দুর্গাপুর, ২ মে (হি. স.) খনি গর্ভে মূর্হু মূর্হু বিস্ফোরণ । কেঁপে উঠছে ঘরবাড়ি। আর তাতেই ফাটল ধরছে গ্রামে ও বাড়িতে। ভেঙে পড়ার আশঙ্কায় ঘুম ছুটেছে বাসিন্দাদের। ওই ফাটল ভরাট করতে এসে বিক্ষোভের মুখে পড়লেন খনি আধিকারিকেরা। পুনরবাসনের দাবীতে খনির কাজ ও পরিবহণ বন্ধ করে অবরোধ গ্রামবাসদের। মঙ্গলবার ঘটনাকে ঘিরে উত্তেজনা ছড়াল অন্ডালে ইসিএলের শংকরপুর খোলা মুখ খনি এলাকায়।
প্রসঙ্গত, গত ২৬ ও ২৮ এপ্রিল অন্ডালের শংকরপুর দিঘির বাগান বগুলা ও সিদুলি কাটা ঘর সংলগ্ন এলাকায় ধস নামে। আর তার জেরে এলাকায় ফাটল দেখা দেয় বাড়িতে। অভিযোগ খোলমুখ খনিতে কয়লা উৎপাদনের জন্য যে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। ওই বিস্ফোরণের দরুন ফাটল ধরছে আশপাশের এলাকায়। ঘটনাস্থলের কিছুটা দূরেই রয়েছে সিদুলি দিঘীর বাঁধ আদিবাসী পাড়ায় একটি শিশু শিক্ষা কেন্দ্র ও জন বসতি। কয়েক’শ পরিবারের বসবাস। মাস কয়েক আগে এই শিশু শিক্ষাকেন্দ্রের টিউবওয়েল থেকে গ্যাস বের হওয়ার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এলাকায়। যদিও তারপর ওই শিশুশিক্ষা কেন্দ্র আপাতত বন্ধ। মঙ্গলবার ইসিএলের তরফে ধস কবলিত এলাকায় মাটি ভরাটের কাজ শুরু হয়। ওই সময় ইসিএলের ভরাট কাজ বন্ধ করে বিক্ষোভ শুরু করে ক্ষুব্ধ বাসিন্দারা। এমনকি ইসিএলের পরিবহন ও কাজ বন্ধ করে দেয় বিক্ষোভকারীরা। বিক্ষোভকারীদের পক্ষে লালটু মাঝি, মঙ্গলা মাঝিরা জানান,” ধসের কারনে আতঙ্কের মধ্যে রয়েছি। মাটি ভরাটের কাজ ঠিকমতো হয়নি। এছাড়াও বারবার খনিতে ব্লাস্টিংয়ের দরুন বাড়িতে ফাটল ধরছে। ইসিএল কর্তৃপক্ষকে জানানোর পরও কোন রকম সুরাহা হয়নি। তাই আমাদের পুনর্বাসন দেওয়া হোক। অন্যত্র চলে যাবো।”
প্রসঙ্গত, গতবছর আগস্টের শেষের দিকে ইসিএলের ঝাঁঝরা প্রজেক্ট পার্শ্ববর্তী দুর্গাপুর-ফরিদপুর (লাউদোহা) ব্লকের শীর্ষা গ্রামে একাধিক বাড়িতে ফাটল ধরে। ক্ষতিগ্রস্ত হয় বেশ কয়েকটি বাড়ি। অভিযোগ ইসিএলের খনিগর্ভে তীব্র বিস্ফোরণের কারণেই ফাটল ধরছে বাড়ীতে। যেকোন সময় ভেঙে পড়ার তীব্র আশঙ্কা বলে দাবি দুর্গতদের। শীর্ষা গ্রাম সংলগ্ন কয়লা খনি। রাজ্য সরকারের পাট্টা দেওয়া জমিতে তারা ঘর বাড়ি করে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন। বড়সড় দুর্ঘটনার আশঙ্কায় ওই সময় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলি আতঙ্কে ঘর ছেড়ে রাস্তায় উঠে আসে। শুক্রবার পুনর্বাসনের দাবিতে সরব হয় বাসিন্দারা। চলতি বছর ২৯ জানুয়ারী অন্ডালের মদনপুর পঞ্চায়েতের ধান্ডাডিহি গ্রামের পাশে পুকুর সংলগ্ন জমিতে আচমকায় ধস নামে। প্রায় ২০০ বর্গ মিটার এলাকাজুড়ে মাটি বসে যায়। গ্রামবাসীদের অভিযোগ, গ্রাম সংলগ্ন অবৈধভাবে কয়লা খনন চলছে রমরমিয়ে। তার ওপর ইসিএল কয়লা উত্তোলনের পর বালি ভরাট ঠিক মত না করায় ধস নামছে। ৮ ফেব্রুয়ারী অন্ডালের মধুসুদনপুর কোলিয়ারির মুকুন্দপুর ৪ নম্বর কোড়াপাড়ায় সুরঙ্গের মত মাটি ধসে তলিয়ে যায়। ঘটনাকে কেন্দ্র করে ক্ষুদ্ধ এলাকাবাসী বাঁশ-লাঠি দিয়ে ইসিএল-এর অস্থায়ী পাম্প হাউস ভেঙে দেয়।
গত বছর ২৮ আগষ্ট ধস নামে অন্ডালের বহুলা অঞ্চলে। ধসে তলিয়ে যায় বহুলা গ্রামের তিলিপাড়া ও বাদ্যকর পাড়ায় আস্ত একটা জলাশয়। একই সঙ্গে ধসে তলিয়ে গেল কোম্পানী আমলের পরিত্যাক্ত কোলিয়ারী। ঘটনাকে ঘিরে চরম আতঙ্কে আশপাশে জনবসতি। ঘটনার পর পুনরবাসনের দাবীতে সরব হয় এলাকাবাসী।
গত ২০১১ সালের ১১ অক্টোবর কাজোড়া গ্রামের বাগদীপাড়ার পাশে একটি পুকুরে ধস নামে। প্রায় ২০০ বর্গ মিটার জুড়ে মাটি ধসে যায়। ঘন্টাখানের মধ্যেই প্রায় ৫-৬ বিঘার পুকুরটির জল ধসে ফলে মাটি তলায় তলিয়ে যায়। অভিযোগ, ভুগর্ভ থেকে কয়লা উত্তোলনের পর বালি ভরাট ঠিক মত না হওয়ার জের ধস নামে। যার মাশুল গুনতে হয় খনি অঞ্চলবাসীকে। একইসঙ্গে কয়লা উত্তোলক সংস্থা ইসিএলের উদাসীনতাকে দায়ী করেছে বাসিন্দারা। প্রশ্ন, পুনরবাসন না হওয়ার কারন কি?
