দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তার উপর চাঞ্চল্যকর হামলা, ধৃত অভিযুক্ত

নয়াদিল্লি, ২০ আগস্ট : রাজধানী দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তার উপর বুধবার সকালে জনসুনাওয়ি চলাকালীন চাঞ্চল্যকর হামলার ঘটনা ঘটেছে। মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবন সিভিল লাইন্সে ‘জনসুনাওয়ি’ বা সাধারণ মানুষের অভিযোগ শোনার সভা চলাকালীন এক ব্যক্তি আচমকাই তাঁকে আক্রমণ করে। ওই ব্যক্তি প্রথমে মুখ্যমন্ত্রীর হাতে কিছু কাগজ তুলে দেন, তারপর অকস্মাৎ চিৎকার করে উঠে মুখ্যমন্ত্রীকে চড় মারেন, তাঁর চুল ধরে টেনে মারধর করেন এবং অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করেন।

এই অভূতপূর্ব হামলার ঘটনায় দিল্লি পুলিশ ইতিমধ্যেই অভিযুক্তকে আটক করেছে এবং জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়েছে। গোটা ঘটনার তদন্তে এখন দিল্লি পুলিশ কমিশনার এস.বি.কে. সিং নিজে নজরদারি করছেন। এদিকে বিজেপি এই হামলাকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বলে অভিযোগ করেছে, আর বিরোধী দল আপ ঘটনার কড়া নিন্দা করে দোষীদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছে।

বুধবার সকাল সাড়ে সাতটা নাগাদ মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা তাঁর বাসভবনে সাধারণ মানুষের অভিযোগ শুনছিলেন। সেই সময় রাজেশ সাকারিয়া নামক এক ব্যক্তি সেখানে উপস্থিত হন। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, তিনি কিছু নথি দেখিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে চান। মুখ্যমন্ত্রী সেই সময়ে তাঁকে মনোযোগ দিয়ে শোনার চেষ্টা করছিলেন। আচমকা রাজেশ উত্তেজিত হয়ে পড়েন, চিৎকার করে ওঠেন এবং মুখ্যমন্ত্রীকে সজোরে চড় মারেন। এরপর তিনি মুখ্যমন্ত্রীর চুল ধরে টানতে থাকেন এবং তাঁকে একপ্রকার মাটিতে ফেলে দেন। তখন নিরাপত্তারক্ষীরা তৎক্ষণাৎ হস্তক্ষেপ করে অভিযুক্তকে আটক করেন।

প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, হামলাকারীকে দেখে মনে হচ্ছিল তিনি মদ্যপ ছিলেন, যদিও এ বিষয়ে এখনও পুলিশের তরফে কোনও নিশ্চিত তথ্য দেওয়া হয়নি। মুখ্যমন্ত্রী কিছুক্ষণের জন্য সম্পূর্ণ হতবাক হয়ে যান এবং তাঁর শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গিয়েছে বলেও জানা গেছে।

ধৃত ব্যক্তি রাজেশ ভাই খিমজি ভাই সাকারিয়া (৪১) গুজরাতের রাজকোটের বাসিন্দা। দিল্লি পুলিশ এবং গুজরাত পুলিশের যৌথ তদন্তে জানা গিয়েছে, রাজেশ বেশ কিছুদিন ধরেই মানসিকভাবে অস্থির ছিলেন। তাঁর মা ভানু সাকারিয়া সংবাদমাধ্যমে জানান, রাজেশ একজন পশুপ্রেমী, বিশেষ করে কুকুরের প্রতি তাঁর গভীর ভালবাসা রয়েছে। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট দিল্লি ও এনসিআর এলাকা থেকে রাস্তার কুকুরদের সরিয়ে বিভিন্ন শেল্টারে রাখার নির্দেশ দিয়েছে, যা রাজেশের কাছে অত্যন্ত কষ্টদায়ক ছিল। এই রায়ে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি দিল্লি চলে আসেন বলে তাঁর মা দাবি করেছেন।

