করিমগঞ্জ (অসম, ভারত), ১২ অক্টোবর (হি.স.) : বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক ভারত সফরে সাতটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। গত ৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা চুক্তির মধ্যে অন্যতম করিমগঞ্জের ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত বরাবর কুশিয়ারা নদীর জলবণ্টন চুক্তি। এর অধীনে ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ নদী কুশিয়ারা থেকে প্রতি সেকেন্ডে ১৫৩ কিউসেক জল উত্তোলন করতে পারবে বাংলাদেশ।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ৫৪টি যৌথ নদী রয়েছে। এই নদীগুলোর জলবণ্টন দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ইস্যু। এর মধ্যে কেবল ১৯৯৬ সালে গঙ্গা নদীর জলবণ্টন চুক্তি হয়েছে। বাকি নদীগুলো নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বহু আলোচনা হয়েছে। যার মধ্যে আলোচনায় চুক্তির অগ্রাধিকারের তালিকায় ছিল তিস্তার জলবণ্টন চুক্তি। ২০১০ সালে এটি স্বাক্ষরের চূড়ান্ত প্রস্তুতিও গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তিতে এখনও সেই চুক্তি রূপায়িত হয়নি।
এবার কুশিয়ারা নদীর জল বণ্টনে সমঝোতায় আশার আলো ছড়াচ্ছে বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে। ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্যে এই সমঝোতায় অন্তত ১০ হাজার ৬০০ হেক্টর জমি চাষের আওতায় আসবে। চাষাবাদে আসবে ব্যাপক পরিবর্তন। সিলেট জেলার অন্তর্গত জকিগঞ্জের অমলসিদ দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে সুরমা ও কুশিয়ারা বিভক্ত হয়েছে। কুশিয়ারার উৎসমুখ থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে শরিফগঞ্জ বাজার। এই বাজারের কাছেই কুশিয়ারা নদী থেকে উৎপত্তি রহিমপুর খালের। প্রায় ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রাকৃতিক এই খাল থেকে উৎপত্তি হয়েছে আরও অসংখ্য খালের। আশপাশ এলাকার কৃষকদের সেচের প্রধান উৎস এই খালগুলো। তবে বর্ষায়ও তেমন জল থাকে না এই খালগুলোতে। তবে শুষ্ক মরশুমে খালগুলো একেবারে শুকিয়ে যায়। এলাকাটি উঁচু হওয়ায় শুষ্ক মরশুমে যখন খাল শুকিয়ে যায়, তখন পুরো গ্রাম জলশূন্য হয়ে পড়ে। উৎসমুখে কুশিয়ারা নদীর নাব্য কমে যাওয়ায় কয়েক যুগ ধরে রহিমপুর খাল শুকনো মরশুমে জলশূন্য হয়ে যায়। ফলে অন্তত ১০ হাজার হেক্টর জমিতে রবিশস্য এবং আরও বিস্তীর্ণ হাওর অঞ্চলে বোরো ধানের চাষাবাদ সম্ভব হয় না।
এ-সব জমিকে চাষের আওতায় আনতে উজান সুরমা-কুশিয়ারা প্রকল্পের অধীনে ২০১০ সালে ৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ে রহিমপুর খালের উৎসমুখে একটি পাম্প হাউজ নির্মাণ করা হয়। রহিমপুর সহ আশপাশের কিছু খালের উন্নয়নকাজ শুরু করে বাংলাদেশের ‘পানি উন্নয়ন বোর্ড’ (পাউবো)। এর আগে প্রকল্পের সুবিধার্থে ২০০৯ সালে কুশিয়ারা নদীর পাড়ে খালের উৎসমুখে বাঁধ দেওয়া হয়। ২০১৬ সালে খাল উন্নয়ন ও পাম্প হাউজের নির্মাণকাজ শেষ করে পাউবো। প্রকল্পের কাজ শেষে রহিমপুর খালে জলপ্রবাহ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। তখন উৎসমুখে নির্মিত তৈরি বাঁধ অপসারণ করতে গেলে ভারতের পক্ষ থেকে বাধা দেওয়া হয়।
কুশিয়ারা নদীর ঠিক মাঝ-বরাবর আন্তর্জাতিক সীমারেখা থাকায় বাংলাদেশের এই পাড়টি নো-ম্যান্স ল্যান্ডের অংশ। ফলে কুশিয়ারা নদী থেকে জল উত্তোলন করতে গেলে বিএসএফ বাধা দেয়। যার ফলে কুশিয়ারা নদী থেকে জল উত্তোলন করতে না পারায় ওই সেচ পাম্প চালু হয়নি।
