয়, তবে বিদ্যুৎ পরিষেবা চালু রাখতে হবে।

পরবর্তীতে জেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়। সংশ্লিষ্ট এলাকাবাসীরা লিখিতভাবে নিগমকে আশ্বাস দেন, আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে বকেয়া বিল পরিশোধ করা হবে। এই প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতেই পুনরায় বিদ্যুৎ পরিষেবা চালু করা হয়। তবে নিগমের কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতেও যদি এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তাহলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শুধুমাত্র এই পাঁচটি এলাকাতেই বিদ্যুৎ বিলের মোট বকেয়া প্রায় ৩৮ লক্ষ টাকার বেশি। কালামাটি গ্রামে ৩২ জন গ্রাহকের বকেয়া ১০ লক্ষ টাকার বেশি, বিবারাম পাড়ায় ৪৫ জন গ্রাহকের বকেয়া ৭ লক্ষ ৮৯ হাজার টাকা, গতিরাম পাড়ায় ১৮ জন গ্রাহকের বকেয়া ৪ লক্ষ ৭৬ হাজার টাকা, সোমবাজয় পাড়ায় ৪৬ জন গ্রাহকের বকেয়া ৯ লক্ষ ৩৭ হাজার টাকা এবং হাতিরায় পাড়ায় ৩০ জন গ্রাহকের বকেয়া ৫ লক্ষ ৪২ হাজার টাকা।

নিগম জানিয়েছে, শুধু এই কয়েকটি এলাকাই নয়, গোটা অমরপুর বিদ্যুৎ বিভাগের ছবিটাই উদ্বেগজনক। সরকারি হিসেব অনুযায়ী, অমরপুর বিদ্যুৎ উপ-বিভাগে মোট ১৫ হাজার ৬৭ জন গ্রাহকের মধ্যে ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত বিল পরিশোধ করেছেন মাত্র ৪ হাজার ৩১০ জন। অর্থাৎ প্রায় ১০ হাজার ৭৫৭ জন গ্রাহক এখনও বিল মেটাননি, যা শতাংশের হিসাবে মাত্র ২৮ শতাংশ।

একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে অন্যান্য উপ-বিভাগেও। যতনবাড়ি বিদ্যুৎ উপ-বিভাগে ১০ হাজার ৪১৮ জন গ্রাহকের মধ্যে বিল পরিশোধ করেছেন মাত্র ১ হাজার ৭২৯ জন, যা ১৬ শতাংশ। করবুক উপ-বিভাগে ৭ হাজার ৬১৭ জন গ্রাহকের মধ্যে ১ হাজার ৬৪৪ জন বিল মিটিয়েছেন, অর্থাৎ ২১ শতাংশ। অম্পী উপ-বিভাগে ৯ হাজার ৯৮ জন গ্রাহকের মধ্যে বিল পরিশোধ করেছেন ২ হাজার ৩৯৮ জন, যা ২৬ শতাংশ।

সব মিলিয়ে অমরপুর বিভাগের চারটি উপ-বিভাগে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের গড় হার মাত্র ২৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত হতাশাজনক বলে অভিহিত করেছেন বিদ্যুৎ নিগমের কর্তৃপক্ষ।

ব্যবস্থাপক অধিকর্তা বিশ্বজিৎ বসু বলেন, বিদ্যুৎ পরিষেবা একটি ব্যয়বহুল ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবা ক্ষেত্র। বিদ্যুৎ উৎপাদন, ক্রয়, রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামতি এবং নতুন পরিকাঠামো নির্মাণে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়। গ্রাহকেরা সময়মতো বিল পরিশোধ না করলে পরিষেবা সচল রাখা যেমন কঠিন হয়ে পড়ে, তেমনি উন্নয়নমূলক প্রকল্পও বাধাগ্রস্ত হয়। বিদ্যুৎ পরিষেবার সঙ্গে প্রতিটি পরিবারের দৈনন্দিন জীবন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ব্যবসা-বাণিজ্য সরাসরি যুক্ত থাকায় এর উপর সামগ্রিক জনজীবনের প্রভাব পড়ে।

এই অবস্থায় ত্রিপুরা রাজ্য বিদ্যুৎ নিগম সমস্ত গ্রাহকদের সময়মতো বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করে পরিষেবা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার জন্য এগিয়ে আসার আবেদন জানিয়েছে। গ্রাহকদের সক্রিয় সহযোগিতা ছাড়া রাজ্যের বিদ্যুৎ পরিষেবাকে উন্নত ও স্থিতিশীল রাখা অসম্ভব বলেও স্পষ্ট করেছে নিগম।

Leave a Reply