ওয়াশিংটন/লন্ডন, ২৪ জানুয়ারী: আফগানিস্তানে ২০ বছরের যুদ্ধে ন্যাটো বাহিনী সামনের সারিতে লড়াই করেনি—মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই মন্তব্যে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়েছে ইউরোপীয় সেনা ভেটেরান, নিহত সেনাদের পরিবার এবং মার্কিন মিত্রদেশগুলোর মধ্যে। তবে যুদ্ধের পরিসংখ্যান ও নথিভুক্ত তথ্য ট্রাম্পের বক্তব্যকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে।
একজন ব্রিটিশ সেনার মা, যিনি আফগানিস্তানে প্রাণ হারানো সর্বকনিষ্ঠ ব্রিটিশ সৈনিকের অভিভাবক, বলেন, “আমার ছেলে মাত্র ১৮ বছর বয়সে সহযোদ্ধাদের বাঁচাতে গিয়ে বিস্ফোরণে মারা যায়।” তাঁর মতো শতাধিক পরিবার ও সাবেক সেনা ট্রাম্পের মন্তব্যের প্রতিবাদে সরব হয়েছেন।
ট্রাম্প দাবি করেন, ন্যাটো দেশগুলো খুব বেশি কিছু করেনি এবং যারা সৈন্য পাঠিয়েছিল, তারাও “ফ্রন্ট লাইনের একটু পেছনে” ছিল। তাঁর এই বক্তব্য এমন সময় এসেছে, যখন গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ডেনমার্কের সঙ্গে কূটনৈতিক টানাপোড়েন চলছে—যা পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর প্রথমবারের মতো ন্যাটোর আর্টিকেল ৫ প্রয়োগ করা হয়—যেখানে বলা হয়েছে, এক সদস্যের ওপর হামলা মানে সবার ওপর হামলা। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ন্যাটো জোট আফগানিস্তানে অভিযান শুরু করে।
২০১৪ সালে আনুষ্ঠানিক কমব্যাট মিশন শেষ হলেও তার আগে ও পরে বহু বছর ন্যাটো বাহিনী মার্কিন সেনাদের সঙ্গে যৌথভাবে যুদ্ধ চালায়।
সৈন্যসংখ্যা ও হতাহতের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১১ সালে আফগানিস্তানে ন্যাটো বাহিনীর সংখ্যা সর্বোচ্চ প্রায় ১,৪০,০০০-এ পৌঁছায়। ২০ বছরে মোট প্রায় ৩,৫০০ বিদেশি সেনা নিহত হন। যুক্তরাষ্ট্র হারায় ২,৪৫৬ সেনা। যুক্তরাজ্য হারায় ৪৫৭ সেনা।
জনসংখ্যার অনুপাতে ক্ষয়ক্ষতি বিচার করলে ছোট ইউরোপীয় দেশগুলোর ত্যাগ আরও স্পষ্ট:
ডেনমার্ক (জনসংখ্যা অনেক কম) হারায় প্রায় ৫০ সেনা—যা জনসংখ্যার অনুপাতে মার্কিন ক্ষয়ক্ষতির কাছাকাছি।
কানাডা-১৫৯, ফ্রান্স- ৯০, জার্মানি- ৬২, ইতালি-৫৩, পোল্যান্ড-৪৪। এছাড়া এস্তোনিয়া, নরওয়ে, নেদারল্যান্ডস, চেক প্রজাতন্ত্র, রোমানিয়া সহ আরও কয়েকটি দেশও উল্লেখযোগ্য ক্ষতি স্বীকার করে।
ন্যাটোর তথ্য অনুযায়ী, ৩৬টি সদস্যদেশের সেনা কাবুল, মাজার-ই-শরিফ, হেরাত, কান্দাহার ও লাঘমানে মোতায়েন ছিল—যেখানে তীব্র লড়াই হয়েছে।
বিবিসির প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ফ্র্যাঙ্ক গার্ডনারের মতে, ব্রিটিশ, কানাডিয়ান, ড্যানিশ ও এস্তোনিয়ান বাহিনী হেলমান্দ ও কান্দাহার প্রদেশে সবচেয়ে কঠিন লড়াইয়ের মুখে পড়ে।
শুরুর দিকে হেলমান্দ প্রদেশে, যা তালিবানদের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত, মূলত ব্রিটিশ ও ড্যানিশ সেনারাই মোতায়েন ছিল। মার্কিন বাহিনীর বড় রকমের সহায়তা আসে ২০০৮ সালের পর। এই প্রদেশেই যুক্তরাজ্য ও ডেনমার্কের অধিকাংশ সেনা নিহত হন।
একটি গবেষণাপত্রে দেখা গেছে, মোতায়েনের অনুপাত অনুযায়ী ব্রিটিশ ও কানাডীয় সেনারা মার্কিন সেনাদের তুলনায় দ্বিগুণ ঝুঁকির মুখে ছিলেন।
উপস্থিত তথ্য-উপাত্ত বলছে, আফগানিস্তান যুদ্ধে ন্যাটো মিত্ররা শুধু উপস্থিতই ছিল না, বরং বহু ক্ষেত্রে সরাসরি সামনের সারিতে লড়েছে এবং উল্লেখযোগ্য প্রাণহানি স্বীকার করেছে। ফলে ট্রাম্পের মন্তব্য বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেই মনে করছেন বিশ্লেষক ও সামরিক মহল।

