Home / দিনের খবর / ভারতের বিরুদ্ধে মার্কিন ও ইউরোপীয় চাপের জবাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কড়া অবস্থান: “সার্বভৌমত্ব নিয়ে আপস নয়”

ভারতের বিরুদ্ধে মার্কিন ও ইউরোপীয় চাপের জবাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কড়া অবস্থান: “সার্বভৌমত্ব নিয়ে আপস নয়”

নয়াদিল্লি, ৬ আগস্ট : রাশিয়ান তেল আমদানির কারণে ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক চাপের মুখে, দীর্ঘদিনের সংযমের পর ভারত সরকারের তরফে অবশেষে একটি শক্ত অবস্থান প্রকাশ করা হলো। সোমবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞা এবং আর্থিক চাপকে “অন্যায্য ও অযৌক্তিক” বলে অভিহিত করে জানিয়েছে যে, ভারতের সার্বভৌম নীতিগত অবস্থানে হস্তক্ষেপ মেনে নেওয়া হবে না।

এই বিবৃতিটি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন যে ভারতীয় রিফাইনারিগুলোর রাশিয়ান তেল আমদানি, প্রক্রিয়াকরণ ও রপ্তানির কারণে ভারতের পণ্যের ওপর “বর্তমান ২৫ শতাংশের চেয়েও অনেক বেশি” হারে শুল্ক আরোপ করা হবে। এই সিদ্ধান্ত চলতি সপ্তাহেই কার্যকর হওয়ার কথা। এর আগের দিনই ট্রাম্পের এক ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা ভারতকে সরাসরি রাশিয়ার ইউক্রেন যুদ্ধের “আর্থিক মদতদাতা” বলে দায়ী করেন।

এদিকে, জুলাই ১৮ তারিখে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভারতের ভাদিনার রিফাইনারি (যার আংশিক মালিক রুশ সংস্থা) এবং অন্যান্য ভারতীয় তেল পরিশোধন সংস্থাগুলোর উপর নতুন নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ইইউ-র মতে, এই প্রতিষ্ঠানগুলো রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে লাভবান হচ্ছে। এই পদক্ষেপের আওতায় পড়বে তথাকথিত “সেকনডারি সানক্শনস”, যার ফলে পশ্চিমি সংস্থাগুলো ভারতীয় রিফাইনারিগুলোর সঙ্গে লেনদেন করতে দ্বিধাগ্রস্ত হবে — যা ভারতীয় অর্থনীতির জন্য একটি গুরুতর উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।

এমইএ-এর বিবৃতিতে সাফ জানানো হয়েছে, পশ্চিমা দেশগুলোর এই ধরনের পদক্ষেপ দ্বৈত নীতির পরিচয় বহন করে। তারা একদিকে নিজেরা রাশিয়া থেকে তরল প্রাকৃতিক গ্যাস, পরমাণু জ্বালানি ও মূল্যবান খনিজ আমদানি অব্যাহত রেখেছে; অন্যদিকে ভারতের ওপর তেল আমদানির কারণে চাপ সৃষ্টি করছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ-ও স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই ভারতকে রাশিয়ান তেল কিনতে উৎসাহিত করেছিল, যাতে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে থাকে — একটি বক্তব্য যা বাইডেন প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকারও করেছিল।

ভারত সরকার জানিয়েছে, রাশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানি বর্তমানে ভারতের জন্য একটি “জাতীয় বাধ্যবাধকতা”। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক তেল সরবরাহে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার প্রেক্ষিতে বিকল্প উৎসের অভাবে ভারতকে সাশ্রয়ী মূল্যে জ্বালানি আমদানি করতে হচ্ছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেওয়া “অন্যায্য” এবং এর ফলে ভারতের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।

সোমবারের বিবৃতির কয়েকদিন আগে, বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল মন্তব্য করেন যে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের ওপর ২৫ শতাংশ “পাল্টা শুল্ক” আরোপ করতে চলেছে, যা ৭ আগস্ট থেকে কার্যকর হবে। এই শুল্ক মূলত কৃষিপণ্য, রত্ন ও গয়না, এবং কিছু প্রযুক্তি সামগ্রীর ওপর প্রযোজ্য হবে। এমন পদক্ষেপ মূলত ভারতের পক্ষ থেকে মার্কিন কৃষিপণ্য, দুগ্ধজাত দ্রব্য ও জেনেটিকালি মডিফাইড খাদ্যের প্রবেশাধিকার দিতে অস্বীকৃতির প্রতিক্রিয়ায় এসেছে। ট্রাম্প সম্প্রতি বলেছেন, “ভারত কখনোই ভালো বাণিজ্যিক অংশীদার ছিল না” — যা একাধিক বাণিজ্য আলোচনার ব্যর্থতার ইঙ্গিতবাহী।

এদিকে, ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল এবং বিদেশমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর বর্তমানে মস্কো সফরে রয়েছেন, যেখানে রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের আসন্ন ভারত সফরের প্রস্তুতি চলছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষায়, “ভারত তার কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ” এবং তার আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বা অংশীদারিত্বে কে থাকবে তা পশ্চিমা বিশ্ব নির্ধারণ করতে পারে না।

এছাড়া, ভারতের সম্প্রসারিত ভূমিকা — যেমন ব্রিক্স-এ সক্রিয় অংশগ্রহণ, পাকিস্তান নিয়ে নীতিগত অবস্থান, অপারেশন সিন্দুর ও অভিবাসন নীতিতে আমেরিকার চাপ — এসব কিছুই ভারতের কূটনৈতিক অসন্তোষের পেছনে ভূমিকা রেখেছে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।

মোটকথায়, সোমবারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি এক নতুন কূটনৈতিক বাস্তবতার ঘোষণা। পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার প্রয়াস অব্যাহত থাকলেও, ভারতের স্পষ্ট বার্তা — তারা আর একতরফা চাপ সহ্য করবে না। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র হিসেবে ভারত তার পররাষ্ট্রনীতি ও কৌশলগত পছন্দের ক্ষেত্রে স্বাধীন। এবং সেই স্বাধীনতাই ভারত এই বিবৃতির মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে স্মরণ করিয়ে দিল।