‘এই দশকের শেষে ভারত হবে তৃতীয় বৃহত্তম বিশ্ব অর্থনীতি’
‘ভারত এখনও এই গ্রহের সবচেয়ে প্রাণবন্ত এবং কার্যকরী গণতান্ত্রিক দেশ’
ডিব্রুগড় (অসম), ৩ মে (হি.স.) : দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় আটটি রাজ্যের উন্নয়ন ছাড়া ভারতের প্রবৃদ্ধি অসম্পূর্ণ। উত্তর-পূর্বাঞ্চল এখন সুযোগের দেশ হিসেবে গড়ে উঠেছে, বলেছেন ভারতের উপ-রাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনখড়।
আজ বুধবার ঐতিহ্যমণ্ডিত ডিব্ৰুগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের একবিংশতিতম সমাবর্তন সমারোহে প্রধান অতিথি হিসেবে ভাষণ দিচ্ছিলেন উপ-রাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনখড়। আজ সকালে সপত্নীক উপ-রাষ্ট্রপতিকে ডিব্রুগড় বিমানবন্দরে উষ্ণ স্বাগত জানান ডিব্ৰুগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের আচাৰ্য তথা অসমের রাজ্যপাল গুলাবচাঁদ কাটারিয়া, মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মা, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রামেশ্বর তেলি, শিক্ষামন্ত্রী রণোজ পেগু সহ রাজ্যের কয়েকজন শীর্ষ সরকারি আধিকারিক।
একবিংশতিতম সমাবর্তন সমারোহে অসমের ভাষা-সাহিত্য জগতে বিশেষ অবদানকারী স্বনামধন্য সাহিত্যিক নিরুপমা বরগোহাঞিকে সম্মানীয় ডিলিট এবং আবহাওয়া বিজ্ঞানে গবেষণা ক্ষেত্ৰে বিশেষ অবদানকারী বরেণ্য বিজ্ঞানী ড. ভূপেন্দ্ৰনাথ গোস্বামীকে ডি.এসসি সম্মানে ভূষিত করেছেন উপ-রাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনখড়। সমারোহে মোট ১,৬৮৪ জন শিক্ষাৰ্থী অংশগ্ৰহণ করেছেন। তাঁদের মধ্যে ৭৫ জনকে পিএইচ.ডি, ৭২ জনকে এমফিল, ৪৩ জনকে স্বৰ্ণপদক এবং তিনজন শিক্ষাৰ্থীকে বিজ্ঞান, কলা ও বাণিজ্য বিভাগে শ্ৰেষ্ঠ স্নাতকের স্বৰ্ণপদক প্ৰদান করা হয়েছে। তাছাড়া নৃতত্ত্ব বিভাগে সৰ্বোচ্চ নম্বর-প্রাপ্ত শিক্ষাৰ্থীকে ‘জোনাকি ক্রোপি মেমোরিয়াল এনডাওমেনট অ্যাওয়ার্ড’ এবং গোল্ড মেডেল প্রদান করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে উপ-রাষ্ট্রপতি ধনকড় বলেন, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আটটি রাজ্য সত্যিকারের ‘অষ্টলক্ষ্মী’। এই আট রাজ্যের বৃদ্ধি, সম্পৃক্ততা, অংশগ্রহণ এবং অবদান ছাড়া ভারত অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। তিনি বলেন, অসমের ডিব্রুগড় সুন্দর সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক রাজধানী। এখানকার বাসিন্দা রাজ্যসভায় আমার সম্মানিত সহকর্মী ভারতের সুপ্ৰিমকোৰ্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ। রঞ্জন গগৈয়ের মতো অনেক প্রথিতযশা বুদ্ধিজীবী, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক মনোভাবাপন্ন জনসাধারণের আবাসস্থল ডিব্রুগড়। একজন মহৎ, নম্ৰ স্বভাবের মানুষ সর্বানন্দ সনোয়ালও এই জেলার বাসিন্দা। শিষ্টাচারী আচার-ব্যবহার তিনি উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সংস্কৃতিকে প্রামাণিকভাবে প্রতিফলিত করেন।
‘এ বছর আমরা এই এলাকার বিশিষ্টদের পদ্ম পুরস্কার প্রদানের উপলক্ষ ছিলাম। হেমোপ্রভা চুতিয়া, হেমচন্দ্র গোস্বামী এবং রামকুইওয়াংবে জেন এ বছর তাঁদের অবদানের জন্য পদ্ম পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন৷’, প্ৰদত্ত ভাষণে বলেন জগদীপ ধনকড়। তিনি বলেন, একটা সময় ছিল যখন পদ্ম পুরস্কার দুটি বিভাগে দেওয়া হত, একটি পৃষ্ঠপোষকতা এবং দ্বিতীয়টি বিশেষত্বের ওপর। গত কয়েক বছরে ব্যবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। পদ্ম পুরস্কার এখন শুধুমাত্র যোগ্য ব্যক্তিদের দেওয়া হয়। যে মুহূর্তে সেগুলি ঘোষণা করা হয় সবাই আনন্দিত হয়ে উঠেন যে সঠিক ব্যক্তিকে পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। তাঁদের সবাইকে অনেক অভিনন্দন জানিয়েছেন উপ-রাষ্ট্রপতি।
উপ-রাষ্ট্রপতি জগদীপ বলেন, ‘আমি যখন আমাদের দেশের এই অংশে থাকি, তখন আমি কামরূপের রাজা পৃথু জলপেশ্বরের বীরত্বের কথা স্মরণ করি। তিনি নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের ধ্বংসকারী বখতিয়ার খিলজিকে পরাজিত করেছিলেন। আমরা গর্বের সাথে কিংবদন্তি আহোম যোদ্ধা লাচিত বরফুকনকেও স্মরণ করি যিনি শরাইঘাটের বিখ্যাত যুদ্ধে মুঘল বাহিনীকে পরাজিত করেছিলেন।
উপস্থিত শিক্ষার্থী সহ অন্যদের বন্ধু বলে সম্বোধন করে উপ-রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘বন্ধুরা, ভগবত গীতা থেকে সংগৃহীত আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিবাক্যটি খুবই উপযুক্ত এবং তাৎপর্যপূর্ণ। “নিয়তম কুরু কর্ম্ম”, আপনি আপনার সীমাবদ্ধ দায়িত্ব পালন করুন। ভগবত গীতায় আমাদের যা শেখানো হয়েছে তা থেকে যদি আমরা এটিকে আরও এগিয়ে নিই, “কর্মই তোমার উপাসনা, পুরস্কার আপনার উদ্বেগ নয়”। এটি আমাদেরকে একটি অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি দেয় যে ভারতীয় হওয়ার জন্য আমাদের সর্বদা গর্ব করতে হবে।’ বলেন, আমাদের ঐতিহাসিক অর্জন ও কৃতিত্বের জন্য সবসময় গর্বিত হতে হবে। এটি লক্ষ্য করা আনন্দদায়ক যে ডিব্ৰুগড় বিশ্ববিদ্যালয় এই অঞ্চলের ভাষাগত বৈচিত্র্য এবং এর সাহিত্য ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য একটি কেন্দ্রবিন্দু হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে।
‘আমাদের ভাষা সংরক্ষণ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আমরা এটি হাজার হাজার বছর ধরে পেয়েছি এবং ভারত সরকার এ বিষয়ে অনেক কিছু করছে। এই বিশ্ববিদ্যালয় যে কাজ করেছে তা আমাদের সংস্কৃতির সদগুণতার উদাহরণ দেয়। বোড়ো, তাই এবং মিসিং ভাষার কোর্সের উপর ফোকাস প্রশংসনীয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘পারফরমিং আর্টসে সেন্টার অব এক্সিলেন্সের নামকরণ করা হয়েছে আধুনিক ভারতের অন্যতম বিখ্যাত সাংস্কৃতিক আইকন ভারতরত্ন ড. ভূপেন হাজরিকার নামে। তাঁর নাম আমাদের ভিন্ন ধরনের মানসিকতায় উদ্বুদ্ধ করে। দেশের দীর্ঘতম সড়ক সেতুও অসমে অবস্থিত। এই সেতু কিংবদন্তির নামে নামকরণ করা হয়েছে – ভূপেন হাজারিকা সেতু।’
উপ-রাষ্ট্ৰপতি বলেন, আরেকটি কৃতিত্ব হল ডিব্রুগড় বিশ্ববিদ্যালয়কে জি২০ ইউনিভার্সিটি কানেক্ট প্রোগ্রামের হোস্ট এবং অংশগ্রহণের জন্য দেশের উচ্চশিক্ষার নির্বাচিত ৭৬টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে। আমাদের সকলের জন্য কত গর্বের মুহূর্ত এবং এই দেশের বৈশ্বিক ভাবমূর্তির কী উত্থান। ভারত জি২০ শীর্ষ সম্মেলনের সভাপতি এবং দেশ জুড়ে এটির আয়োজন করে সর্বত্র পদার্পণ অনুভব করা যায় এবং এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ও তার একটি কেন্দ্র।
শিক্ষাৰ্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘সমাবর্তন একটি টার্নিং পয়েন্ট, ছাত্র, তাঁদের শিক্ষক এবং তাঁদের পিতামাতার জীবনের একটি মাইলফলক। এটি একটি ফল, একটি কঠোর-অর্জিত শংসাপত্র যা আপনাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে, বিস্তৃত বাইরের জগতে উত্তরণে সহায়তা দেয়। এটি একটি মহান বাঁক, এই মহান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থেকে আপনি এখন প্রাক্তন ছাত্র হওয়ার মর্যাদা পাবেন। সামাজিক পরিবর্তন আনতে আপনাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। আপনি এমন একটি সময়ে আপনার কর্মজীবন শুরু করছেন যখন প্রতিযোগিতা তীব্র, সুযোগগুলি বিশাল এবং চ্যালেঞ্জগুলিও ভয়ংকর।’