বিষয়টি সুরাহা করতে ২০১৬ সালে করিমগঞ্জ জেলার (অসম) ভাঙ্গা গুরুচরণ কলেজে ১৪২ নম্বর বিএসএফ- ৪১ নম্বর বিজিবি কমাডেন্ট পর্যায়ে বৈঠক হয়। বিএসএফের পক্ষ থেকে তখন কড়া নিষেধ দেওয়া হয়। ফলে বৈঠকে এর কোনও সমাধানসূত্র বের হয়নি। গত ২৫ আগস্ট দুই দেশের যৌথ নদী কমিশনের বৈঠকের সময় কুশিয়ারা জল বণ্টন চুক্তি চূড়ান্ত হয় এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক ভারত সফরের সময় তা স্বাক্ষরিত হয়।
মূলত যৌথ নদী কমিশনের বৈঠকের সময় রহিমপুর খাল নিয়ে আগের যে আপত্তি ছিল তা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে ভারতের পক্ষ থেকে। তার পর সমঝোতার খসড়া তৈরি করা হয়।
বর্তমানে বর্ষা মরশুমে রহিমপুর খালে হাঁটু জল। জানা গেছে, হেঁটেই এই খাল পার হন স্থানীয়রা। এখন জলবণ্টন সমঝোতায় আশার আলো দেখছেন এলাকাবাসী। আবারও জমিগুলো ফসলে ভরে উঠবে বলে মনে করেন সিলেটের বাসিন্দারা। মনে করা হচ্ছে, এতে জকিগঞ্জ, কানাইঘাট ও বিয়ানিবাজার উপজেলার চাষাবাদে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে।
আরও জানা গেছে, পাম্প হাউজ ও খালের উন্নয়নকাজ শেষ হওয়ার পর গত ৬ বছরে খালের অনেকাংশ আবারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাংলাদেশের নির্মিত পাম্প হাউজটি প্রস্তুত করতে দু-তিন সপ্তাহ সময় লাগবে। কুশিয়ারা নদীর সংযোগস্থলের সঙ্গে ৩২৫ মিটার বাঁধের কাজ শেষ হয়েছে অনেকে আগে। এবার ভারতীয় সীমানা থেকে ১৫০ গজের মধ্যে অবশিষ্ট ২৫ মিটার অংশকে নদীর সঙ্গে যুক্ত করার কাজ শুরু হচ্ছে শীঘ্রই। ফলে ওই সময় থেকে জল উত্তোলন করে কুশিয়ারা-সুরমা প্রকল্প সচলের মাধ্যমে চলতি মরশুমেই ওই এলাকায় সেচ প্রদান করা সম্ভব হবে।
এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের ফলে কয়েকটি উপজেলার ১০ হাজার হেক্টরেরও বেশি জমি সেচের আওতায় আসবে এবং সারা বছর কৃষি কাজ করা সম্ভব হবে। বলা হচ্ছে, অনেক পতিত জমি কৃষির আওতায় আসবে। ফলে বছরে অতিরিক্ত আরও ২০ হাজার মেট্রিকটন ধান উৎপাদিত হবে।
তবে বাংলাদেশে জলচুক্তি নিয়ে খুশির জোয়ার বইলেও বরাক উপত্যকার জনজীবনে এই চুক্তি আনতে পারে গভীর সংকট। তার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ওয়াকিবহাল মহলের বক্তব্য, বরাক উপত্যকার জনগণকে অন্ধকারে রেখে, কোনও ধরনের মতামত না নিয়ে, একতরফাভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে জলবন্টন চুক্তি সম্পাদন করা হয়েছে। তিস্তার জলবণ্টন চুক্তি নিয়ে ২০১০ সালে চূড়ান্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করা হলেও পরবৰ্তীতে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তির ফলে সেই চুক্তি সফল হয়নি। ১৯৯৬ সালের গঙ্গা চুক্তির পর এই প্রথম বাংলাদেশের সঙ্গে কোনও অভিন্ন নদীর জলচুক্তি সম্পাদিত হয়েছ। কিন্তু কুশিয়ারার জলচুক্তির জন্য যেমন কোনও ধরনের মতামত নেওয়া হয়নি, তেমনি চুক্তি সম্পাদন হওয়ার পর অসমের এই অঞ্চলে কোনও ধরনের প্রতিবাদও হতে দেখা যায়নি।
বরাক উপত্যকার তিন জেলা কাছাড়, করিমগঞ্জ এবং হাইলাকান্দিতে খরার মরশুমে জলসংকট দেখা দিতে পারে, অন্যদিকে বর্ষাকালে আরও বেশি বন্যার কবলেও পড়তে পারে। নদী, নালা, খালগুলি শুকিয়ে যাওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে। বরাক উপত্যকার প্রায় ৪০ লক্ষ মানুষের জনজীবিকার প্রতি হুমকি নেমে আসতে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, বাংলাদেশে অতিরিক্ত আরও কয়েক হাজার মেট্রিকটন ধান উৎপাদন হলে কৃষিকাজে বিস্তর ক্ষতিসাধন হবে বরাক উপত্যকায়।
2022-10-12