তবে পুলিশি তদন্তে আরেকটি দিক উঠে এসেছে। জানা গিয়েছে, রাজেশের এক আত্মীয় বর্তমানে তিহার জেলে বন্দি, এবং রাজেশ সেই সম্পর্কিত কিছু কোর্টের নথি নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে সাহায্যের জন্য এসেছিলেন। এখনো পর্যন্ত স্পষ্ট নয় ঠিক কোন কারণে তিনি এই আক্রমণ চালিয়েছেন—পশুপ্রেম নাকি পারিবারিক সমস্যা। পুলিশ এই দুটি দিক থেকেই তদন্ত করছে।

অভিযুক্তের মাথা এবং হাতে চোটের চিহ্নও রয়েছে, যা থেকে অনুমান করা হচ্ছে, তিনি আগেই কোথাও আহত হয়েছিলেন অথবা হামলার সময়ই কোনও জিনিসে আঘাত পান।

এই ঘটনার পর দিল্লি পুলিশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। কিভাবে একজন ব্যক্তি মুখ্যমন্ত্রীর এত কাছে পৌঁছাতে পারলেন এবং তাঁকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করতে পারলেন—তা নিয়েই তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে প্রশাসনিক মহলে।

দিল্লি পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পুলিশ কমিশনার নিজে গোটা তদন্তের তত্ত্বাবধান করবেন। এদিকে মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

ঘটনার পরপরই দিল্লি বিজেপির সভাপতি বীরেন্দ্র সচদেব সংবাদমাধ্যমকে জানান, “এক ব্যক্তি জনসুনাওয়ির সময় মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আসেন, কিছু কাগজ দেখান এবং হঠাৎ করেই তাঁকে টানাটানি শুরু করেন। এতে একটি টেবিলের ধার দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী সামান্য আঘাত পান। তবে তিনি এখন স্থিতিশীল রয়েছেন।”

দিল্লি বিজেপির সহ-সভাপতি কপিল মিশ্র এই হামলাকে “ক্ষমাহীন অপরাধ” বলে অভিহিত করেন এবং বলেন, “একজন নারী, যিনি ২৪ ঘণ্টা দিল্লির মানুষের সেবা করছেন, তাঁর উপর এমন কাপুরুষোচিত হামলা নিন্দনীয়।”

অপরদিকে, দিল্লি বিধানসভার বিরোধী দলনেত্রী ও আপ নেত্রী আতিশি বলেন, “গণতন্ত্রে মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু হিংসার কোনও স্থান নেই। মুখ্যমন্ত্রীর উপর হামলা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক ও নিন্দনীয়। দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।”

মুখ্যমন্ত্রীর প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পন্ন হয়েছে এবং তাঁর মেডিকো-লিগ্যাল কেস রেজিস্টার করা হয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, তিনি মানসিকভাবে কিছুটা বিপর্যস্ত থাকলেও তাঁর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল। তবে মাথায় সামান্য চোট লাগার সম্ভাবনা নিয়ে পর্যবেক্ষণ চলছে।

পুলিশ অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইপিসি-র একাধিক ধারায় মামলা রুজু করছে। তদন্তে উঠে এসেছে, রাজেশ সাকারিয়া গত ২৪ ঘণ্টা ধরে মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনের আশেপাশে ঘোরাফেরা করছিলেন। পুলিশের ধারণা, সে আগে থেকেই পরিকল্পনা করে রেখেছিল মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পৌঁছনোর।

এই চাঞ্চল্যকর ঘটনা শুধু দিল্লির প্রশাসনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে তাই নয়, একইসঙ্গে রাজনৈতিক উত্তেজনারও জন্ম দিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তার উপর প্রকাশ্যে এমন হামলা প্রমাণ করে, জননেতাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আরও কঠোর নজরদারির প্রয়োজন। এখন দেখার বিষয়, এই ঘটনার পেছনে ব্যক্তিগত রাগ, মানসিক অসুস্থতা, না কি কোনও বৃহত্তর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র আছে—তা তদন্তেই স্পষ্ট হবে।