আলওয়ারে গণপিটুনির ঘটনায় রাজনীতি সরগরম, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের রিপোর্ট তলব, ট্যুইটে অাক্রমণ রাহুলের, পাল্টা জবাব বিজেপির

নয়াদিল্লি, ২৩ জুলাই (হি.স.) : রাজস্থানের আলওয়ারে গণপিটুনির ঘটনায় কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকারকে কোণঠাসা করতে রাজনীতির ময়দানে নেমেছে কংগ্রেস সহ অবিজেপি শক্তিগুলো। গত শনিবার আলওয়ারে গরু পাচারকারী সন্দেহে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে মারে জনতা। এই ঘটনা নিয়ে দেশজুড়ে আলোড়ন তৈরি হয়েছে। বিরোধী দলগুলি কেন্দ্রীয় ও রাজস্থান সরকারের সমালোচনায় সরব হয়ে ওঠে।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে অাজ সোমবারও জাতীয় রাজনীতি ছিল সরগরম। যদিও ওই ঘটনা সম্পর্কে জানাতে রাজস্থান সরকারের কাছে বিস্তারিত রিপোর্টও তলব করেছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক। এর পাশাপাশি রাজস্থান সরকারও ঘটনার নিন্দা করে ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। রাজস্থান পুলিশের স্পেশ্যাল ডিজি এন আর কে রেড্ডি বলেন, এই ঘটনায় তিন অভিযুক্ত গ্রেফতার করা হয়েছে। অ্যাসিস্টেন্ট সাব-ইনস্পেক্টর সাসপেন্ড করা হয়েছে। তিন কনস্টেবলকে জেলা লাইনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চলছে।
ঘটনার পর থেকে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এদিনও গণপিটুনিতে মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশের বিরুদ্ধে গড়িমসির অভিযোগ উঠল| অভিযোগ, পুলিশ প্রথমে আকবর খান নামে ওই যুবককে স্নান করায় এবং উদ্ধার হওয়া গোরুগুলোকে অন্যত্র পাঠানোর ব্যবস্থা করে| তারপর থানায় নিয়ে যাওয়া হয় আকবরকে| ভোর চারটে নাগাদ হাসপাতালে পৌঁছনোর পর চিকিত্সকেরা আকবরকে মৃত বলে ঘোষণা করেন| আর তাই পুলিশের বিরুদ্ধে গড়িমসির অভিযোগ উঠেছে| এ প্রসঙ্গে অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমেন সাংসদ আসাউদ্দিন ওয়েইসি জানিয়েছেন, ‘রাজস্থান পুলিশের কাজে আমি অবাক নেই| পেহলু খানের সময়েও একই কাজ করেছিল|’ আলওয়ারে গো-রক্ষার নামে গণপিটুনিতে মৃত্যুর ঘটনায় এই কথা বললেন ওয়েইসি| তিনি আরও বলেন, ‘রাজস্থান পুলিশ ওই গো-রক্ষকদের মদত দিচ্ছে|’
গণপিটুনির ঘটনায় রাজস্থানের মন্ত্রী গুলাব চাঁদ কাটারিয়া বলেছেন, ‘মিডিয়া রিপোর্টে বলা হয়েছে প্রহৃতকে দেরি করে হাসপাতালে নিয়ে যায় পুলিশ| এটি সত্য প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে|’ পুলিশের বিরুদ্ধে গড়মসির অভিযোগ উঠলেও, আকবরের ভাই ইলিয়াস খান জানিয়েছেন, ‘পুলিশের কাজে আমাদের কোনও সন্দেহ নেই| আমরা বিচার চাই, দোষীদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত|’ আকবরের মৃত্যুর ঘটনায় সিনিয়র পুলিশ আধিকারিকদের হাতে তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছেন রাজস্থানের ডিজিপি ও পি গালহোত্রা| পাশাপাশি রিপোর্ট জমা দিতেও নির্দেশ দিয়েছেন ডিজিপি|
আলওয়ার ইস্যুতে এদিন সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে কাঠগড়ায় দাঁড় করালেন কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী। রাজস্থান পুলিশের গাফিলতিতে আকবর খানকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে দেরী হওয়ায় সে মারা যায়। গণপিটুনিতে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনায় পাল্টা কংগ্রেস সভাপতির নিন্দায় ট্যুইট করেন বিজেপি নেতা তথা কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল, কেন্দ্রীয় বস্ত্রমন্ত্রী স্মৃতি ইরানি।
