কলকাতা, ২৪ জানুয়ারি (হি.স.): ফুটবল কিংবদন্তি ইউসেবিওর ‘কালো চিতা’ নামেও যিনি বিখ্যাত, তার জন্মদিন আগামীকাল। ১৯৪২ সালের ২৫ জানুয়ারি পর্তুগালের মোজাম্বিকের বস্তিতে জন্মেছিলেন ইউসেবিও দা সিলভা ফেরেইরা। রেলশ্রমিক শ্বেতাঙ্গ বাবা লরিন্ডো এবং আফ্রিকান কৃষ্ণাঙ্গ মা এলিসার ঘর আলো করে তার জন্ম হয়েছিল আফ্রিকার চিরায়ত দারিদ্র্যকে সঙ্গী করে। তবে সৃষ্টিকর্তা তাকে দু’হাত তুলে আশীর্বাদ করেছিলেন। তাই তার দুই পায়ে দিয়েছিলেন ফুটবল প্রতিভা। সেই প্রতিভার জাদু দিয়েই ষাট-সত্তরের দশক মন্ত্রমুগ্ধ করেছেন গোটা ফুটবল দুনিয়াকে।
বেনফিকার হয়ে ১৯৬১ তে অভিষেক ম্যাচেই হ্যাটট্রিক করে নিজের জাত চিনিয়েছিলেন। তারপর আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। পরের মরসুমে ইউরোপিয়ান কাপ ফাইনালে ডি স্টেফানো-পুসকাসের ইতিহাস বিখ্যাত রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে ইউসেবিও জাদুতে ইউরোপিয়ান কাপের মতো বড় আসরও জয় করেছিল বেনফিকা। ১৯৬০ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত বেনফিকার হয়ে মোট ১৫ বছর খেলেছেন ইউসেবিও। এই ১৫ বছরে বেনফিকা ১০টি লিগ এবং ৫টি পর্তুগিজ কাপ জিততে পেরেছিল কেবল ইউসেবিওর একক নৈপুণ্যে।
জাতীয় দলের হয়েও রয়েছে ইউসেবিওর অম্লান কীর্তি। ১৯৬৬ বিশ্বকাপের মাধ্যমে ফুটবল মানচিত্রে পর্তুগালের ফুটবলকে শক্ত অবস্থানে তুলে দিয়েছিলেন। ১৯৬৬ ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে প্রায় একক দক্ষতায় ভাঙাচোরা পর্তুগাল দলকে নিয়ে গিয়েছিলেন সেমিফাইনাল পর্যন্ত। সেই বিশ্বকাপে ইউসেবিওর পারফরম্যান্স রূপকথাকেও হার মানায়। মাত্র ২৪ মিনিটের মধ্যে ৩ গোল হজম করে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকেই যাচ্ছিল পর্তুগাল। কিন্তু ‘কালো চিতা’ জ্বলে উঠে ছিন্নভিন্ন করে দক্ষিণ কোরিয়াকে। পর্তুগাল ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত জেতে ৫-৩ গোলে। ৫ গোলের ৪টিই করেন ইউসেবিও। সেমিফাইনাল থেকেই বিদায় হয় পর্তুগালের। স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় সেদিন কাঁদতে কাঁদতে মাঠ ছেড়েছিলেন ইউসেবিও। সেই কান্না ইতিহাস বিখ্যাত। পর্তুগালের মানুষের কাছে ম্যাচটি ‘জোগো দাস লাগরিমাস’ (কান্নার ম্যাচ) হিসেবে পরিচিত। স্বপ্নভঙ্গের সেই বিশ্বকাপেও তিনি ৯ গোল করে ‘গোল্ডেন বুট’ জিতে নিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়নকে হারিয়ে তৃতীয় হয় পর্তুগাল, যা বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত পর্তুগালের সেরা অর্জন।
ক্যারিয়ার জুড়ে গোলের বন্যা বইয়ে দিয়েছেন তিনি। ৭৪৫টি প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ খেলে করেছিলেন ৭৩৩টি গোল। সর্বকালের সেরা ফুটবলার পেলে ক্লাব ক্যারিয়ারের প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে ৬৫৬ ম্যাচে করেছিলেন ৬৪৩ গোল। ইউসেবিওর কেরিয়ারে অনেক কিছু পেয়েছেন। শুধু বিশ্বকাপটা জিততে পারেননি। অনেকের মতে, বিশ্বকাপ জিতলে হয়তো পেলে-ম্যারাডোনার ওপরেই থাকতেন ইউসেবিও। অপ্রাপ্তির কথা বলতে গিয়ে একবার অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি আমার সময়ের সেরা খেলোয়াড় ছিলাম। ইউরোপ এবং গোটা বিশ্বের শীর্ষ গোলদাতা ছিলাম। সম্ভাব্য সবকিছুই করেছি, শুধু বিশ্বকাপটা জিততে পারিনি।’ ৫ জানুয়ারি ২০১৪ ইউসেবিও চলে গেছেন। তার সেই রূপকথার গল্প বিশ্ব ফুটবল চিরকালই মনে রাখবে।

