লক্ষ্মীপুর (কাছাড়, অসম), ৩ আগস্ট (হি.স.) : জনৈক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ঘুসের টাকা নিচ্ছিলেন। শেষ রক্ষা হয়নি, দুর্নীতি দমন (অ্যান্টি করাপশন) বিভাগের আধিকারিকদের অভিযানে হাতেনাতে ধরা পড়েছেন কাছাড় জেলার লক্ষ্মীপুর রেঞ্জ ফরেস্ট অফিসার দেবব্রত গগৈ। আজ বুধবার সকাল প্রায় ১১টা নাগাদ লক্ষ্মীপুরের পলারবন্দে ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছে।
পলারবন্দে বসে ঘুসের টাকা নিচ্ছিলেন। কিন্তু দুর্নীতি দমনের আধিকারিকরা হানা দিয়েছেন টেরে পেয়ে দৌড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন রেঞ্জার দেবব্রত গগৈ। দৌড়ে তাঁর পিছু ধাওয়া করেন দুর্নীতি দমনের আধিকারিরা। প্রায় এক কিলোমিটার ধাওয়া করে অভিযুক্ত রেঞ্জ অফিসার দেবব্রত গগৈকে ঘুসের নগদ টাকা সহ পাকড়াও করেন তাঁরা। দুর্নীতি দমনের আধিকারিকদের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে সর্বশক্তি প্রয়োগ করেও শেষ রক্ষা হয়নি।
ধৃত দেবব্রত গগৈকে জিজ্ঞাসাবাদ চালিয়ে যাচ্ছেন তদন্তকারী আধিকারিকরা। একইসঙ্গে তাঁর সরকারি বাসগৃহেও তালাশি চালিয়েছেন তাঁরা। তবে ঠিক কত টাকার লেনদেন হয়েছে তা স্পষ্টভাবে জানা যায়নি।
উল্লেখ্য, কাছাড় জেলার অন্তর্গত লক্ষ্মীপুরে প্রচুর বনজ সম্পদ রয়েছে। অবৈধ চিরাচরিত নিয়মে গিভ-অ্যান্ড-টেক পদ্ধতিতে বনজ সম্পদের দেদার বেআইনি পাচারের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে গোটা লক্ষ্মীপুর মহকুমা। লক্ষ্মীপুর রেঞ্জ অফিসের গা ঘেঁসে জিরি ও চিরি নদী প্রবাহিত। উভয় নদীতে পাথর ও বালুর প্রাচুর্যতা অবৈধ ব্যবসায়ী চক্রের আকর্ষণ কেড়েছে। এছাড়া লক্ষ্মীপুরের পার্শ্ববর্তী পাহাড়-জঙ্গলে রয়েছে বহু মূল্যবান গাছ-গাছালিও। একাংশ অসাধু বন আধিকারিকদের ম্যানেজ করে অবাধে বন ধ্বংস করে গাছ কেটে কাঠ এবং পাথর-বালু পাচার অভিযান অব্যাহত রেখেছে বন মাফিয়ারা।
সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে গুয়াহাটি থেকে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে এসেছিলেন ভিজিল্যান্স এবং দুর্নীতি দমনের বেশ কয়েকজন আধিকারিক। তাঁরা এলাকায় বন বিভাগের লাগামছাড়া দুর্নীতির সংবেদনশীল ঘটনার বাস্তব প্রমাণ পেলেন। ভিজিল্যান্স অ্যান্ড অ্যান্টি-করাপশনের ডিরেক্টর জ্ঞানেন্দ্ৰপ্ৰতাপ সিং এই অভিযান সম্পর্কে ঘটনার পর-পরই টুইট করে প্রথমে খবরটি দিয়েছেন।
তবে দেবব্রত গগৈ এই ঘুস কাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক মদতপুষ্ট বিশেষ কোনও ব্যবসায়ী চক্রের পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন কিনা তা নিয়ে চলছে কানাঘুঁষো। স্থানীয় একাংশ ব্যবসায়ীর বক্তব্য, লক্ষ্মীপুর বন দফতরের যাবতীয় কাজকর্মের রাশ ছিল তদানীন্তন রেঞ্জার মুজিবুর চৌধুরীর হাতে। প্রাক্তন বনমন্ত্রী পরিমল শুক্লবৈদ্যের চরম বিরাগভাজন হয়েও শাসক দলের প্রভাবশালী এক নেতার স্নেহভাজন ছিলেন মুজিবুর চৌধুরী। মূলত ওই নেতার আশীর্বাদধন্য হয়ে তদানীন্তন বনমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কার্যত চ্যালেঞ্জ করে দীর্ঘবছর লক্ষ্মীপুরে নিজের এক তরফা রাজত্ব কায়েম করতে সফল হয়েছিলেন মুজিবুর চৌধুরী। কারণ মাস-কয়েক আগে বন বিভাগের বিভিন্ন রেঞ্জারের বদলির আদেশ জারি হলেও মুজিবুর চৌধুরীর নাম বদলির তালিকায় ছিল না। যদিও কিছুদিন পর তাঁকে সরতে হয়েছে।
তাই ফের লক্ষ্মীপুরে দেবব্রত গগৈর স্থলে মুজিবুর চৌধুরীকে বসানোর অভীষ্ট পূরণের জন্য আজকের ঘুসকাণ্ড গভীর কোনও চক্রান্তমূলক ষড়যন্ত্র তৈরি করা হয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে বলে তথ্যাভিজ্ঞ মহল মনে করে।
এদিকে এই ঘুস কাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে ধৃত দেবব্রত গগৈকে জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রেখেছেন দুর্নীতি দমন শাখার আধিকারিকরা। লক্ষ্মীপুর থানার ওসি ইনসপেক্টর রাজেশকুমার দাস জানিয়েছেন, বিশাল ঘুসকাণ্ডের তদন্ত করছেন গুয়াহাটির দুর্নীতি দমন শাখার আধিকারিকরা। বন বিভাগের ঘুসকাণ্ডের বিষয়টি গুয়াহাটি থেকে ট্র্যাপ করছেন আধিকারিকরা, জানান ওসি দাস।