নিউ ইয়র্ক, ২৮ সেপ্টেম্বর — জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস. জয়শঙ্কর এক জোরালো বক্তব্যে বলেন, “ভারতের এক প্রতিবেশী দেশ রয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবাদের কেন্দ্রস্থল হিসেবে চিহ্নিত। স্বাধীনতার পর থেকেই ভারত এই সন্ত্রাসবাদী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে।” তিনি উল্লেখ করেন, বিগত কয়েক দশক ধরেই বড়সড় আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী হামলার মূল সূত্রপাত সেই দেশ থেকেই হয়েছে এবং জাতিসংঘের সন্ত্রাসবাদী তালিকায় ওই দেশের বহু নাগরিকের নাম রয়েছে।
তিনি এপ্রিলে জম্মু-কাশ্মীরের পাহেলগামে নিরপরাধ পর্যটকদের হত্যার উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, ভারত তার জনগণকে সুরক্ষা দিতে এবং অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে। ড. জয়শঙ্কর বলেন, “সন্ত্রাসবাদ একটি বৈশ্বিক হুমকি এবং এটি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও গভীর হওয়া প্রয়োজন।”
জাতিসংঘের কার্যকারিতা প্রসঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আজ জাতিসংঘ একটি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সংস্কারের প্রতিরোধ জাতিসংঘের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষয়িষ্ণু হওয়ার মূল কারণ।” তিনি নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী এবং অস্থায়ী দুই ধরণের সদস্যপদের সম্প্রসারণের আহ্বান জানান এবং বলেন, “একটি সংস্কারযুক্ত পরিষদকে অবশ্যই বিশ্ব বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটাতে হবে, এবং ভারত এতে বৃহত্তর দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত।”
বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে তিনি বলেন, “আজকের বিশ্বে শুল্ক নীতির অস্থিরতা, বাজার প্রবেশে অনিশ্চয়তা এবং কিছু নির্দিষ্ট উৎস বা বাজারের উপর অতিনির্ভরতা থেকে নিজেকে মুক্ত করা এখন জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।” ২০২২ সাল থেকে শুরু হওয়া সংঘর্ষ ও অস্থিরতার জেরে খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা প্রথম ধাক্কা খেয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
ড. জয়শঙ্কর বলেন, “ভারত সবসময় তার নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা বজায় রাখবে এবং বিশ্ব দক্ষিণের পক্ষে দৃঢ় কণ্ঠস্বর হয়ে থাকবে।” তিনি ভারতের তিনটি মূলনীতি — আত্মনির্ভরতা (আত্মনির্ভরতা), আত্মরক্ষা (আত্মরক্ষা), ও আত্মবিশ্বাস (আত্মবিশ্বাস) —- কে ভারতের সমসাময়িক বৈদেশিক নীতির মূল দর্শন হিসেবে তুলে ধরেন।
জাতিসংঘে নিজের কর্মসূচির অংশ হিসেবে ড. জয়শঙ্কর নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে জাতিসংঘের ৮০ বছর পূর্তি, বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক প্রবণতা এবং হটস্পট ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়। তিনি ৮০তম সাধারণ পরিষদের সভানেত্রী অ্যানালেনা বেয়ারবকের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন এবং ভারতের পূর্ণ সমর্থনের আশ্বাস দেন।
এক সোশ্যাল মিডিয়া বার্তায় তিনি লেখেন, “ভারত জাতিসংঘের সঙ্গে একসাথে কাজ করে চলবে, যাতে তা সময়োপযোগী ও বাস্তবমুখী হয়ে ওঠে।”
এছাড়াও, ড. জয়শঙ্কর সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান ও আলজেরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আহমেদ আতাফের সঙ্গে বৈঠক করেন। আলোচনায় দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা, মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি ও পারস্পরিক সম্পর্ক জোরদার করার বিষয়ে মতবিনিময় হয়।
জাতিসংঘের অধিবেশনের ফাঁকে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ বলেন, “রাশিয়া ভারতের জাতীয় স্বার্থ ও স্বাধীন পররাষ্ট্র নীতিকে সম্পূর্ণ সম্মান জানায়।” তিনি স্পষ্ট বলেন, “ভারতের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনও দেশের সম্পর্ক কখনও রাশিয়া-ভারত সম্পর্কের মানদণ্ড হতে পারে না।”
লাভরভ আরও বলেন, ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে একটি “বিশেষ কৌশলগত অংশীদারিত্ব” বিদ্যমান এবং তা বহুমাত্রিক ও শক্তিশালী। তিনি ড. জয়শঙ্করের শক্ত অবস্থানের প্রশংসা করেন, বিশেষ করে যখন তিনি বলেন, “তেল কেনার বিষয়ে সিদ্ধান্ত জাতীয় সার্বভৌমত্বের বিষয় — তা অন্য কেউ নির্ধারণ করতে পারে না।”
জাতিসংঘে ভারতের এই সক্রিয় কূটনৈতিক অবস্থান ও স্পষ্ট বার্তা আন্তর্জাতিক মহলে ভারতের অবস্থানকে আরও দৃঢ় করার পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

