লেহে যুব-নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভে উত্তেজনা: রাজ্যত্ব ও ষষ্ঠ তফসিলসহ চার দফা দাবিতে সহিংস রূপ

লেহ, ২৪ সেপ্টেম্বর – কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল লাদাখের রাজধানী লেহ-তে চলমান যুব-নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভ বুধবার হঠাৎ করে সহিংস রূপ ধারণ করে, যখন বিক্ষোভকারীরা বিজেপির কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ করে ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা লেহ এপেক্স বডি (এএলবি) ও কারগিল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স (কেডিএ) বিগত চার বছর ধরে যে চার দফা দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে আসছে, তা পূরণের দাবিতে জনঅসন্তোষ এবার সহিংসতার রূপ নেয়। মূলত: রাজ্যত্ব, সংবিধানের ষষ্ঠ সূচীর অন্তর্ভুক্তি, লাদাখের জন্য পৃথক সরকারি কর্ম কমিশন এবং দুটি সংসদীয় আসনের দাবিকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ তীব্র হয়েছে। ২০১৯ সালে জম্মু-কাশ্মীর রাজ্যকে বিভক্ত করে কেন্দ্র সরকার লাদাখকে পৃথক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করলেও, এতে স্থানীয় মানুষের আত্মপরিচয় ও সাংবিধানিক সুরক্ষার চাহিদা পূরণ হয়নি বলে অভিযোগ উঠছে। এর আগে ১০ সেপ্টেম্বর থেকে লেহ এপেক্স বডির নেতৃত্বে ১৫ জন সদস্য দীর্ঘ ৩৫ দিনের অনশন শুরু করেন। এর মধ্যে দুজনের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে মঙ্গলবার রাতে তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, যা আন্দোলনের গতি আরও তীব্র করে তোলে। এর জেরে এএলবি-র যুব শাখা বুধবার লেহ শহরে ব্যাপক শাটডাউন ও বিক্ষোভের ডাক দেয়।

বিক্ষোভ চলাকালে বিজেপির লেহ কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ করা হয় এবং শহরের একাধিক স্থানে পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে পার্টি অফিসে, এবং পেছন থেকে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠছে। পুলিশের গাড়িতেও আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়, এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাস ছোড়ে। যদিও এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি, তবে এই ঘটনার ফলে লেহ শহরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। বিশিষ্ট পরিবেশ ও সামাজিক কর্মী সোনম ওয়াংচুক, যিনি দীর্ঘদিন ধরেই এই আন্দোলনের এক মুখ্য মুখ, বিক্ষোভের সহিংস রূপে গভীর হতাশা প্রকাশ করে অনশন ভেঙে দেন এবং আন্দোলনকারীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “মানুষ বলছে, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে কিছু হচ্ছে না। আমরা চাই না এমন কিছু হোক যা ভারতের জন্য বিব্রতকর হবে। শান্তি বজায় থাকাই শ্রেয়।”

আন্দোলনকারীদের দাবি, কেন্দ্র সরকার আলোচনার নামে শুধু সময়ক্ষেপণ করছে। গত মে মাসে সর্বশেষ আলোচনার পর গৃহ মন্ত্রণালয় ৬ অক্টোবর পরবর্তী বৈঠকের তারিখ ঘোষণা করলেও তা লেহ এপেক্স বডির সঙ্গে পূর্বপরিকল্পিত না হওয়ায় তারা এটিকে ‘উপেক্ষার প্রতীক’ হিসেবে দেখছে। এই একতরফা সিদ্ধান্তের প্রতিবাদেই আন্দোলন আরও চরমে পৌঁছেছে। লাদাখের জনগণের অভিযোগ, জম্মু-কাশ্মীর পুনর্গঠনের সময় যে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল—বিশেষ করে ষষ্ঠ সূচীর মাধ্যমে তাদের সাংবিধানিক অধিকার সংরক্ষণের—তা এখনও পূরণ হয়নি। ষষ্ঠ সূচীর অন্তর্ভুক্ত হলে লাদাখের উপজাতি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভূমি, সংস্কৃতি, আইন এবং প্রশাসনের উপর অধিকতর নিয়ন্ত্রণ থাকবে, যেমনটা উত্তর-পূর্ব ভারতের কয়েকটি রাজ্যে রয়েছে।

এদিকে, বেকারত্ব লাদাখের তরুণ সমাজের মধ্যে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক সরকারি তথ্য অনুযায়ী, লাদাখে স্নাতক বেকারত্বের হার ২৬.৫ শতাংশ, যা দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এই প্রেক্ষিতে আলাদা পাবলিক সার্ভিস কমিশনের দাবিও সামনে এসেছে, যাতে স্থানীয়দের জন্য সরকারি চাকরির সুযোগ বাড়ে। যদিও কেন্দ্র সরকার ৯৫% স্থানীয় সংরক্ষণের প্রস্তাব দিয়েছিল, আন্দোলনকারীদের মতে তা এখনও বাস্তবায়নের পথে নেই। আন্দোলনের অপর একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি হচ্ছে—বর্তমানে লাদাখের জন্য বরাদ্দ একমাত্র লোকসভা আসন বাড়িয়ে দুইটি করা, যাতে সংসদে তাদের প্রতিনিধি সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।

কারগিল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্সের নেতা সাজাদ কারগিলি বলেছেন, “লাদাখ, একসময় শান্তিপূর্ণ অঞ্চল ছিল, কিন্তু কেন্দ্রের ব্যর্থ ইউটি পরীক্ষার কারণে এখন হতাশা ও অনিরাপত্তায় ভুগছে। দায়ভার সরকারের ওপর—আলোচনা আবার শুরু করুন, বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে কাজ করুন এবং রাজ্যত্ব ও ষষ্ঠ সূচীর দাবি মেনে নিন।” তিনি আন্দোলনকারীদের প্রতি শান্তি বজায় রাখারও আহ্বান জানান।

এই পরিস্থিতিতে লাদাখের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে সংশয় আরও গভীর হচ্ছে। আন্দোলনের নেতারা পরিষ্কার করে জানিয়েছেন, দাবি না মানা পর্যন্ত তারা পিছপা হবেন না। তবে সহিংসতা রোধে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে—এমনটাই বারবার বলছেন সোনম ওয়াংচুকসহ অন্যান্য গণ্যমান্য নাগরিক। এখন দেখার বিষয়, কেন্দ্র সরকার ৬ অক্টোবরের আলোচনায় কী রূপরেখা নিয়ে আসে, এবং তা লাদাখের জনগণের দীর্ঘদিনের দাবিকে কতটা প্রতিফলিত করে।