নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা, ২৩ মার্চ৷৷ করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় লকডাউন করা হচ্ছে রাজ্যকে৷ আজ মহাকরণে এক সাংবাদিক সম্মেলনে এই ঘোষণা দেন মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেব৷ তিনি বলেন মঙ্গলবার দুপুর দুইটা থেকে লকডাউন করা হবে ত্রিপুরাকে৷ ৩১ মার্চ বিকাল ৫টা পর্যন্ত চলবে লক ডাউন৷ তাঁর দাবি, গোটা বিশ্বে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ যেভাবে আতঙ্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, এর থেকে ত্রিপুরাকে মুক্ত রাখার জন্যই রাজ্য সরকার এই উদ্যোগ গ্রহণ করেছে৷ মুখ্যমন্ত্রী এদিন রাজ্যবাসীর প্রতি দৃঢ়ভাবে আহ্বান রাখেন, প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হবেন না৷ ওই আদেশ উলঙ্ঘন হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে, কড়া বার্তা দেন তিনি৷
করোনা ভাইরাস অর্থাৎ কোভিড-১৯ সংক্রমণ মোকাবিলা করতে রাজ্য সরকার আগামীকাল ২৪ মার্চ, ২০২০ দুপুর ২টা থেকে ৩১ মার্চ, ২০২০ বিকেল ৫টা পর্যন্ত ত্রিপুরাকে লকডাউন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে৷ আজ মহাকরণের প্রেস কনফারেন্স হলে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে রাজ্য সরকারের এই সিদ্ধান্তের কথা সাংবাদিকদের কাছে তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেব৷ তিনি বলেন, ইতিমধ্যে রাজ্য সরকার ১৩ মার্চ থেকে রাজ্যে ১৪৪ ধারা জারি করেছে৷ মুখ্যমন্ত্রী ১৪৪ ধারার নিয়মকানুন মেনে চলার জন্য রাজ্যবাসীর প্রতি আবেদন জানিয়েছেন৷ এই সময়ে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া রাজ্যবাসীকে বাড়ি থেকে না বেরোনোর জন্য আহ্বান জানিয়েছেন তিনি৷ মুখ্যমন্ত্রী জানান, এই লকডাউন সময়ে রাজ্যে কোনও ধরনের পাবলিক ট্রান্সপোর্ট অর্থাৎ গণপরিবহণ ব্যবস্থা থাকবে না৷ তবে এই ক্ষেত্রে অত্যাবশ্যকীয় দ্রব্য পরিবহণ ব্যবস্থা চালু থাকবে৷ পাশাপাশি জরুরি পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত অফিস ও প্রতিষ্ঠানগুলি খোলা থাকবে৷
মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত এলাকা দিয়ে যাতে কেউ প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য সীমান্ত এলাকার প’ায়েত, ভিলেজ কমিটির প্রধান, উপপ্রধান, বিডিও, প’ায়েত সচিব, নির্বাচিত সদস্যদের বিশেষ নজর দিতে হবে৷ এই ক্ষেত্রে কোনও ধরনের অবহেলা দেখা গেলে তা কঠোরভাবে মোকাবিলা করা হবে৷ সীমান্ত এলাকায় বহির্দেশীয় কেউ আশ্রয় নিলে তা সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে জানাতে হবে৷ এইক্ষেত্রে না জানানো হলে পরবর্তীতে জানতে পারলে আশ্রয় দেওয়া পরিবারের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে৷ তিনি বলেন, ত্রিপুরাকে এই মহামারি থেকে সুুরক্ষিত রাখার জন্য সরকার সর্বোচ্চ পর্যায়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে৷ এই ক্ষেত্রে কোনও ধরনের গাফিলতি বরদাস্ত করা হবে না৷ বর্ডার এলাকায় আগামী ১ মাস জনতা কার্ফ মেনে চলার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান মুখ্যমন্ত্রী৷ পাশাপাশি প্রয়োজন ছাড়া বাড়ি থেকে বের না হওয়া, নিজেকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য আহ্বান জানান তিনি৷ লকডাউন চলাকালীন সময়ে জরুরি পরিষেবা যথারীতি চালু থাকবে৷ গ্রোসারি