নয়াদিল্লি, ১৩ আগস্ট : দেশের রাজধানী আজ ‘হর ঘর তিরঙ্গা’ বাইক র্যালির উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে জাতীয় গর্ব ও সর্বজনীন চেতনার এক উৎফুল্লপূর্ণ প্রদর্শনী প্রত্যক্ষ করেছে| স্বাধীনতা ও একতার চেতনায় দেশব্যাপী ‘হর ঘর তিরঙ্গা’ উদযাপনে শামিল হওয়ার অঙ্গীকার নিয়ে হাজার হাজার জনতা এই র্যালিতে যোগ দেন| উপরাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনখড় আজ সকালে নয়াদিল্লির ভারত মণ্ডপম থেকে এই ‘হর ঘর তিরঙ্গা’ বাইক র্যালির সূচনা করেন। কেন্দ্রীয় সংস্কৃতিমন্ত্রী গজেন্দ্র সিং শেখাওয়াত এবং সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজুও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। সমাবেশটি মেজর ধ্যানচাঁদ জাতীয় স্টেডিয়ামে শেষ হয়। “হর ঘর তিরঙ্গা” অভিযানটি “আজাদি কা অমৃত মহোৎসবে”র অংশ| দেশজুড়ে প্রতিটি বাড়িতে ত্রিবর্ণ জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা এই অভিযানের উদ্দেশ্য। আয়োজনটি বিকশিত ভারতের অভিযাত্রায় এক মাইলফলক হয়ে থাকবে বলে উল্লেখ করেন উপরাষ্ট্রপতি| কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি ও পর্যটনমন্ত্রী গজেন্দ্র সিং শেখাওয়াত বলেন, শুধুমাত্র স্বাধীনতা দিবসের উদযাপনই নয়, আমাদেরকে একসঙ্গে বেঁধে রাখা একতা ও শক্তিকে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্যও এই আয়োজন| অনুষ্ঠানে প্রাক্তন সাংসদ মীনাক্ষী লেখি, সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী মনসুখ এল. মান্ডব্য, অসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রী কে. রামমোহন নাইডু সহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন| অনুষ্ঠানে ভাষণ দিতে গিয়ে উপরাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনখড় বলেছেন, দেশের আসন্ন ৭৮তম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে দেশবাসীকে শুভেচ্ছে| ২০৪৭ সালের মধ্যে বিকশিত ভারতের যাত্রাপথে আজকের এই দিনটি সর্বদা স্মরণীয় হয়ে থাকবে| আমি আজ শক্তিতে পরিপূর্ণ ও প্রাণবন্ত গণমাধ্যমকে দেখতে পাচ্ছি। তারা জাতির মেজাজ ও এই সময়ের চেতনাকে প্রতিফলিত করে।
আজকের দিনটি আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। হর ঘর তিরঙ্গা একটি অভিযান, যা স্বাধীনতার অমৃত মহোৎসবের অংশ। ২০২১ সালে ভারতের স্বাধীনতার ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে জনগণকে ত্রিবর্ণ পতাকা বাড়িতে নিয়ে গিয়ে উত্তোলন করতে উৎসাহিত করার জন্য এই অভিযানের সূচনা হয়েছিল। এখন এটি একটি আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। তারপর থেকে কোটি কোটি মানুষ তাঁদের বাড়িতে প্রতি বছর ত্রিবর্ণ পতাকা উত্তোলন করে চলেছেন| আর আমার মনে কোনও সন্দেহ নেই যে, আগামী ১৫ই আগস্ট এই ক্ষেত্রে একটি নতুন রেকর্ড তৈরি হবে। প্রতিটি বাড়িতে একটি করে পতাকা উত্তোলিত হবে।
দেশবাসী, এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য হল, মানুষের চেতনায় দেশপ্রেমের অনুভূতি জাগিয়ে তোলা এবং ভারতের জাতীয় পতাকা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। নাগরিকদের জাতীয় চেতনায় সম্পৃক্ত করা অত্যন্ত প্রশংসার বিষয়। বিগত দশকে ভারত যে সাফল্য অর্জন করেছে, যে অভূতপূর্ব অগ্রগতি আমরা দেখেছি, সেজন্য বিশ্বের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান আমাদের প্রশংসা করেছে। সাধারণ মানুষের কাছে যে সুবিধাগুলি পৌঁছেছে, তাতে রাষ্ট্রীয় চেতনা আমাদের সকলকে সম্পূর্ণরূপে পরিপূর্ণ করে।
