দুর্গাপুর, ১৪ সেপ্টম্বর (হি. স.) : এ এক অন্য ছিটমহল। বিদ্যুৎ সংযোগ থাকলেও, নতুন করে সংস্কার হয়নি। দামোদরে জল বাড়লেই বিচ্ছিন্ন করা বিদ্যুত পরিষেবা। ভেঙে পড়ে যোগাযোগের রাস্তা। বন্ধ হয়ে যায় যাতায়াত। জলবন্দি হয়ে পড়ে আস্ত একটা গ্রাম। স্কুল পড়ুয়া থেকে রোগী, জরুরী কাজে বাধ্য ঝুঁকি নিয়ে নৌকা পারাপার করতে হয়। স্কুল আছে, সময়ে আসতে পারে না শিক্ষক। তিনবছর মুখ থুবড়ে এক’শ দিনের কাজ। অধরা দুয়ারে রেশন পরিষেবা। ৫ কিলোমিটার দূরে নদী পেরিয়ে ভোট দিতে যেতে হয় গ্রামবাসীদের। ভালো চাষ করেও, সহায়ক মূল্যে ধান বিক্রি করতে পারে না চাষীরা। স্বাধীন ভারতে এমনই এক অসহায় জনজীবনের আঁধারে দিন কাটছে দামোদর বুকে বাঁকুড়ার সোনামুখী ব্লকের রাঙামাটির উত্তর মানাচর। দিন শেষ হয়ে নতুন সূর্য ওঠার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে বাসিন্দারা।
দামেদর নদের উত্তর প্রান্তে পানাগড় সংলগ্ন উত্তর মানাচর। ভৌগলিক মানচিত্রে বাঁকুড়ার সোনামুখী ব্লকের রাঙামাটি পঞ্চায়েতের অন্তর্গত। তবেই নদী জল পেরিয়ে স্কুল থেকে হাসপাতাল, বাজার সব কাজের সদর কাঁকসার পানাগড়। ৮০ টি পরিবারের বসবাস। প্রায় ৫০ বছর ধরে বসবাস করছে নদীর বুকে। মূলত পূর্ব বঙ্গ থেকে আগত বেশীরভাগই মতুয়া সম্প্রদায়ের বসবাস। নদীর চরকে চাষাবাদ করে তুলেছে। চাষবাসের ওপর জীবনজীবিকা নির্ভরশীল। ধান, সরষে, থেকে ঝিঙ্গে, পটল, কুমড়ো সমস্তরকমের সব্জি চাষ হয়। এছাড়াও আলু, বাদম ও ফুল চাষে আগ্রহ বেশী চাষীদের। ভালো ফলন হলেও হিমঘরের অভাবে সংরক্ষন করতে না পারায় মুনাফা করতে পারে না চাষীরা। আরও আশ্চর্যের বিষয় নিয়মের জাঁতাকলে সহায়ক মূল্যে ধান বিক্রি করতে পারে না চাষীরা। বাধ্য হয়ে জলের দরে ধান বিক্রি করতে হয় চাষীদের। এত গেল জীবিকা। বিদ্যুত পরিষেবা তথৈচে। বিদ্যুত সংযোগ রয়েছে। কিন্তু নতুন করে সংস্কার হয়নি বিদ্যুতের তার ও খুঁটির। ফলে প্রায়দিনই বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে পড়ে যায়। দুর্ঘটনাও হয়। বছর কয়েক আগে বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে এক যুবকের মৃত্যুও হয়েছে। গ্রীষ্মকাল গরমের দাপটে ঝুলে পড়ে পুরোনো তার। প্রায়দিনই দুই তারের সংস্পর্শে আগুনের ঝলকানিতে আতঙ্কে দিন কাটে বাসিন্দাদের। বিপদের শঙ্কা স্থানীয় বিদ্যুত দফতরে আবেদন করে জুতোর শুকতলা খুইয়েছে বাসিন্দারা। তবুও সমস্যা সেই তিমিরে, সুরাহা হয়নি। দামোদর সমন্য জলরাশি বাড়লেই এগারো হাজারের তার জলরাশির সংস্পর্শের আশার শঙ্কা দেখা দেয়। ফলে বিদ্যুত সংযোগ বিচ্ছন্ন করা হয় বলে অভিযোগ। আর তাতেই বর্ষাকালে অন্ধকারে ডুবে থাকতে হয় গোটা গ্রামকে। জবকার্ড থাকলেও গত দুবছরেরও বেশী সময় এক’শ দিনের কাজ জোটেনি। রাজ্য সরকার দুয়ারের রেশন প্রকল্প চালু করলেও, সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত বাসিন্দারা।