বলেন, ‘সরকারি উদ্যোগ এবং ইতিবাচক নীতির কারণে আজ একটি ইকোসিস্টেমের আবির্ভাব ঘটেছে যেখানে প্রতিটি যুবক এখন তার সম্ভাবনা এবং প্রতিভাকে সর্বোচ্চ পরিমাণে প্রকাশ করার অধিকারী।’ উপ-রাষ্ট্রপতি বলেন, প্রশংসনীয়ভাবে এনসিইআরটি আমাদের ইতিহাসে স্বাধীনতা সংগ্রামে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের লড়াকু নায়কদের অবদানকে অন্তর্ভুক্ত করতে কোর্স উপাদান তৈরি করছে। আমরা তাঁদের প্রায় ভুলে গিয়েছিলাম। আজাদি কা অমৃত মহোৎসবে আমাদের তাদের অবদানকে স্বীকৃতি দিতে হবে।
প্ৰসঙ্গক্ৰমে উপ-রাষ্ট্রপতি বলেন, এই দশকের শেষে ভারত হবে তৃতীয় বৃহত্তম বিশ্ব অর্থনীতি। এর কারণ হল, গত কয়েক বছরে আমাদের একটি নতুন মন্ত্র এসেছে “লেস গভৰ্নমেন্ট অ্যান্ড মোর গভার্নেন্স”। আগে এই মন্ত্র ছিল অন্য পথে। একটা সময় ছিল যখন এই দেশের একজন ক্ষুব্ধ প্রধানমন্ত্রীকে উনিশ-আশির দশকে বলতে হয়েছিল, সুবিধাভোগীদের ৮৫ শতাংশ সহায়তা উধাও হয়ে যায়, ওই সহায়তা তাদের কাছে পৌঁছয় না। আজ ওই সহায়তার ১০০ শতাংশ সরাসরি হস্তান্তর হচ্ছে। এই ঐতিহাসিক অর্জন প্রথমে দূরদর্শী পরিকল্পনার মাধ্যমে এবং তার পর মানবসম্পদ বাস্তবায়নের মাধ্যমে সংঘটিত হয়েছে।
উপ-রাষ্ট্রপতি ধনকড় বলেন, ‘আমি তিন বছর পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল ছিলাম। আমি ব্যক্তিগতভাবে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে যে রূপান্তরমূলক পরিবর্তন ঘটছে তা দেখছি। ১৯৯১ সালে আমাদের “লুক ইস্ট” নীতি ছিল এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর পেয়েছি “অ্যাক্ট ইস্ট” নীতি।’
বলেন, নর্থ-ইস্টের জন্য পিএম ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ ফান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার কনভারজেন্সের সাথে ফলাফল বহন করছে। গত নয় বছরে সড়ক যোগাযোগের ৩৭৫টি প্রকল্প চালু করা হয়েছে। ঐতিহাসিক বগিবিল রেল-কাম-সড়ক সেতুটি কয়েক বছর আগে উদ্বোধন করা হয়েছিল। তিনি স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা খাতে কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকারের মধ্যে সহযোগিতার প্রশংসা করেছেন। বলেন, গত বছর রাজ্যে সাতটি ক্যানসার হাসপাতাল খোলা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী অসম জুড়ে সাতটি নতুন ক্যানসার হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন।
বহু প্ৰসঙ্গে বক্তব্য পেশ করতে গিয়ে উপ-রাষ্ট্রপতি জগদীশ ধনকড় বলেন, ‘আমি আপনাদের প্রশ্ন করতে চাই, যখন সবকিছু ঠিকঠাক চলছে, তা-হলে কেন আমাদের মধ্যে কেউ কেউ আমাদের গণতন্ত্রকে নিয়ে নিন্দা করে? কেন আমাদের মধ্যে কেউ কেউ দেশের ভিতরে এবং বাইরে অবাধ্য নীরবতার কথা বলে, এই দেশে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নেই বলে। আমি আত্মবিশ্বাসের সাথে জোরের সঙ্গে বলতে পারি, ভারত এখনও এই গ্রহের সবচেয়ে প্রাণবন্ত এবং কার্যকরী গণতান্ত্রিক দেশ। … রাজ্যসভার চেয়ারম্যান হিসেবে আমার বলতে দ্বিধা নেই, আমাদের দেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতা উপলব্ধ, কোনও বলপূর্বক নীরবতার অধীন নয়। যাঁরা এমন মনে করেন তাদের মতামত পুনর্বিবেচনা করা দরকার।’