শপ, ওষধু, সব্জি, ফল, মাছ, মাংস, গণবন্টন ব্যবস্থা, ব্যাঙ্ক, এটিএম ইত্যাদি নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যবস্থা চালু থাকবে৷ এই সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর কালোবাজারি করলে বা অবৈধভাবে মজত, লকডাউনের নাম করে দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধি করলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে৷ প্রয়োজনে আইনগত ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হবে৷
সাংবাদিক সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী রতনলাল নাথ করোনা মহামারি মোকাবিলায় সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলি সর্ম্পকে জানান৷ তিনি বলেন, অন্ত্যোদয় অন্ন যোজনা ও প্রায়োরিটি হাউজহোল্ড মিলে ত্রিপুরার ৫ লক্ষ ৮৬ হাজার পরিবারকে আগাম ১৫ দিনের রেশন বিনামূল্যে দেওয়া হবে৷ ২ লক্ষ ৬৬ হাজার প্রাথমিক স্তরের ছাত্রছাত্রী যারা সরকারী ও সরকারী সহায়তায় চালিত বিদ্যালয়গুলিতে লেখাপড়া করছে তাদের ১৫ দিনের মিড ডে মিলের বরাদ্দ বাবদ ১৮ কেজি চাল এবং ৫০০ গ্রাম ডাল বিনামূল্যে দেওয়া হবে৷ উচ্চ প্রাথমিকের ক্ষেত্রে ১ লক্ষ ৬৫ হাজার ছাত্রছাত্রীকে এই বরাদ্দ বাবদ ২৫ কেজি চাল এবং ৭৫০ গ্রাম ডাল দেওয়া হবে৷ অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রের শিশুদের বাড়িতে বিনামূল্যে সরবরাহক’ত রেশন আগামী ১৫ দিনের রেশন দেওয়া হবে৷ সমস্ত ধরনের সামাজিক ভাতা (এপ্রিল ও মে মাসের) আগাম এপ্রিল মাসে সরাসরি সুুবিধাভোগীদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে দেওয়া হবে৷ এজন্য ৭২ কোটি টাকা ব্যয় হবে৷ সরকারি কোয়ারেনটিন সেন্টারগুলিতে থাকা, খাওয়া ও চিকিৎসা ইত্যাদি সমস্ত ধরনের পরিষেবা সরকারের পক্ষ থেকে বিনামূল্যে দেওয়া হবে৷ সংক্রমণের কারণে কেউ মারা গেলে বা পজেটিভ রোগীর চিকিৎসা ও অন্যান্য পরিষেবার সাথে যুক্ত কেউ মারা গেলে ৪ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে৷ যে সকল এম জি এন রেগা প্রকল্পে জবকার্ড রয়েছে তাদের এই প্রকল্পে ১০ দিনের কাজ দেওয়া হবে৷ এছাড়া রাজ্য সরকার গ্রামীণ এলাকায় প’ায়েত ডেভেলপমেন্ট ফাণ্ড (পি ডি এফ) এবং শহর এলাকায় ত্রিপুরা আরবান এমপ্লয়মেন্ট প্রোগ্রাম এর অধীনে কাজ দেওয়া হবে৷ এরজন্য প্রতিটি ক্ষেত্রে ৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে৷ কাজের জায়গাগুলিতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে৷ শ্রমিকদের নিরাপত্তার জন্য মাস্ক ও সেনিটাইজার দেওয়া হবে৷
এম জি এন রেগার কাজে শ্রমিকদের বকেয়া মজরি শীঘই মিটিয়ে দেওয়ার জন্য ইতিমধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী ভারত সরকারের সাথে যোগাযোগ করে ৭৩ কোটি টাকা বরাদ্দ করার জন্য অনুরোধ করেছেন৷ আসাম সরকারকে অনুরোধ করা হবে মালবাহিত লরিগুলিকে ত্রিপুরায় আসতে অনুমতি দেওয়ার জন্য৷ স্টেট ডিজাস্টার রেসপন্স ফাণ্ড থেকে সমস্ত উজ্জলা যোজনার সুুবিধাভোগী পরিবারগুলিকে ১ হাজার টাকা করে দেওয়ার জন্য ভারত সরকারের কাছে অনুমতি চাওয়া হবে৷ স্বাস্থ্য দপ্তর এবং খাদ্য দপ্তরের নিবেদিত সহায়তা কেন্দ্র খোলা হবে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য৷ সাংবাদিক সম্মেলনে বনমন্ত্রী মেবার কুমার জমাতিয়া, মুখ্যসচিব মনোজ কুমার এবং রাজ্য পুলিশের অতিরিক্ত মহানির্দেশক রাজীব সিং উপস্থিত ছিলেন৷