‘হর ঘর তিরঙ্গা’ আমাদের স্বাধীনতা, আমাদের গর্ব এবং উন্নত ভারতের প্রতি আমাদের অঙ্গীকারের প্রতীক। যা সবসময় ইঙ্গিত দেয় যে, এই শতাব্দী ভারতের শতাব্দী| আর তা কেন হবে না! কয়েক বছর আগে যেখানে অর্থনীতি নিয়ে ভারত বিশ্বের উদ্বেগের বিষয় ছিল, সেখানে আজ আমরা বিশ্বের তৃতীয় পরাশক্তি হওয়ার দিকে দ্রুত এগিয়ে চলেছি| আর আজ আমরা পঞ্চম স্থানে রয়েছি।
আমাদের পতাকা আমাদের ভারতীয়ত্বের প্রতীক। আমরা ভারতীয়। ভারতীয়ত্ব আমাদের পরিচয়। ভারত আমাদের রক্তে রয়েছে। ভারতীয়ত্বের কিছু চ্যালেঞ্জ আমাদের অস্তিত্বের জন্য চ্যালেঞ্জ| আর আমাদের সংকল্প হচ্ছে, আমরা সর্বদা ত্রিবর্ণ রঞ্জিত জাতীয় পতাকার সম্মান, গর্ব এবং সম্মানকে উঁচুতে রাখব।
ত্রিবর্ণ আমাদের আরও একটি জিনিস শেখায় এবং সংকেত প্রদান করে যে, পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, সর্বাগ্রে আমাদের দেশ। দেশের স্বার্থের ঊর্ধ্বে কোনও জাতীয় স্বার্থ থাকতে পারে না। গোটা দেশ এটা বুঝতে পেরেছে| কিন্তু কিছু মানুষ তাতে বিলম্বিত করছেন। কেউ কেউ জাতীয় স্বার্থকে রাজনৈতিক লাভের ঊর্ধ্বে রাখছেন না। আমি দেশের প্রত্যেক নাগরিককে আহ্বান জানাব যে, যেখানে জাতীয় স্বার্থ রয়েছে, সেখানে রাজনৈতিক লাভকে পিছনে রাখতে হবে। জাতীয় স্বার্থের বিষয়ে ঐকমত্য থাকা আবশ্যিক, কারণ ত্রিবর্ণ পতাকা এটিই থেকে আমাদের অনুপ্রেরণার উৎস।
আমি আপনাকে সেই দিনটির কথা মনে করিয়ে দিচ্ছি| আমি দুবার সেই জায়গায় গিয়েছি। ১৯৪৩ সালের ৩০ ডিসেম্বর আজাদ হিন্দ ফৌজের সর্বোচ্চ সেনানায়ক নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু, যাঁর নামে আমরা পরাক্রম দিবস শুরু করেছি, যাঁর মূর্তি কর্তব্য পথকে শোভিত করে, তিনি আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে ব্রিটিশ শাসনের সময় প্রথমবার ভারতের পতাকা উত্তোলন করে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে আমরা সবাই সেই মুহূর্তটিকে লালকেল্লায় অনুভব করেছি|
সাম্প্রতিক বছরগুলিতে আমরা দেখেছি, যাঁরা দেশের জন্য বলিদান দিয়েছেন, তাঁদেরকে আমরা আমাদের হৃদয়ে গেঁথে নিয়েছি। স্বাধীনতার অমৃত মহোৎসব-এ আমরা সেইসব মহান ব্যক্তিত্বদের স্মরণ করেছি। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের আন্দোলন ও যুদ্ধে যারা আত্মোৎসর্গ করেছেন, তাঁদেরকে দেশের প্রতিটি কোণ থেকে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং তাদের প্রতি যে আমাদের শ্রদ্ধা ও সম্মান সর্বদা রয়েছে, তা প্রদর্শিত হয়েছে।
বিরসা মুন্ডাজিকে কে ভুলতে পারে? এত অল্প বয়সেই তিনি দেশের জন্য কী করেননি| এখন তাঁর নামে যখন জনজাতি দিবসের নামকরণ করা হয়, তখন পুরো দেশে খুশির ঢেউ বয়ে গেছে। বর্তমানে আমাদের আনন্দ অপরিসীম। যে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলি বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে ও আমাদের আশেপাশের দেশকে সতর্ক করে, তারা আমাদের সাফল্যকে একটি উদাহরণ হিসাবে উপস্থাপনা করে যে, ভারত আজ বিশ্বের শান্তির সবচেয়ে বড় বার্তাবাহক। অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিকাশের গতি সম্পর্কে ভারতের কাছ থেকে শিখুন। বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এই কথাগুলো বলছে।
