আগরতলা, ২৯ জানুয়ারি: মিথ্যা তৈরির ফ্যাক্টরি হচ্ছে বিজেপি। প্রতিটি বিজেপি শাসিত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হলো সেই ফ্যাক্টরির ডাইরেক্টর। আর তাদের চেয়ারম্যান বসে আছে দিল্লিতে। ‘বিভাজন নয় সম্প্রীতি আমাদের ঐতিহ্য’ – এই স্লোগানকে সামনে রেখে জিএমপির ২৩তম কেন্দ্রীয় সম্মেলন উপলক্ষে আগরতলায় প্রকাশ্য জন সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে একথা বলেন কেন্দ্রীয় বামনেত্রী তথা প্রাক্তন সাংসদ বৃন্দা কারাত।
বক্তব্য রাখতে বামনেত্রী বৃন্দা কারাত বলেন, বিজেপি হচ্ছে মিথ্যা তৈরি করার ফ্যাক্টরি। প্রতিটি বিজেপি শাসিত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সেই ফ্যাক্টরি ডাইরেক্টর, আর দিল্লিতে বসে আছেন তাদের চেয়ারম্যান। সেখান থেকে প্রতিদিন নতুন মিথ্যা, নতুন প্রতিশ্রুতি, নতুন জুমলা তৈরি করছেন তারা। যার মাধ্যমে জনসাধারণের অধিকারের উপর বুলডোজার চালানো হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চাকরি সবকিছু থেকে জনজাতিদের বঞ্চিত করছে বিজেপি। পুঁজিবাতিদের লুটের ফলে জাতি – জনজাতি উভয়ের সাংবিধানিক অধিকার খন্ডিত হচ্ছে। গোটা দেশে বিকাশের নামে আদিবাসীদের ক্ষতি করা হচ্ছে।
বিজেপি সংবিধানের কিছুই জানেনা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যে স্যালুট জানান, সেই স্যালুটের মানে তিনি জানেন না। তিনি শপথ নিয়েছেন। যা হিন্দু হিন্দি হিন্দুস্তান রক্ষার লড়াই। এতে আদিবাসীদের রক্ষার কোন উদ্যোগ নেই। আদিবাসীদের জল জঙ্গল রক্ষা করার কোন অভিধান আরএসএস-এর সংবিধানে নেই।
তাঁর কথায়, এঞ্জিল চাকমার মৃত্যুর জন্যেও বিজেপি সরকার দায়ী। বিজেপির এই বিভাজনের রাজনীতির ফলে গুন্ডারা তাকে হত্যা করেছে। এক জনজাতি মা তার সর্বস্ব দিয়ে ছেলেকে পড়তে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সেই ছেলের মৃত্যুর জবাব দিতে পারবে না বিজেপি। এমজিএন রেগা প্রসঙ্গেও বিজেপিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন তিনি। ভারতের জনসংখ্যার ৮.৬ শতাংশ জনজাতি। কিন্তু মন রেগার সাইটে ২০ শতাংশ জনগণ আদিবাসী সম্প্রদায়ের। গরীব আদিবাসীদের সেই কাজের অধিকার, সেই সম্পদটুকু বিজেপি কেড়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, বাম আমলে রাজ্যে শিক্ষার উন্নতি ঘটেছিল। কিন্তু বর্তমানে তার কিছুই নেই। জনজাতি এলাকাগুলিতে বিদ্যালয়ে শিক্ষক নেই। ছাত্র-ছাত্রীদের পঠন-পাঠন বিঘ্নিত হচ্ছে। বিদ্যাজ্যোতির নামে ছাত্র-ছাত্রীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে খেলা করা হচ্ছে। বিভাজনের রাজনীতির উপর ভর করে কখনো উন্নয়ন সম্ভব হয় না। আদিবাসীদের অধিকার নিয়ে খেলা করছে বিজেপি নেতৃত্বাধীন ডাবল ইঞ্জিন সরকার। বিজেপিকে আগামী দিন জবাব দিতে আহ্বান করেন বিন্দা কারাত।
তিপরা মথার দিকে আঙ্গুল তুলে বলেন, প্রাক্তন সাংসদ সরাসরি বলে দিয়েছে সঠিক রাস্তায় যদি না চলে তাহলে জেলে পাঠাবে। ফলে তিপরা মথার সম্মান কোথায়? শুধুমাত্র অর্থ আর আসন হলেই তাদের চলে। এভাবেই বিন্দা কারাত বিজেপি এবং মথার সমালোচনা করেন এদিন। তিনি বলেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান কারোর পিতৃ সম্পত্তি নয়। এগুলির অধিকার দেশের সংবিধান দেয়। স্কলারশিপ, শিক্ষা ক্ষেত্রে সহযোগিতা সবকিছুই আজ ত্রিপুরা থেকে মুছে যাচ্ছে বর্তমান বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকারের জন্য। শুধু তাই নয় এক অংশের মানুষের সঙ্গে অন্য অংশে মানুষের মধ্যে বিভাজনের চেষ্টা করে দেশের সংবিধানের উপর আঘাত নামিয়ে আনছে ডাবল ইঞ্জিন সরকার।
