আগরতলা, ৩০ নভেম্বর: ত্রিপুরার আগর শিল্পকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কাজ করছে রাজ্য সরকার। কদমতলা ব্লকের বরগুল এলাকায় একটি আগর হাব গড়ে তোলারও কাজ করা হচ্ছে। এই হাব আগর ব্যবসায়ীদের উন্নয়নে সহায়ক হবে এবং নতুন প্রজন্মকে এই শিল্পে আগ্রহী করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলার নামকরণের সাথে আগর গাছের এক গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বলা হয়, আগর গাছের নাম থেকেই আগরতলার নামকরণ হয়েছে। যদিও বর্তমানে আগরতলায় আগর গাছ তেমন দেখা যায় না। তবে উত্তর ত্রিপুরা জেলার কদমতলা ব্লক এই গাছের জন্য বেশ পরিচিত। এই এলাকার উত্তর ফুলবাড়ী গ্রামের মোহাম্মদ আনফর আলী একজন প্রতিষ্ঠিত আগর ব্যবসায়ী এবং এই শিল্পের অন্যতম পথিকৃৎ।
মোহাম্মদ আনফর আলী প্রায় ২০ বছর ধরে তার ছয় কানি জমিতে আগর গাছের চাষ করছেন। বাড়িতেই তিনি একটি বৃহৎ আগর শিল্পের কারখানা গড়ে তুলেছেন যার নাম দিয়েছেন মামন এন্টারপ্রাইজ, যা ত্রিপুরা রাজ্যে তাকে একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত করেছে। তিনি ত্রিপুরা আগর অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক হিসেবেও নিযুক্ত রয়েছেন। তার বাগানে প্রায় ১০ হাজার ছোট-বড় আগর গাছ রয়েছে। এছাড়াও তিনি কদমতলা ব্লকের বিভিন্ন এলাকা থেকে আগর গাছ সংগ্রহ করেন।
তার ইন্ডাস্ট্রিতে প্রতিদিন প্রায় ৪০ থেকে ৪২টি পরিবারের লোকজন কাজ থাকে। প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত এখানে কাজ চলে। এই ইন্ডাস্ট্রিতে মূলত আগর গাছ থেকে আগর উড চিপস এবং আগর তেল উৎপাদন করা হয়, যা বহিররাজ্যে রপ্তানি করা হয়।
আনফর আলী জানান, ২০২২-২৩ অর্থবছরে গৃহীত এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ত্রিপুরা রাজ্যে প্রায় ৪ কোটি ৭১ লক্ষ পরিপক্ব আগর গাছ রয়েছে। তবে এই সংখ্যা পুনরায় যাচাই করা হচ্ছে। উত্তর ত্রিপুরার কদমতলা ব্লকেই সবচেয়ে বেশি এবং উন্নতমানের আগর গাছ রয়েছে।
আনফর আলী ত্রিপুরার আগর শিল্পকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কাজ করছেন। তিনি দিল্লিতে আয়োজিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেছেন এবং দেশের বিভিন্ন এলাকার চাষিদের পরামর্শ দিয়েছেন আগর গাছ সম্বন্ধে। তিনি উল্লেখ করেন, আগর গাছ থেকে শুধু চিপস ও তেল নয়, আরও বিভিন্ন ধরনের পণ্য উৎপাদন করা যায়, যেমন আগর গাছের পাতা থেকে চা , সাবান, ধূপ, সেন্ট, ইত্যাদি।
ত্রিপুরা সরকার কদমতলা ব্লকের বরগুল এলাকায় একটি আগর হাব গড়ে তোলার কাজ করছে। এই হাব আগর ব্যবসায়ীদের উন্নয়নে সহায়ক হবে এবং নতুন প্রজন্মকে এই শিল্পে আগ্রহী করবে। আনফর আলী বলেন, ত্রিপুরা থেকে সরাসরি বিদেশে আগর চিপস ও তেল রপ্তানির ব্যবস্থা করা গেলে রাজ্যের অর্থনীতি আরও মজবুত হবে এবং সরকারও বিপুল পরিমাণ রাজস্ব পাবে।
আনফর আলী দুই ভাইয়ের যৌথ পরিবারের একজন। তার স্ত্রী এবং দু ভাইয়ের চার সন্তান রয়েছে। পরিবারের খরচ ও তার ও ভাইয়ের সন্তানদের শিক্ষা এই আগর ব্যবসার আয়ের উপর নির্ভরশীল।ত্রিপুরার আগর শিল্প এক নতুন দিগন্তে পা রেখেছে। আনফর আলীর মতো উদ্যোগী ব্যক্তিদের প্রচেষ্টা এবং সরকারের সহায়তায় এই শিল্প আরও সমৃদ্ধ হতে পারে। আনফর আলী তরুণ প্রজন্মকে আহ্বান জানিয়েছেন এই শিল্পে যুক্ত হয়ে নিজেদের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থার উন্নতি করার পাশাপাশি দেশের অগ্রগতিতে অংশীদার হতে।
ত্রিপুরা রাজ্যের পিছিয়ে পড়া জনজাতি সম্প্রদায়ের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে আগর চাষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যদি রাজ্য সরকার এই সম্প্রদায়ের মানুষদের আগর চাষের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করে, তবে তারা নিজেদের আর্থিকভাবে স্বনির্ভর করতে পারবে।
এই ধরনের উদ্যোগ শুধুমাত্র তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নেই নয়, সামাজিক উন্নয়নেও সহায়ক হবে। এতে জনজাতি সম্প্রদায়ের জীবিকা আরও মজবুত হবে এবং তারা রাজ্যের সামগ্রিক উন্নয়নের ধারায় শামিল হতে পারবে। আগর শিল্পের প্রসারের মাধ্যমে পিছিয়ে পড়া এই মানুষদের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার এক অপার সম্ভাবনা রয়েছে।
ত্রিপুরার আগর শিল্প বর্তমানে এক নতুন দিগন্তে পৌঁছানোর পথে। আনফর আলীর মতো উদ্যোগী ব্যবসায়ীদের পরিশ্রম এবং সরকারের সহায়তায় এই শিল্প আরও সমৃদ্ধ হতে পারে।
আগামী ২-৪ ডিসেম্বর আগরতলার পলো টাওয়ারে একটি বিশেষ আগর প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। এতে দেশের বিভিন্ন স্থান ও বিদেশ থেকে ক্রেতারা আগর শিল্পের সাথে পরিচিত হতে এবং পণ্য কিনতে আসবেন।