কাঞ্চনপুরে ব্রু শরণার্থী পুনর্বাসন নিয়ে পরিস্থিতি থমথমে, অনির্দিষ্টকালের জন্য ১৪৪ ধারা জারি

আগরতলা, ১৮ নভেম্বর (হি.স.)৷৷ ব্রু শরণার্থী পুনর্বাসন নিয়ে আপত্তির জেরে কাঞ্চনপুরে জয়েন্ট মুভমেন্ট কমিটি আহূত অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটকে ঘিরে আইন-শৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখার জন্য আগামীকাল সকাল থেকে অনির্দিষ্টকালের ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে৷ যদিও বুধবার ১৪৪ ধারাকে উপেক্ষা করে মানুষ রাস্তায় নেমেছেন এবং পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করে মুহুর্মুহু স্লোগান দিচ্ছেন৷ তাতে পরিস্থিতি থমথমে হয়ে রয়েছে৷ মহকুমা পুলিশ আধিকারিকের দাবি, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণাধীন৷ আন্দোলনকারীরা শান্তিপূর্ণভাবেই আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন৷


কাঞ্চনপুর মহকুমা পুলিশ আধিকারিক বিক্রমজিৎ শুক্লদাস বলেন, ১৪৪ ধারা জারি থাকা সত্ত্বেও মানুষের জমায়েত হয়েছে ঠিকই৷ তবে সকলেই শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলনে শামিল হয়েছেন৷ তাঁর দাবি, দুই সহস্রাধিক মহকুমাবাসী আজ রাস্তায় নেমে স্লোগান দিচ্ছেন৷ কিন্তু, কোনও ধরনের উশৃঙ্খল আচরণ কেউ করছেন না৷ তিনি জানান, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য স্থানে স্থানে পুলিশ ও টিএসআর-এর সাথে কেন্দ্রীয় আধা সামরিক বাহিনীও মোতায়েন করা হয়েছে৷

এদিকে, জয়েন্ট মুভমেন্ট কমিটির সদস্য রঞ্জিত নাথের বক্তব্য, অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে হলে ত্রিপুরা সরকারকে আমাদের সমস্ত দাবি মানতে হবে৷ তিনি বলেন, শান্তিপূর্ণভাবেই আমরা আন্দোলন করছি৷ সরকারকেও আমাদের দাবি পূরণে বিবেচনা করতেই হবে৷ এদিন, ধর্মঘটের জেরে ছাত্রছাত্রীরা সুকলে যেতে পারেনি৷ বাজারহাট, দোকানপাট, অফিস-আদালত সমস্তই বন্ধ৷ তবে পরিস্থিতি যাতে বিগড়ে না যায় সেজন্য গতকাল রাতে কাঞ্চনপুরের মহকুমাশাসক আজ রাত ১১টা ৫৯ মিনিট পর্যন্ত ১৪৪ ধারা জারি করেছিলেন৷
ব্রু শরণার্থী পুনর্বাসনে আপত্তি জানিয়ে জয়েন্ট মুভমেন্ট কমিটির আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়েছে শাসকদল বিজেপি এবং বিরোধী সিপিএম৷ আজ বুধবার জেএমসি-র মঞ্চে গিয়ে তাঁরা হাজির হয়েছেন এবং সমর্থন দেওয়ার পক্ষে বক্তব্যও পেশ করেছেন৷ স্বাভাবিকভাবেই ব্রু শরণার্থী পুনর্বাসন নিয়ে রাজনীতির নতুন সমীকরণ দেখা যাচ্ছে৷ অবশ্যই, জেএমসি সদস্যদের মনোবল আজ আরও শক্তিশালী হয়েছে৷ তবে একঘরে হয়ে গেছেন স্থানীয় আইপিএফটি-র বিধায়ক প্রেমকুমার রিয়াং৷ শরণার্থীদের পাশে তিনি দাঁড়িয়েছেন, এমন অভিযোগ খণ্ডন করে তাঁর দাবি, রাজনৈতিক চালের স্বীকার হয়েছি৷ মানবিক দৃষ্টিতে ব্রু-দের পাশে দাঁড়ানোয় আমার বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ আনা হয়েছে৷ ব্রু শরণার্থী পুনর্বাসন নিয়ে আপত্তির জেরে কাঞ্চনপুরে জয়েন্ট মুভমেন্ট কমিটি আহূত অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটকে ঘিরে আইন-শৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখার জন্য আগামীকাল সকাল থেকে অনির্দিষ্টকালের ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে৷


