বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক: বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যত দিশা

ঢাকা, ৭ জানুয়ারি : বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্ক গত ১৫ বছরে অনেকটা ঘনিষ্ঠতা অর্জন করলেও, বর্তমানে এই সম্পর্ক নানা কারণে চরম অবনতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের পর, দুই দেশের সম্পর্ক এক নতুন ধরনের উত্তেজনার মধ্যে প্রবাহিত হয়েছে।

গত কয়েক মাসে বাংলাদেশে ভারত থেকে পুশইন হয়ে আসা অভ্যন্তরীণ সমস্যা, দ্বিপক্ষীয় আলোচনা ও কূটনৈতিক উত্তেজনা নতুন মাত্রা নিয়েছে। ভারতের গণমাধ্যমে বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণা এবং বাংলাদেশের কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতাদের বিরুদ্ধে শিষ্টাচার লঙ্ঘনের অভিযোগে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়েছে।

অপরাধীদের আশ্রয়ের বিষয়টি নিয়ে ডিসেম্বরে শোনা যায়, বাংলাদেশের ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদির খুনি ভারতে আশ্রয় নিয়েছে। এই ঘটনাটি রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। কয়েকটি রাজনৈতিক দল ভারতীয় দূতাবাস ঘেরাওয়ের কর্মসূচি ঘোষণা করলেও, পুলিশ তাতে বাধা দেয়।

এছাড়া, ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক বাংলাদেশি কিশোরী ফেলানী খাতুনের হত্যার পর বাংলাদেশ সরকারের তরফ থেকে ‘ফেলানী এভিনিউ’ নামে একটি সড়কের নামকরণ করা হয়, যা সম্পর্কের তিক্ততা আরও বাড়িয়ে দেয়।

ভারত সরকারের পক্ষ থেকে সম্প্রতি একাধিক ঘটনায় তাদের দিক থেকে ‘প্ররোচনামূলক’ মন্তব্য করা হয়েছে, যা দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি করেছে। হাসনাত আবদুল্লাহর মন্তব্য, যেখানে তিনি ভারতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে বাংলাদেশি প্রতিবাদী শক্তি প্রসঙ্গে কথা বলেছেন, তা ভারত কর্তৃপক্ষের কাছে খুবই চরম প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।

এদিকে, ভারতীয় গণমাধ্যমে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে একতরফা অপপ্রচারের ধারাবাহিকতা চলতে থাকে, যা সম্পর্কের নাজুক অবস্থা আরো তীব্র করে তোলে।

বিগত মাসে, ভারত সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হলেও, ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সাড়া দেয়নি। এর পরিপ্রেক্ষিতে দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে অস্বস্তি বৃদ্ধি পেয়েছে।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের ঢাকা সফর, যেখানে তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেননি, তা রাজনৈতিক অঙ্গনে অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

গত কয়েক মাসে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বাংলাদেশের মিশনগুলোতে হামলা এবং ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এ কারণে বাংলাদেশ সরকার ভারতে ভিসা সেবা সাময়িকভাবে স্থগিত করে। অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়িতে বাংলাদেশি ভিসা কেন্দ্রেও হামলা চালানো হয়, যা দুই দেশের মধ্যে বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাবের ইঙ্গিত দেয়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগেই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের দৃশ্যত পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তবে, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসলে নতুন কৌশল নির্ধারণ করা হতে পারে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, ভারতীয় সম্পর্কের ভবিষ্যত নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট, তবে উভয় পক্ষের আন্তরিকতা প্রয়োজন।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ মনে করেন, “এটা সত্যি যে, নির্বাচনের আগে বড় ধরনের পরিবর্তন আশা করা যায় না। তবে রুটিন কার্যক্রম বজায় রেখে সম্পর্কের স্বাভাবিকতা রক্ষা করা জরুরি।”

প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশে সম্পর্কের ভবিষ্যত কেমন হবে, তা এখনো অস্বস্তিকর। বর্তমান সরকারের পদক্ষেপ এবং পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের সাথে সম্পর্কের ভিত্তিতে কূটনীতির পরবর্তী দিক নির্ধারণ হতে পারে। তবে, দুই দেশের মাঝে সমঝোতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে একটি স্থিতিশীল সম্পর্কের গুরুত্ব সবাই বুঝতে পারছে।

Leave a Reply