হুকলাইনে বিদ্যুৎ মানেই মৃত্যুকে ডেকে আনা, বিদ্যুৎ চুরির ফলে ক্ষতিগ্রস্ত নিগম, বিপাকে সৎ গ্রাহক

আগরতলা, ৯ জানুয়ারি: রাজ্যে যখন সবুজ শক্তি, নিরাপদ বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ও আধুনিক গ্রিড গড়ে তোলার পথে এগোচ্ছে ত্রিপুরা রাজ্য বিদ্যুৎ নিগম লিমিটেড, ঠিক সেই সময়েই হুক লাইনের মতো বিপজ্জনক ও বেআইনি অভ্যাস বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে ঠেলে দিচ্ছে চরম ঝুঁকির দিকে। সামান্য কিছু টাকা বাঁচানোর লোভে হুক লাইন কিংবা মিটারে ট্যাপিং করে বিদ্যুৎ ব্যবহার শুধু আইনভঙ্গ নয়, অনেক ক্ষেত্রেই তা সরাসরি মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

বিদ্যুৎ নিগমের অভিজ্ঞতা ও পরিসংখ্যান বলছে, হুক লাইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ব্যবহার মানেই নিজের জীবনকে প্রতিনিয়ত বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া। খোলা তারে সংযোগ, অপরিকল্পিতভাবে তার টানা, বৃষ্টিভেজা পরিবেশে বিদ্যুৎ ব্যবহার—এই সবকিছু মিলিয়ে তৈরি হয় এক মারণ ফাঁদ। অতীতে বহুবার হুক লাইন করতে গিয়ে কিংবা অবৈধ সংযোগ খুলতে গিয়ে বিদ্যুৎ স্পৃষ্ট হয়ে মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তাই বিদ্যুৎ চুরি এখানে আর কেবল আর্থিক অপরাধ নয়, তা অনেক সময় জীবননাশের সরাসরি কারণ।

এই প্রাণঘাতী প্রবণতার আরেকটি বড় দিক হল আর্থিক ক্ষতি। বিদ্যুৎ চুরির কারণে ত্রিপুরা রাজ্য বিদ্যুৎ নিগম লিমিটেডকে প্রতি বছর বিপুল রাজস্ব ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। সিস্টেম লস বাড়ছে, গ্রিডের উপর চাপ তৈরি হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিকাঠামো। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সেই সাধারণ গ্রাহকদের উপর, যারা নিয়ম মেনে বিল পরিশোধ করেন। অর্থাৎ বিদ্যুৎ চোরদের কারণে সৎ বিদ্যুৎ ভোক্তারাই শেষ পর্যন্ত বাড়তি চাপ বইছেন।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিদ্যুৎ নিগম একদিকে যেমন সচেতনতা বাড়ানোর উপর জোর দিচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি কঠোর অভিযানও চালাচ্ছে। নিগমের ভিজিলেন্স বিভাগ রাজ্যজুড়ে লাগাতার বিদ্যুৎ চুরি বিরোধী অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ভিজিলেন্স টিম মোট ৬ হাজার ৫৪৭টি হুক লাইন ছিন্ন করেছে। একই সময়ে ১১ হাজার ৪০১টি মিটার পরীক্ষা করে ১ হাজার ৩৫৭টি মিটারে অনিয়ম ধরা পড়েছে।

এই অভিযানে হুক লাইনে বিদ্যুৎ চুরি ও মিটার ট্যাপিংয়ের অপরাধে মোট জরিমানা করা হয়েছে ২ কোটি ৯২ লক্ষ ৩৮ হাজার ৭৫০ টাকা। এর মধ্যে আদায় হয়েছে ২ কোটি ৫০ লক্ষ ১৮ হাজার ৬৯৭ টাকা। পাশাপাশি অভিযানের সময় বকেয়া বিল হিসেবে আদায় হয়েছে আরও ১৬ লক্ষ ৯ হাজার ১২৭ টাকা। নিগমের মতে, এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে বিদ্যুৎ চুরির পরিমাণ কতটা ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছিল।

চলতি বছরের শুরু থেকেই অভিযান আরও তীব্র হয়েছে। ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত গোটা রাজ্যে ১৪৪টি হুক লাইন শনাক্ত ও ছিন্ন করা হয়েছে। এই সময়ে ২৩৩টি মিটার পরীক্ষা করে ১২টি মিটারে বিদ্যুৎ চুরির প্রমাণ মিলেছে। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই জরিমানা করা হয়েছে ৭ লক্ষ ৫৫ হাজার ৬০০ টাকা, যার মধ্যে আদায় হয়েছে ৭ লক্ষ ২০ হাজার ৫৬২ টাকা।
শুধু তাই নয়, গতকাল বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারি ২০২৬, আগরতলা শহরের দক্ষিণ রামনগর ও জয়পুর এলাকায় ভিজিলেন্স টিম হুক লাইন বিরোধী বিশেষ অভিযান চালায়। ওই অভিযানে ১৪টি হুক লাইন ছিন্ন করা হয়। বিদ্যুৎ চুরির সঙ্গে যুক্ত ৮টি ফ্রিজ, ৪টি টিভি, ২টি মোটর, ৩টি ফ্যান, ১টি রাইস কুকার ও ২টি মিক্সার গ্রাইন্ডার বাজেয়াপ্ত করা হয়। পাশাপাশি জরিমানা আদায় হয়েছে ৮৫ হাজার টাকা।

বিদ্যুৎ নিগমের বার্তা স্পষ্ট—হুক লাইনে বিদ্যুৎ ব্যবহার মানে নিজের জীবন নিয়ে জুয়া খেলা। আজ একটু বিল বাঁচানোর চেষ্টা কাল পরিবারকে ঠেলে দিতে পারে চরম বিপর্যয়ের দিকে। আইনভঙ্গের পাশাপাশি এর সামাজিক ও মানবিক মূল্যও ভয়াবহ।
নিগমের তরফে সমস্ত বিদ্যুৎ গ্রাহকদের বৈধ পথে বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য বারবার অনুরোধ জানানো হয়েছে। পাশাপাশি সচেতন নাগরিকদের কাছেও আবেদন জানানো হয়েছে, কোথাও হুক লাইন বা বিদ্যুৎ চুরি চোখে পড়লে যেন তাঁরা প্রতিবাদ করেন এবং তথ্য দেন। কারণ বিদ্যুৎ চুরি একদিকে যেমন ব্যক্তি ও পারিবারিক ক্ষতি ডেকে আনে, অন্যদিকে তা রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়। এই ক্ষতি রোধে সকলের সম্মিলিত দায়িত্ব ও সচেতনতার উপরই জোর দিচ্ছে ত্রিপুরা রাজ্য বিদ্যুৎ নিগম লিমিটেড।

Leave a Reply