এদিন কাঞ্চনপুর মহকুমায় ১৪৪ ধারা জারি থাকা সত্ত্বেও জেএমসি-র নেতৃত্বে মানুষ রাস্তায় নেমেছেন৷ ব্রু শরণার্থী পুনর্বাসনে দাবি না মানা হলে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট প্রত্যাহৃত হবে না, তাতেই তারা অনড় রয়েছেন৷ জেএমসি-র আহ্বায়ক সুশান্ত বিকাশ বড়ুয়া বলেন, আজ আমাদের এই আন্দোলনকে বিজেপি এবং বামফ্রন্ট-এর সমর্থন মিলেছে৷ সিপিএম-এর প্রাক্তন জেলা পরিষদ সদস্য ললিত দেবনাথ এবং বিজেপি-র মণ্ডল সভাপতি সহ শীর্ষ নেতৃত্ব আজ আমাদের সাথে এক মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন৷ তাঁরা সাফ জানিয়েছেন, ব্রু শরণার্থী পুনর্বাসনে জেএমসি-র দাবি যুক্তিসংগত৷ তাই, জেএমসি-র পাশে আমরা রয়েছি, বলেন সুশান্ত বিকাশ বড়ুয়া৷ তিনি জানান, বিজেপি-র মণ্ডল সভাপতি গৌতম রায়, সহ সভাপতি রবীন্দ্র কর, অরুণ নাথ এদিন তাঁদের সাথে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন৷

তাঁর কথায়, ব্রু শরণার্থী পুনর্বাসনে সবর্োচ্চ ৫০০ পরিবারকে কাঞ্চনপুরে বসবাসের ব্যবস্থা করা, বাঙালি উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন সহ ক্ষতিপূরণ, বিদ্যুৎ এবং পানীয় জল ও স্বাস্থ্যবিধান দফতরের দরপত্র বাতিল ও চারটি স্থান তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার দাবি পূরণ করতেই হবে৷ নয়তো, অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হবে না৷ তিনি বলেন, ব্রু শরণার্থী পুনর্বাসন নিয়ে ত্রিপুরা সরকারকে অনেক সময় দেওয়া হয়েছে৷ কিন্তু এতে কোনও সুরাহা হয়নি৷ এখন মুখ্যসচিব কিংবা মুখ্যমন্ত্রীর কাছ থেকে লিখিত প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেলে তবেই ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হবে৷


তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ব্রু শরণার্থী পুনর্বাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগেই তাদের উৎপাত সহ্য করতে হচ্ছে৷ গতকাল ব্রু-দের ভয়ে ২৮০ পরিবার বাড়িঘর ছেড়ে সুকলে আশ্রয় নিয়েছে৷ শুধু তা-ই নয়, স্থানীয়দের বাড়ি থেকে চারটি গরু ব্রু শরণার্থীরা ছিনিয়ে নিয়ে গেছে৷ অথচ, পুলিশের কোনও হেলদোল লক্ষ্য করা যায়নি৷ তাঁর দাবি, কাঞ্চনপুরে শান্তি বজায় রাখার জন্য জেএমসি-র দাবি সরকারকে মানতেই হবে৷
এদিকে, জেএমসি-র সদস্যরা আইপিএফটি-র স্থানীয় বিধায়ক প্রেমকুমার রিয়াঙের বিরুদ্ধে ভীষণ অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন৷ ফলে, স্থানীয় বিধায়ক হলেও শাসকদল বিজেপি এবং বিরোধী সিপিএমের তুলনায় তাঁকে অনেকটা কোণঠাসা দেখাচ্ছে৷ তাই, ব্রু শরণার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর অভিযোগ খণ্ডন করেছেন তিনি৷ তাঁর কথায়, রেশন বন্ধ করে দেওয়ায় মানবিক দৃষ্টি থেকে ব্রু শরণার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম৷ কিন্তু, ত্রিপুরায় পুনর্বাসন দেওয়ার জন্য কখনওই আবেদন জানাইনি৷ তাঁর বক্তব্য, ত্রিপুরা সরকার মনে করেছে ব্রু শরণার্থীদের রাজ্যে পুনর্বাসন দেওয়া উচিত, সেই মতো সিদ্ধান্ত নিয়েছে৷ তাতে স্থানীয় বিধায়ক হলেও ত্রিপুরা সরকার আমার মতামত জানতে চায়নি৷ তাঁর দাবি, ব্রু শরণার্থী সংক্রান্ত কোনও কমিটিতে আমাকে রাখা হয়নি৷ ফলে, ব্রু-দের পুনর্বাসনের সাথে আমাকে জড়িয়ে ভিত্তিহীন অভিযোগ আনা হচ্ছে৷ তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, ব্রু-দের পাশে দাঁড়ানো নিয়ে রাজনৈতিক চালের স্বীকার হয়েছি আমি৷ কারণ, ত্রিপুরা সরকার সকলের মঙ্গল ভেবেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে৷ তাতে অযথা আমাকে জড়ানো হচ্ছে৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *