নয়াদিল্লি, ২৪ জানুয়ারি: বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচনের দিন যত এগিয়ে আসছে, ততই রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়ছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। তবে রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় এবারের নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগ। এই পরিস্থিতিতে দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে বাজানো শেখ হাসিনার প্রায় এক ঘণ্টার অডিও বক্তব্যকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
ওই অডিও বক্তৃতায় শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে চাঁচাছোলা ভাষায় আক্রমণ শানান বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি দাবি করেন, রক্তাক্ত বাংলাদেশ আজ অতল গহ্বরের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে।
দেশের বর্তমান পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের উর্বর ও শান্ত ভূমি আজ আহত, রক্তে ভেজা প্রান্তরে পরিণত হয়েছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশ যেন আজ এক বিশাল কারাগার, এক মৃত্যুকূপ, এক মৃত্যু উপত্যকা। এই অবস্থার জন্য একমাত্র অধ্যাপক ইউনূসকেই দায়ী করেন তিনি। হাসিনার ভাষা অনুযায়ী, ধ্বংসস্তূপের মাঝে টিকে থাকার লড়াইয়ে মানুষের আর্তচিৎকারই এখন বাংলাদেশের বাস্তবতা। খুনি ফ্যাসিবাদী ইউনূস-একজন সুদখোর, অর্থপাচারকারী, লুটেরা এবং দুর্নীতিগ্রস্ত, ক্ষমতালোভী বিশ্বাসঘাতক-তার সর্বগ্রাসী মতাদর্শ দিয়ে আমাদের জাতির রক্ত শুষে নিয়েছে, আমাদের মাতৃভূমির আত্মাকে কলুষিত করেছে।
দেশবাসীর উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, এই বার্তা শুধু অন্তর্বর্তী সরকারের নিন্দা নয়, বরং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের প্রতি একটি আহ্বান। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের আগস্টে গণবিক্ষোভের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে তিনি ভারতে অবস্থান করছেন। শেখ হাসিনার অভিযোগ, অধ্যাপক ইউনূস ও তার সহযোগীরা পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়েছে। তার দাবি, বর্তমানে বাংলাদেশে চরম আইনশৃঙ্খলাহীনতা বিরাজ করছে, সংখ্যালঘু নির্যাতন বেড়েছে এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক মামলার রাজত্ব কায়েম হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তার ক্ষমতাচ্যুত হওয়াকে তিনি একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের ফল বলে উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, এই পরিস্থিতিতে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন কোনোভাবেই সম্ভব নয়, যদি না ইউনূস সরকার অপসারণ করা হয় বা তার প্রভাব খর্ব করা হয়। পাশাপাশি তিনি অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকার আইনের অপব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হয়রানি ও কারাবন্দি করছে। বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা পুনঃপ্রতিষ্ঠারও দাবি জানান তিনি।
জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, তার ক্ষমতাচ্যুতি এবং পরবর্তী সহিংসতার ঘটনাগুলোর বিষয়ে একটি নতুন ও নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক তদন্ত প্রয়োজন, যাতে রাষ্ট্রপৃষ্ঠপোষকতায় সংঘটিত নিপীড়নের অভিযোগগুলোর একটি নির্ভরযোগ্য নথি তৈরি হয়।
বাংলাদেশের স্বার্থে তিনি পাঁচ দফা দাবি উত্থাপন করেন। প্রথমত, ইউনূস প্রশাসন অপসারণের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা। দ্বিতীয়ত, রাজপথে চলমান সহিংসতার অবসান। তৃতীয়ত, সংখ্যালঘু, নারী ও সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। চতুর্থত, সাংবাদিক, আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আইনি হয়রানি বন্ধ। পঞ্চমত, গত এক বছরে সংঘটিত ঘটনাগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তে জাতিসংঘের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক অনুসন্ধান।
ইউনূস সরকারের পাশাপাশি বিএনপিকেও আক্রমণ করেন শেখ হাসিনা। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, তার শাসনামলে কখনও বিএনপিকে নিষিদ্ধ করা হয়নি। তার দাবি, পরাজয়ের আশঙ্কা থেকেই অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনী মাঠ ফাঁকা করেছে। শেখ হাসিনার মতে, আওয়ামী লীগ ছাড়া অনুষ্ঠিত কোনো নির্বাচনই অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।মএই সংকটময় সময়ে দেশবাসীর প্রতি তার আহ্বান, মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে জেগে উঠতে হবে। তিনি বলেন, বিদেশি স্বার্থবাহী পুতুল সরকারকে উৎখাত করে শহিদদের রক্তে লেখা সংবিধান রক্ষা ও পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। সার্বভৌমত্ব সুরক্ষিত করে গণতন্ত্রকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তিকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ও তার প্রশাসনের কর্মকর্তারা একাধিকবার অভিযোগ করেছেন, শেখ হাসিনা ভারত থেকে উস্কানিমূলক বক্তব্য দিচ্ছেন এবং নয়াদিল্লির কাছে তা বন্ধ করার অনুরোধ জানিয়েছেন। এর মধ্যেই ভারতে আয়োজিত এক কর্মসূচিতে শেখ হাসিনার এই বক্তব্য প্রকাশ্যে প্রচারিত হওয়ায়, তা ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে প্রভাব ফেলতে পারে বলে কূটনৈতিক মহলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