আমরা এখন আর কোনও প্রতিশ্রুতি বা সম্ভাবনাপূর্ণ জাতি নই; তার চেয়ে এগিয়ে আমরা আজ এমন একটি জাতিতে পরিণত হয়েছি, যে উত্থান এর আগে কখনও হয়নি। আর আমাদের এই উত্থান অপ্রতিরোধ্য। আমাদের এই উত্থান ২০৪৭ সালে আমরা যখন আমাদের স্বাধীনতার শতবর্ষ উদযাপন করব, তার আগে না হলেও তার মধ্যে আমাদেরকে একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করবে|
আমি প্রত্যেক ভারতীয়ের কাছে আবেদন জানাতে চাই যে, এই ম্যারাথন অভিযাত্রায় আপনিও একজন গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার| আর আজকের এই বাইক র্যালি, যে র্যালির সূচনা করার সুযোগ আজ আমি পেয়েছি, এটি সেই অভিযাত্রারই একটি অংশ| এটি সারা দেশে ঘটবে, এবং তা বছরের পর বছর আরও গতি অর্জন করবে।
বন্ধুগণ, সাথিগণ ও দেশবাসী, আমাদের উন্নয়নের যে তীব্র গতি, তাতে আমরা পারমাণবিক গতিতে এগিয়ে চলেছি। কেউ কেউ এটা বুঝতে পারেন না; তাঁরা বাধা সৃষ্টি করতে চান, অস্থিতিশীলতা আনতে চান। তাঁরা ভাবছেন যে, ভারত যদি এই গতিতে এগোতে থাকে, তাহলে নিশ্চিতভাবেই বিশ্বগুরু হয়ে উঠবে। যারা এই বাধা সৃষ্টি করে, তারা যে কোনও জায়গা থেকে উদ্ভূত যে কোনও তথ্যই সত্যি বলে মনে করে।
আমি দেশবাসীকে সতর্ক করতে চাই| আমি নাগরিকদের এই ধরনের ক্ষতিকর পরিকল্পনা সহ অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে অত্যন্ত সতর্ক থাকার আহ্বান জানাচ্ছি। তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হল ভারতকে অস্থিতিশীল করা, যাতে আমাদের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়।
আমার মনে কোনও সন্দেহ নেই যে, প্রত্যেক ভারতীয় আজকের এই দিনে সংকল্প নেবেন। আর এই সংকল্প হবে যে, দেশবিরোধী সমস্ত শক্তিকে দমন করা হবে| আর তা হবেই। প্রতিটি বাড়ির ত্রিবর্ণ পতাকা আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে এবং ভারতের বিরোধী শক্তিগুলিকে নিষ্ক্রিয় করতে অনুপ্রাণিত করে।
প্রত্যেক নাগরিকের কাছে আমার আবেদন, সব পরিস্থিতিতে, তা সে ব্যক্তিরই হোক, রাজনীতিরই হোক, সমাজেরই হোক, দেশের স্বার্থকে সর্বাগ্রে রাখতে হবে। আমাদের দেশের শত্রুদের পরাজিত করতে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে| আর যারা এই অভূতপূর্ব উন্নয়নকে হজম করতে পারছে না, তাদেরকে পথ দেখাতে হবে, তাদের হাত ধরে তাদের জ্ঞানবৃদ্ধি করাতে হবে এবং তাদেরকে ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। আমাদের সংস্কৃতি কত অসাধারণ। আমাদের রাষ্ট্রের পটভূমি এতটাই শক্তিশালী যে বিশ্বের কোনও দেশই এর সমতুল্য হতে পারে না।
আমি আজ শুধুমাত্র তেরঙ্গা র্যালির সূচনা করছি না; এটি আমাদের স্বাধীনতার শতবর্ষ উপলক্ষে উন্নত ভারতের জন্য ম্যারাথন অভিযাত্রার অংশ। আমি তার সূচনা করছি। আপনাদের সবাইকে আমি ধন্যবাদ জানাই| আপনারা ভারতীয়ত্বের শপথ নিয়ে এই বিষয়টি প্রত্যেক বাড়িতে, প্রত্যেক ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দিন| আর নিজেকে ও পরিবার, সমাজ, বন্ধুবান্ধব এবং সহকর্মীদেরও আশ্বস্ত করুন। প্রতিটি বাড়িতে ত্রিবর্ণ পতাকা উত্তোলন করুন। গর্বের সঙ্গে এই সংকল্প নিয়ে উত্তোলন করুন যেন এর গৌরব ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকে। যে কোনো পরিস্থিতিতেই আমাদের পতাকা যেন উঁচু হয়ে থাকে|

