নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা, ৪ জুন৷৷ নমুনা পরীক্ষায় বিলম্ব এবং টিকাকরণ হয়নি, প্রধানত তাঁরাই করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখায় বেশি৷ তবে, টিকা নেননি এমন করোনা আক্রান্তদেরই মৃত্যু সবচেয়ে বেশি হয়েছে৷ তাতে দেখা যাচ্ছে, শুধু বয়স্ক নন, অল্প বয়সীরাও করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন৷ এমনকি অন্য জটিল রোগে আক্রান্ত নন, তাঁরাও করোনা সংক্রমিত হয়ে মারা গেছেন৷ ত্রিপুরায় করোনায় দ্বিতীয় ঢেউ-এ এখন পর্যন্ত ১৫৪ জনের মৃত্যু হয়েছে৷ তাদের মধ্যে দুই জন শিশুও রয়েছে৷ মৃত্যু রিপোর্টের বিস্তারিত বিশ্লেষণে ওই সমস্ত তথ্য উঠে এসেছে৷
আজ কোভিড নোডাল অফিসার ডা: দ্বীপ কুমার দেববর্মা সাংবাদিক সম্মেলনে করোনা সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেছেন৷ তিনি জানান, এখন পর্যন্ত ত্রিপুরায় ১০,০৬,৪২৪ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে৷ তার মধ্যে শুধু এবছর পরীক্ষা হয়েছে ৪,২৬,১৫২ জনের৷ মোট করোনা আক্রান্ত যেখানে ৫৩,৮৭২ জন, সেখানে শুধু এবছর করোনা আক্রান্ত হয়েছেন ২০,৬০৪ জন৷ সামগ্রিক আক্রান্তের হার ৫.৩৫ শতাংশের তুলনায় এবছরের হার ৪.৮৩ শতাংশ৷ মৃত্যু যেখানে এখন পর্যন্ত হয়েছে ৫৩৬ জনের, সেখানে শুধু এবছর করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ১৫৪ জন৷ তাঁর কথায়, ৭ দিনের রিপোর্টকে বিশ্লেষণ করে সর্বশেষ করোনা আক্রান্তের পরিস্থিতি নির্ণয় করা হয়৷ তাতে, গত ৭ দিনে ত্রিপুরায় ৯৬১০৬ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে৷ তাদের মধ্যে ৪৫৮২ জনের দেহে করোনার সংক্রমণ মিলেছে এবং আক্রান্তের হার ৪.৭৬ শতাংশ৷ মৃত্যু হয়েছে ৫৪ জনের৷ তিনি যোগ করেন, চলতি বছরে ১ এপ্রিল থেকে ৩ জুন পর্যন্ত ৩,৬৪,৯২৩ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে৷ তাদের মধ্যে ২০৩৫৫ জনের দেহে করোনার সংক্রমণ মিলেছে এবং আক্রান্তের হার ৫.৫৭ শতাংশ৷ এই সময়ে মৃত্যু হয়েছে ১৪৭ জনের৷
আজ তিনি করোনায় মৃত্যুর তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে একটি রিপোর্ট পেশ করেছেন৷ তাতে, দেখা গেছে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ-এ ১৫৪ জনের মৃত্যু হয়েছে৷ তাদের মধ্যে পুরুষ ১০৫ জন এবং মহিলা রয়েছেন ৪৯ জন৷ ওই মৃতদের মধ্যে অন্য জটিল রোগে আক্রান্ত ছিলেন ৮৩ জন এবং বাকি ৭১ জনের কোন রোগ ছিল না৷ রিপোর্ট অনুযায়ী, তাদের মধ্যে ১৪২ জন প্রাতিষ্ঠানিক চিকিতা কেন্দ্রে এবং ১২ জন বাড়িতে আইসোলেসনে মারা গেছেন৷ সবচেয়ে অবাক করার মতো বিষয় হল, তাদের মধ্যে ১২৯ জন টিকা নেননি, প্রথম ডোজ নিয়েছেন ১৬ জন এবং ৯ জন করোনার টিকা-র দুইটি ডোজই নিয়েছেন৷ ওই রিপোর্ট থেকে আরও জানা গেছে, সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে পশ্চিম জেলায়৷ মৃতদের তালিকায় পশ্চিম জেলায় ৯৬ জন, সিপাহীজলা জেলায় ২০ জন, খোয়াই জেলায় ৬ জন, গোমতি জেলায় ৬ জন, দক্ষিণ ত্রিপুরা জেলায় ৩ জন, ধলাই জেলায় ৭ জন, ঊনকোটি জেলায় ১৪ জন এবং উত্তর ত্রিপুরা জেলায় ২ জন রয়েছেন৷ এবছর করোনায় মাস ভিত্তিক মৃতের হিসেবে জানুয়ারিতে ৬ জন, মার্চ-এ ১ জন, এপ্রিলে ৬ জন, মে-তে ১২১ জন এবং জুন-এ ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে৷ ফেব্রুয়ারিতে একজনেরও মৃত্যু হয়নি৷ তেমনি বয়স ভিত্তিক মৃতের হিসেবে দুই জন শিশু ছাড়াও ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সী ৭ জন, ৩০ থেকে ৪০ বছর বয়সী ১৯ জন, ৪০ থেকে ৫০ বছর বয়সী ১৮ জন, ৫০ থেকে ৬০ বছর বয়সী ২৯ জন, ৬০ থেকে ৭০ বছর বয়সী ৩৫ জন, ৭০ থেকে ৮০ বছর বয়সী ২৮ জন এবং ৮০ বছরের উর্ধে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে৷ দুই জন শিশুর মধ্যে একজনের বয়স মাত্র ৭ মাস এবং অন্যজনের বয়স ১৮ বছর৷ ডা: সঞ্জীব দেববর্মার কথায়,৭ মাসের শিশুটি জ্বর, শ্বাসকষ্ট, বমি হচ্ছে এমন সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে এসেছিল৷ হাসপাতালে আসার ১ ঘন্টা ৫০ মিনিটের মধ্যে তার মৃত্যু হয়েছে৷ অন্যজন, কিডনি রোগী ছিল৷ তাকে ডায়ালাইসিস নিতে হতো৷ হাসপাতালে আসার ৫০ মিনিটের মধ্যেই তার মৃত্যু হয়েছে৷ তাঁর, অনেকটা দেরিতে তাদের হাসপাতালে আনা হয়েছিল৷ ফলে তাদের চিকিতা পরিষেবা দেওয়ার তেমন সুযোগ ছিল না৷
এদিকে ওই রিপোর্টে আরও জানা গেছে, করোনা আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে আসার ২৪ ঘন্টার মধ্যে ৪৩ জনের, ৪৮ ঘন্টার মধ্যে ২৬ জনের, ৭২ ঘন্টার মধ্যে ১৩ জনের এবং ৭২ ঘন্টার অধিক সময় পরে ৬০ জনের মৃত্যু হয়েছে৷ এ-বিষয়ে জি বি হাসপাতালের প্রধান মাইক্রো বায়োলজিস্ট ডা: তপন মজুমদার বলেন, কম বয়সীদের মধ্যেও এবার মৃত্যুর হার বেশি৷ কারণ, অসুরক্ষিত অবস্থায় ভাইরাস দেহে প্রবেশ করছে৷ তারপর অনেকেই সময়মতো নমুনা পরীক্ষা করছেন না৷ ফলে, ভাইরাস দেহে অনেকটাই ক্ষতি করে ফেলছে মানুষের অজান্তেই৷ তাছাড়া, অল্প বয়সীরা দেহে অক্সিজেনের মাত্রা কমে গেলেও তারা অনুভব করতে পারেন না৷ ফলে, যখন মারাত্মক অবস্থায় চলে যান তখন ওই রোগী-কে বাচানো সম্ভব হচ্ছে না৷ কারণ, করোনা আক্রান্তের অক্সিজেনের মাত্রা ৬০ শতাংশের নিচে নেমে গেলে অত্যাধুনিক চিকিতা পরিকাঠামো দিয়েও তাকে বাঁচানো সম্ভব নয়, দাবি করেন তিনি৷
বিশেষজ্ঞ চিকিতকদের দাবি, করোনা মানুষের ফুসফুসে সরাসরি আঘাত করছে৷ তাছাড়া, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট করে দিচ্ছে৷ ফলে, শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ বিকল হয়ে যাচ্ছে৷ মৃত্যুর জন্য যা অন্যতম প্রধান কারণ৷ শুধু তাই নয়, করোনা আক্রান্ত হওয়ার পর বিলম্বে নমুনা পরীক্ষা অনেককেই মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে৷ ডা: দ্বীপ কুমার দেববর্মার কথায়, ত্রিপুরায় আক্রান্তের নমুনা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে৷ পরিস্থিতি এভাবে থাকলে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে যাবে৷ তবে, করোনার সমস্ত বিধিনিষেধ পালন না করা হলে বিপর্যয় আটকানো সম্ভব হবে না৷
জিবি হাসপাতালে কোভিড-র দায়িত্বে থাকা ডা: শংকর বলেন, বর্তমানে করোনা আক্রান্তদের চিকিতায় বিশেষজ্ঞ চিকিতক-রা নিয়োজিত রয়েছেন৷ জুনিয়র ডাক্তারদের পাশাপাশি বিশেষজ্ঞরাও চিকিতা পরিসেবা দিচ্ছেন৷ ওয়ার্ড এবং আইসিইউ-র জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক চিকিতক নিযুক্ত করা হয়েছে৷ তাছাড়া, স্বাস্থ্য অধিকর্তার কার্যালয় থেকে দেওয়া ডায়েট চার্ট অনুযায়ী রোগীদের খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে৷