প্রসঙ্গত, ১৯৯৮ সালে সিটু নেতা তথা প্রাক্তন সাংসদ হারাধন রায় পুনরবাসনের দাবীতে সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের করেছিল। ওই মামলার প্রেক্ষিতে ২০০৯ সালে কেন্দ্রীয় কয়লা মন্ত্রক ধসকবলিত এলাকার মানুষদের পুনরবাসনের জন্য ২৬৬২ কোটি টাকা অনুমোদন করে। এডিডিএ সুত্রে জানা গেছে, ১৪১ টি এলাকা ধস কবলিত বলে চিহ্নত হয়। যার মধ্যে ৩ টি এলাকা ইসিএল নিজে পুনরবাসনের কাজ করে। ২ টি এলাকা সার্ভে করতে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ। বাকি ১৩৬ টি এলাকার পুনরবাসন কাজ শুরু করে এডিডিএ। পরবর্তীকালে রাজ্য হাউসিং বিভাগকে পুনরবাসনের কাজ দেয়। প্রতিবারই জেলা সফরে এসে প্রশাসনিক বৈঠকে পুনরবাসনের খোঁজখবর নেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। গত বছর রানীগঞ্জের প্রশাসনিক সভা থেকে ধসকবলিত ৫ পরিবারের হাতে আবাসনের বাড়ীর চাবিও তুলে দেন। কিন্তু, কিছু কাজ অসম্পুর্ন থাকায় ওইসব আবাসনে ঢুকতেই পারেনি ধসকবলিত এলাকার মানুষ। যদিও এডিডিএ র দাবী ৩ হাজার পরিবারকে পুনরবাসন দেওয়া হয়েছে। খনি অঞ্চলে ধস কবলিত এলাকার বাকি পরিবারদের পুনরবাসন কার্যত বিশ বাঁও জলে। এদিকে পুনরবাসন না হওয়ায়র দায় নিয়ে তৃণমূল – বিজেপির চাপানউতোর শুরু হয়েছে। ব্যার্ততার দায় নিয়ে একে অপরকে দুষছে। কয়েক মাস আগে ধস কবলিত মানুষদের দ্রুত পুনরবাসনের জন্য ইসিএল ও কোলইন্ডিয়াকে চিঠি দিয়েছেন বিজেপি নেতা জিতেন্দ্র তেওয়ারী। তিনি জানান,” খনি অঞ্চলে দুর্গত মানুষদের পুনরবাসন না হওয়ার কারন রাজ্যের চরম ব্যার্থতা। কোল ইন্ডিয়া পুনরবাসনের টাকা দিয়েছে। অথচ পুনরবাসন প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্পুর্ন ব্যার্থ রাজ্য সরকার ও আসানসোল-দুর্গাপুর উন্নয়ন পর্ষদ। যার মাশুল দিতে হচ্ছে খনি অঞ্চলবাসীকে।”
জানা গেছে, চলতি অর্থ বছরে পুনরবাসন প্রকল্পে কোল ইন্ডিয়া দুই ধাপে ২৩০ কোটি ও ৬০ কোটি টাকা দিয়েছে। এডিডিএ র চেয়ারম্যান তথা রানীগঞ্জের বিধায়ক তাপস বন্দ্যোপাধ্যায় ইসিএলের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অভিযোগ তুলে বলেন,” কয়লা উত্তোলনের পর বালি ঠিকমতো ভরাট না করায় ধসের প্রবনতা। তাদের পাপ আমরা বহন করছি। পুনরবাসন প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে ৫২১ কোটি টাকা দিয়েছিল। তাতে ১৫ হাজারের মত আবাসন তৈরী হয়েছে। শেষমুহুর্তের কিছু কাজ বাকি রয়েছে। ধস কবলিত ৩ হাজার পরিবারকে পুনরবাসন দেওয়া হয়েছে। নিজস্ব ফান্ড থেকে এখন ৫ হাজার বাড়ীর কাজ করা হচ্ছে। দ্বিতীয় দফায় যে টাকা দিয়েছে সেটা হাউসিং ডিপার্টমেন্টকে দেওয়া হয়েছে। তাতে ৪৮০ টি বাড়ির শেষ পর্যায়ের কাজ চলছে। খুব শীঘ্রই সেগুলি ধস কবলিত পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হবে।” তিনি আরও বলেন,” নতুন করে যে সমস্ত এলাকায় ধস নামছে, সেগুলো ইসিএল দেখছে।”

