নয়াদিল্লি, ১৩ আগস্ট:দেশজুড়ে নির্বাচন ব্যবস্থা ও ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্কের মাঝেই কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে চাঞ্চল্যকর মোড়। বিজেপি এবার পাল্টা আক্রমণে উঠে সোনিয়া গান্ধীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলেছে। দলের অভিযোগ, প্রাক্তন কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধীর নাম ১৯৮০ থেকে ১৯৮২ সালের মধ্যে ভারতের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যখন তিনি এখনকার মতো ভারতের নাগরিক ছিলেন না।
প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুর সাংবাদিক বৈঠকে বলেন, “১৯৮০ সালে, ইন্দিরা গান্ধীর সরকার ক্ষমতায় ফেরার আগে, সোনিয়া গান্ধীর নাম দিল্লির ভোটার তালিকায় যুক্ত হয়। অথচ তিনি তখনও ভারতীয় নাগরিকত্ব পাননি। এটা সরাসরি নির্বাচনী আইন লঙ্ঘন।”
এই অভিযোগের সূত্রপাত বিজেপির তথ্যপ্রযুক্তি শাখার প্রধান অমিত মালব্যর একটি পোস্ট থেকে, যেখানে তিনি এক পুরনো ভোটার তালিকার অংশবিশেষের একটি ফটোকপি প্রকাশ করেন, দাবি করে সেটি ১৯৮০ সালের, যেখানে সোনিয়া গান্ধীর নাম ছিল। তাঁর ভাষায়, “এটাই যদি প্রকাশ্য নির্বাচনী জালিয়াতি না হয়, তাহলে আর কী?”
মালব্য আরও দাবি করেন, সোনিয়া গান্ধীর নাম নয়াদিল্লি সংসদীয় কেন্দ্রের ভোটার তালিকায় একটি সংশোধন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যুক্ত করা হয়। তখন তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সরকারি বাসভবনে থাকতেন। এই যুক্তির মাধ্যমে বিজেপি ইঙ্গিত করেছে, এটি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপেই ঘটেছিল।
পরবর্তী সময়ে, ১৯৮২ সালে ব্যাপক সমালোচনার মুখে তাঁর নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়, এবং ১৯৮৩ সালে নাগরিকত্ব পাওয়ার পর পুনরায় ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে অমিত মালব্য এখানেও জালিয়াতির অভিযোগ এনেছেন। তাঁর বক্তব্য, ভোটার তালিকায় নাম ওঠার জন্য কাটা তারিখ ছিল ১৯৮৩ সালের ১ জানুয়ারি, অথচ সোনিয়া গান্ধী নাগরিকত্ব পান এপ্রিল ১৯৮৩-তে। ফলে তাঁর নাম তোলাও নিয়মবিরুদ্ধ।
অনুরাগ ঠাকুর এ প্রসঙ্গে রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধেও আক্রমণ শানান। সম্প্রতি কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক ও বিহারে ভোটার তালিকায় জালিয়াতির অভিযোগ তুলেছেন। অনুরাগ ঠাকুর বলেন, “রাহুল গান্ধী মিথ্যা বলছেন। তিনি ভুয়ো পরিসংখ্যান দিচ্ছেন এবং সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছেন।”
বিজেপির এই অভিযোগে পাল্টা জবাব দিয়েছে কংগ্রেস। দলের সিনিয়র নেতা তারিক আনোয়ার বলেন, “সোনিয়া গান্ধী নিজে কখনও ভোটার তালিকায় নাম তোলার আবেদন করেননি। নির্বাচন কমিশনই নিজের উদ্যোগে তাঁর নাম তালিকায় তোলে।”
তিনি বলেন, “কমিশন একটি স্বাধীন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। তখন কংগ্রেস সরকার থাকলেও, নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব প্রক্রিয়া অনুযায়ী নাম তোলা বা বাদ দেওয়া হত। আজ বিজেপি কমিশনকে নিজেদের হাতিয়ার বানিয়ে ফেলেছে।”
প্রেস থেকে প্রশ্ন আসে, ইন্দিরা গান্ধীর সরকার কি কমিশনকে প্রভাবিত করেছিল? উত্তরে কংগ্রেস জানায়, “আজকের মতো নয়, তখন কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করত। এখন বিজেপির নির্দেশে চলে নির্বাচন কমিশন। তারা যেন রাজনৈতিক চাপ থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করে, সেটাই আমরা চাই।”
বিজেপি যখন ইতিহাস ঘেঁটে পাল্টা আক্রমণ করছে, তখন কংগ্রেস সাম্প্রতিক নির্বাচনে জালিয়াতির অভিযোগে সরব। কর্ণাটকে কংগ্রেস দাবি করেছে, শুধু একটি এক কামরার ঘর থেকে ৮০টি ভোটার আইডি পাওয়া গেছে। মহাদেবপুরা আসনে মোট ১.০২ লক্ষ ভুয়ো ভোট গণনা হয়েছে বলেও অভিযোগ।
রাহুল গান্ধী বলেন, “এই ভোট জালিয়াতি আমাদের একটি লোকসভা আসন খরচ করে দিয়েছে।” একইসঙ্গে মহারাষ্ট্রে লোকসভা ভোটে হারের পরে বিধানসভা ভোটে বিজেপির জয় নিয়েও কংগ্রেস প্রশ্ন তুলেছে। সেখানে এক কোটির বেশি নতুন ভোটার নাম তালিকাভুক্ত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
বিহারে ভোটের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে বিরোধীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কংগ্রেসের দাবি, লক্ষ লক্ষ গরিব, সংখ্যালঘু ও দলিত ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া হতে পারে।
এই যাবতীয় অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশনও কড়া জবাব দিয়েছে। কমিশন জানিয়েছে, সমস্ত প্রক্রিয়া স্বচ্ছ এবং ন্যায্য। রাহুল গান্ধীকে উদ্দেশ করে কমিশনের বক্তব্য, “তিনি যেন হালফনামা দিয়ে তাঁর অভিযোগের প্রমাণ দেন। শুধু মুখে অভিযোগ করলেই চলবে না।”
কমিশন আরও দাবি করেছে, ২০১৮ সালে কংগ্রেস নেতা কমল নাথ একটি মামলা করে আদালতকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিলেন। এই প্রসঙ্গ টেনে কমিশন বলেছে, “কংগ্রেস আগেও এমন করেছে, আজও করছে।”
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বিহারে এক জনসভায় বলেন, “আপনারা বারবার হেরেছেন। এবার বিহারের ভোটের আগেই অজুহাত খুঁজছেন, ভোটের ফল মানতে পারবেন না বলে। অথচ মানুষ আপনাদের প্রত্যাখ্যান করেছে বারবার।”
বিজেপির পক্ষ থেকে ৪৫ বছর পুরনো একটি বিতর্ককে সামনে এনে কংগ্রেসের ভোটার তালিকায় অনিয়ম নিয়ে অভিযোগ তোলা নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক চাল। কংগ্রেস বলছে, এটা বর্তমান নির্বাচন প্রক্রিয়ায় যে দুর্নীতি ও পক্ষপাত চলছে, তা থেকে মন ঘোরানোর কৌশল মাত্র।
এই পরিস্থিতিতে, প্রশ্ন উঠছে — দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা কি সত্যিই নিরপেক্ষ আছে? কমিশন কি রাজনৈতিক চাপমুক্ত? আর ভোটার হিসেবে সাধারণ মানুষের আস্থা কি ফেরানো সম্ভব? উত্তরের দায় রাজনীতিকদেরও, কমিশনেরও।

