যান্ত্রিকতার ছোঁয়ায় হারিয়ে যেতে বসেছে ঢেঁকি ও পৌষ-পিঠের চিরাচরিত স্বাদ

কল্যাণপুর, ৪ জানুয়ারি: গল্পের আঙ্গিনায় যতই বলা হোক ঢেঁকি স্বর্গে গিয়েও ধান ভাঙে। কিন্তু সেই ঢেঁকিই তো আজকের দিনে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। শহরাঞ্চলে তো ঢেঁকি ঠিক যেন স্বর্গে পৌঁছে গেছে। তারপরও গ্রাম ত্রিপুরার কিছু অঞ্চলে কয়েক গ্রাম মিলে আজো এক দুইটা ঢেঁকির হদিস মেলে। বাঙালির পৌষ পার্বণের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে চিরাচরিত ঢেঁকি। কিন্তু সময়ের আধুনিকতার ছোঁয়ায় অনেকটাই বদলে গেছে সেই চেনাছন্দের পরিচিত দৃশ্য। একটা সময়ে গ্রামের মা বোনেরা কয়েকজনে মিলে পৌষের কম্পিত ঠান্ডায় উৎসবের আমেজ পালা করেই ঢেঁকির মধ্যে পৌষ পার্বণের পিঠার চাল গুঁড়ো করা হতো।

কিন্তু সেই সব এখন স্মৃতির ধারাপাত বন্দি। ক্রমেই বিরল হচ্ছে ঢেঁকি ছাঁটা চাল, হাতে গড়া পিঠে। পৌষ সংক্রান্তিতে বরং ভিড় মিষ্টির দোকানে। সেখান থেকে কেনা রেডিমেড পিঠে খেয়েই বৎসরান্তের পার্বণের মুখ রাখছে বাঙালি। আগে পৌষ মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে গ্রামীণ জনপদে মা মাসি দিদিমারা ব্যস্ত হয়ে পড়তেন। আতপ চাল ঢেঁকিতে কোটা হত। নাওয়া-খাওয়া ভুলে শীতের দুপুরে রোদ্দুর গায়ে মেখে চাল কুটত বাড়ির মেয়েরা।

গ্রামের বহু বাড়িতে দেখা মিলত ঢেঁকির। তৈরি হত হরেক রকমের পিঠে-পায়েস। মা-দিদিমাদের কাছ থেকে বাড়ির ছোটরাও শিখে নিত পিঠে তৈরির কৌশল। পাটিসাপ্টা, মালপোয়া, পুলিপিঠের চাহিদা আছে। কত রকমের পিঠা তৈরি হতো। বহু পিঠের নামও এখন ভুলে গিয়েছেন অনেকে। কিন্তু কেন এমন হাল? কেন পিঠে তৈরিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন নতুন প্রজন্মের মহিলারা?

কল্যানপুর বাজার কলোনীর বাসিন্দা জনৈকা স্কুল শিক্ষিকা এক তরুণীর কথায়, ‘বাচ্চা সামলে, চাকরি সামলে পিঠে তৈরির আর সময় থাকে না। তাই দোকানের পিঠের উপরেই ভরসা করতে হয়। ছোটবেলায় বাড়িতে মায়ের হাতেই তৈরি পিঠে খেতাম। কমলনগর এলাকার রাধারাণী দাস বিগত কয়েক বছর ধরে পিঠা বানিয়েই জীবিকা নির্বাহ করে চলছে, উনার কথায় হাট বাজার কিংবা যেকোনো মেলা, অনুষ্ঠানে তিনি পিঠা বিক্রি করেন। পৌষ পার্বণেও পিঠা বিক্রিতে বাড়তি আয় করেন। এর মধ্যেও গ্রামেগঞ্জে এখনও কিছু বাড়ি আছে, যেখানে পৌষ সংক্রান্তিতে পিঠে তৈরি হয়। কল্যানপুর বাজার এলাকার এক গৃহবধু বলেন বিয়ের পরে স্বামী আমার হাতে পিঠে খেতে চাইতেন। ওঁর ইচ্ছা পূরণ করতেই শাশুড়ির কাছ থেকে শিখে নিয়েছি। পিঠে তৈরিতে চালের গুঁড়া অপরিহার্য, কিন্তু মেসিনের তৈরি চালের গুঁড়াতে সব পিঠা ভাল হয় না। কল্যানপুর ফরেস্ট অফিস সংলগ্ন খোকন দেবনাথের বাড়িতে দেখা গেল ঢেঁকি। আশপাশের মহিলারা ওই বাড়িতে এসে চাল ঢেঁকিতে কুটে নিয়ে যাচ্ছেন।

জানা গেল, বিগত বছরেও পাশ্ববর্তী মহিলারা চাল কুটে নিয়ে গিয়েছেন। এখন অনেকে মেশিনেও চাল কোটেন। কিন্তু মেশিনে চাল কুটলে পিঠের স্বাদ কমে যায় বলেই জানিয়েছেন মহিলারা। এবছর কল্যাণপুর ব্লক এলাকার পূর্ব কুঞ্জবন গ্রামে নতুন করে বসেছে চালের গুঁড়া করার পাল রাইস মিল। প্রতিনিয়ত এই মিলে যান্ত্রিকতায় অতি সহজেই চালের গুঁড়া হচ্ছে প্রতি কেজি পনেরো টাকা করে। এলাকার মানুষও প্রতিদিন ভিড় জমাচ্ছেন। মিলের মালিক জানায় সন্নিহিত অঞ্চলের গ্রামের মানুষ ছাড়াও বিভিন্ন দোকানদার বেশী পরিমানে চালের গুঁড়া বানিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এই মেসিনে প্রতি ঘন্টায় কুড়ি কেজি চালের গুঁড়া করা সম্ভব হচ্ছে। সব কিছু মিলিয়ে পিঠার স্বাদ যতই কমোক না কেন তবু সময়ের তাগিদে চিরাচরিত ঢেঁকিকে স্বর্গে পৌঁছে দিয়েই যান্ত্রিকতায় আকৃষ্ট হচ্ছে সাধারণ মানুষ তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।