স্থানীয় বাসিন্দা রবি সরকার জানান,” রেশন নেওয়া আমাদের কাছে ঢাকের দায়ে মনসা বিক্রির মত অবস্থা। নদীর জল পেরিয়ে ৫ কিলোমিটার দূরে রেশন তুলতে যেতে হয়। তাতে কমপক্ষে ১০০ টাকা ভাড়া খরচ হয়। বহুবার রেশন ডিলারকে মাসে একদিন গ্রামে আসার অনুরোধ করেছি প্রশাসনের কাছে। তাতে একদিন গ্রামের সকলে রেশন সামগ্রী তুলে নিতে পারবে। এমনকি গ্রামের স্কুলে ভোটগ্রহন বুথ করারও আর্জি জানিয়েছি প্রশাসনের কাছে। কিন্তু গুরুত্ব দেয়নি কেউই।” গ্রামবাসীরা জানান,” গ্রামের দুপাশে দামোদরের জল প্রবাহমান। বাঁকুড়া জেলার অধিবাসী হলেও পানাগড় কাছাকাছি সদর হওয়ায় বেশী যাতায়াত। ছেলেমেয়েদের সিলামপুর স্কুল পড়াশোনা করে। কাঁকসা ও দুর্গাপুর হাসপাতালে চিকিৎসা পরিষেবায় যেতে হয়। উৎপাদিত ফসল পানাগড়, বুদবুদ, দুর্গাপুরে বিক্রির জন্য যেতে হয়। কিন্তু বর্ষাকালে আমাদের জীবন বিপন্ন হয়ে ওঠে। প্রায় ৫ মাস একপ্রকার জলবন্দি থাকতে গোটা গ্রামকে। নদীর ওপর অস্থায়ী রাস্তা জলের তোড়ে ভেঙে পড়ে। আর তাতেই আরও বিপত্তি। বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়ে নৌকা পারাপার করতে হয়ে স্কুল পড়ুয়া থেকে রোগী সকলকে। যেকোন সময় দূর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে।”
গ্রামের মালতী মন্ডল, অনিতা সরকার, রঞ্জিতা মন্ডল প্রমুখ মহিলারা জানান,” গ্রামে বেহাল রাস্তা। স্কুলের সামনে কিছুটা ঢালাই করা হয়েছে। বাকি গ্রামের রাস্তা মাটির। বর্ষায় চলাচল করা যায় না। এমনকি নদী পেরিয়ে সিলামপুর যেতে হয় মাঠের আলপথে। প্রসূতি কিম্বা কোন জরুরি রোগীকে চিকিৎসা করাতে খাটের ওপর দোলা করে নিয়ে যেতে হয়।” স্কুল ও কলেজ পড়ুয়া কাকলি পড়ে, বর্ষা সামন্ত, প্রিয়া জানা, শিবম সামন্ত, শুভজিত মাজি, মৌসুমি মিদ্যে প্রমুখ জানান,” নৌকায় সাইকেলে চাপিয়ে নিই। তারপর প্রায় ২-৩ কিলোমটিার আলপথ পেরিয়ে স্কুলে আসতে হয়। ঝোপজঙ্গলে ভর্তি নির্জন এলাকা। টিউশিন থেকে ফিরতে সন্ধ্যা হলেই আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। খুব ভয় হয় বাড়ী ফিরতে।”
গ্রামের স্কুলের শিক্ষক দীপঙ্কর কুন্ডু জানান,” প্রায় ৯০ কিলোমিটার দুর থেকে স্কুলে আসতে হয়। সময়ে আসার আপ্রান চেষ্টা করি। দীর্ঘ ৮০ কিলোমিটার আসতে যতটা সমস্যা হয় না, তার চেয়ে বেশী সমস্যা হয় ৫০ মিটার নদী পারাপারে। নৌকা খেয়ামাঝিকে ১০ মিনিট দেরিতে নৌকা ছাড়তে অনুরোধ করেছি বহুবার। তাতে নির্দিষ্ট সময়ে স্কুলে পৌঁছাতে সুবিধা হয়। কিন্তু ওই খেয়া মাঝি আমার সেই করুন অর্তির আবেদন শোনেনি। নাদীর পাড়ে এসে নৌকার জন্য প্রায় এক ঘন্টা বসে থাকতে হয়।” প্রশ্ন, রাজ্য যখন এগিয়ে বাংলার ফিরিস্তিতে সরব। কেন্দ্র যখন আত্মনির্ভরতার স্বপ্নে বিভোর। তখন এখনও কেন সরকারি সুযোগ সুবিধা পেতে অসহায় আস্ত একটা গ্রাম? স্থানীয় ডিহিপাড়া পঞ্চাায়েত প্রধান অলকা সরকার জানান,” রেশন আনতে যাওয়া সমস্যা রয়েছে। বিষয়টি আলোচনা করে দেখা হচ্ছে।” একইরকম সমস্যার কথা কার্যত স্বীকার করে নেয় সোনামুখী পঞ্চাায়েত সমিতির সভাপতি প্রনব রায়। তিনি বলেন,” গ্রামটিতে মুলত দামোদরের জলের জন্য বেশী সমস্যা। তবুও রেশন পরিষেবা যাতে গ্রামে করা যায়, সেটা আলোচনা করে দেখা হচ্ছে। বাকি সমস্যাগুলি গ্রামবাসীরা কোনদিন জানায়নি। তবে বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখা হচ্ছে।”