এদিন ফরেস্ট রাইটস অ্যাক্ট নিয়েও সরব হন তিনি। বৃন্দা কারাত বলেন, ফরেস্ট রাইট অ্যাক্ট এর মাধ্যমে আদিবাসীদের জল জঙ্গল জমি রক্ষা করার লড়াই করেছে গণমুক্তি পরিষদ। ১৯৪০ সাল থেকে আদিবাসীদের অধিকার রক্ষার জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে গণমুক্তি পরিষদ। কিন্তু সেই অধিকারও কেড়ে নিচ্ছে বিজেপি সরকার। আদিবাসী এলাকাগুলিতে জমির পাট্টা রয়েছে, কিন্তু সেই পাট্টা দিয়ে লোন নেওয়া যাচ্ছে না। বিভিন্ন পদ্ধতিতে আদিবাসীদের রাবার প্লান্টেশন বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। জল জঙ্গল সব কিছুই আদানি-আম্বানির হাতে তুলে দেওয়া হয় হচ্ছে। ভূমি মাটি ছাড়া হচ্ছেন আদিবাসীরা। তাদের চিন্তা করছে না এই সরকার। এই সরকারের বিরুদ্ধে গণমুক্তি পরিষদের আন্দোলনে শামিল হওয়ার আহ্বান জানালেন বৃন্দা কারাত।
এদিনের সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে বিরোধী দলনেতা জিতেন্দ্র চৌধুরী সরকারকে এক হাত নিলেন। তিনি বলেন, ২০১৮ সালের ত্রিপুরা রাজ্যে গণতন্ত্রের মৃত্যু হয়েছে। কোমা থেকে একেবারে কবরে ঠেলে দিয়েছে বিপ্লব কুমার দেব এবং মানিক সাহারা। এই গণতন্ত্রকে কবর থেকে তুলে আনতে হবে।
গণতন্ত্র বাঁচলে এডিসি বাঁচবে, তিপ্রাসার সংস্কৃতি বাঁচবে, ককবরক সংস্কৃতি বাঁচবে, কর্মসংস্থান হবে, চিমনি থেকে ধোঁয়া উঠবে, কলকারখানা হবে। কিন্তু গণতন্ত্র না থাকলে সব বিসর্জন হবে। তিনি আরো বলেন, বিজেপি এবং তিপরা মথা দেখাচ্ছেন একমাত্র তারাই কাজ করছে। কিন্তু তাদের কাজ হল অর্থ এবং আসন দখল করা।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, বিজেপির শরিক দলই বলছে এডিসিতে বিজেপির আমলে কোন উন্নয়ন হয়নি। যে অল্প টাকা এডিসির জন্য বরাদ্দ করা হয় সেই টাকাও লুটপাট হয়ে চলে যায়। মুখ্যমন্ত্রী খোদ বলছেন এডিসির জন্য অনেক টাকা বরাদ্দ করেছেন। কিন্তু সেই চিত্র লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। কান পাতলেই শুধু শোনা যায় শাসক শরিকের মারপিট, লুটপাট। সেই সংঘাতও জনগণের কল্যাণে নয়, লুটের রাজত্ব কায়েমের সংঘাত।
তিনি আরো বলেন, মুখ্যমন্ত্রী বলছেন নিউ ত্রিপুরা গঠন করা হবে। কিন্তু আসল অর্থে নিউ ত্রিপুরা মানে মন্ডল ত্রিপুরা। লুটপাট ডাকাতির স্বার্থেই এই ত্রিপুরা কাজ করবে। বিজেপি, মথা উভয়ই বলছে এডিসি দখল করতে হবে। কিন্তু কেউই এডিসির জনজাতিদের অস্তিত্ব রক্ষা, ভাষা সংস্কৃতির বিকাশ, জমি নিয়ন্ত্রণ ও তার সৎ ব্যবহার এইসব নিয়ে কথা বলছে না। গণমুক্তি পরিষদের নেতৃত্বে জনজাতি এলাকাগুলির সার্বিক বিকাশের লক্ষ্যে লড়াইয়ের ডাক দেন তিনি এদিন।
এদিনের এই প্রকাশ্য জনসমাবেশের আয়োজন করা হয় রবীন্দ্রভবন প্রাঙ্গণের সামনে। উপস্থিত ছিলেন বিরোধী দলনেতা জিতেন্দ্র চৌধুরী, কেন্দ্রীয় বাম নেত্রী বৃন্দা কারাত ছাড়াও পুলিন বাসকে, কনভেনর আদিবাসী রাষ্ট্র মঞ্চ, পাপ্পু বুরু, রাজ্য সম্পাদক, আসাম জনজাতি পরিষদ, জিএমপি নেতা রাধাচরণ দেববর্মা, বাম নেতা মানিক দে সহ অন্যান্যরা।