সোমবার মাইক্র ব্লগিং সাইট ট্যুইটারে কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী ট্যুইট করে লেখেন, ‘মাত্র ছয় কিলোমিটার দূরে থাকা হাসপাতালে গণপিটুনিতে আহত রাকবর খানকে নিয়ে যেতে তিন ঘন্টা সময় লাগল পুলিশের। কারণটা হল তারা গাড়ি থামিয়ে চা পান করছিল। এটাই হচ্ছে মোদীর নৃশংস ‘নতুন ভারত’ যেখানে ঘৃণা মানবিকতাকে হটিয়ে দিয়েছে। মানুষকে পিষে তাকে হত্যার জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়েছে ।’ এরপরেই পাল্টা রাহুল গান্ধীর নিন্দায় সরব হন কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল। তিনি ট্যুইট করে লেখেন, অপরাধের ঘটনা ঘটলেই আনন্দে লাফানোটা বন্ধ করুন। রাজ্য দ্রুত এবং কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করার আশ্বাস দিয়েছে। রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য যে কোনও উপায়ে আপনি সমাজকে বিভাজন করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন। আর তারপর কুম্ভীরাশ্রু ফেলছেন। অনেক হয়েছে। আপনি ঘৃণার সওদাগর।
রেলমন্ত্রী পর এই প্রসঙ্গে একই ইস্যুতে রাহুল গান্ধীকে ট্যুইট করে বিধলেন কেন্দ্রীয় বস্ত্রমন্ত্রী স্মৃতি ইরানি। এদিন’৮৪ সালের শিখ দাঙ্গার প্রসঙ্গ তুলে স্মৃতি ইরানি ট্যুইটে লেখেন, ১৯৮৪ সালে ঘৃণার নিকৃষ্টতম ধরণ রাহুল গান্ধীর পরিবারের নেতৃত্বে সংগঠিত করা হয়েছিল। ভাগলপুর, নেল্লি এবং আরও এমন বহু উদাহরণ রয়েছে। লজ্জার বিষয় সেই একই পন্থা রাহুল গান্ধী অবলম্বন করেছেন। প্রতিটি ক্ষেত্রে সামাজিক ঘটনাগুলিকে রাজনৈতিক ফয়দায় ব্যবহার করেছেন তিনি। রাহুল গান্ধীর এই রাজনীতিকে ‘ভালচার রাজনীতি’ বা শকুনের রাজনীতি হিসেবে অভিহিত করেছেন স্মৃতি ইরানি।
এদিন লোকসভায় জিরো আওয়ারে বিষয়টি তুলে ধরেন কংগ্রেস সাংসদ করণ সিং যাদব। এই নিয়ে চতুর্থবার রাজস্থানে এরকম ঘটনা ঘটল বলে জানান তিনি।
এদিন লোকসভার জিরো আওয়ারে কংগ্রেস সাংসদ করণ সিং যাদব বলেন, যারা নিজেদের ‘গোরক্ষক’ হিসেবে পরিচয় দেয় তারা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। পাশাপাশি পুলিশের ভূমিকা নিয়ে সরব হন তিনি। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশ সময় নষ্ট করেছে। তার জেরে মৃত্যু হয় ওই ব্যক্তির। রাজস্থানে এমন ঘটনা এই নিয়ে চতুর্থবার ঘটল বলে জানিয়েছেন তিনি। আলোয়ার গণপিটুনি কাণ্ডে বিচারবিভাগীয় তদন্তের দাবি করলেন রাজস্থান প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি সচীন পাইলট।
অন্যদিকে আলওয়ার গণপিটুনি কাণ্ডে সংসদ চত্বরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে কেন্দ্রীমন্ত্রী কিরেন রিজিজু বলেন, কেন্দ্রের তরফ থেকে দেশের সমস্ত রাজ্যগুলিকে ‘গণপিটুনির’ ঘটনাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। এদিন দেশজুড়ে ধর্ষণকাণ্ড নিয়ে সরব হন কংগ্রেস সাংসদ জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া। লোকসভায় তিনি কাঠুয়া কাণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন তিনি। কাঠুয়া, উন্নাও, মান্ধসোরের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন তিনি।
এমনকি আলোয়ার কাণ্ডে অবশেষে মুখ খুললেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি জানিয়েছেন, রাজনাথজি এই ঘটনার নিন্দা করেছেন। কিছু শুধু মাত্র নিন্দাই করেছেন? তার তাদের নেতাদের সংযত করতে পারছে না। দলের ওপর থেকে নীচে পর্যন্ত ঘৃণার প্রচার চালানো হয়েছে। আর এটা এরকম ভাবে চলছে। অবিলম্বে এইগুলি বন্ধ করা উচিত। তারা গুরুকে গোমাতা বলে। হিন্দু তালিবান, উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠীর ক্রমাগত প্রচারের ফলে এই ঘটনা ঘটেছে। তারা আইন নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছে।
এদিকে পশ্চিমবঙ্গেও গণপিটুনির ঘটনা ঘটছে।এদিনও ছেলেধরা সন্দেহে ২ মহিলাকে বিবস্ত্র করে মারধরের অভিযোগ। ঘটনাটি ঘটেছে জলপাইগুড়ির ধূপগুড়ির বারোঘড়িয়ার এলাকায়। গ্রামের রাস্তায় ইতঃস্তত ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন দুই মহিলা। দেখে হয় গ্রামবাসীদের। ছেলেধরা সন্দেহে তাঁদের ঘিরে ধরেন গ্রামবাসীরা। একাধিক প্রশ্নও করেন। কিন্তু দুই মহিলার কাছ থেকে কোনও সদুত্তর না পেয়ে সন্দেহ আরও গাঢ় হয়। কেবল সন্দেহের বশেই ওই দুই মহিলার ওপর হামলা চালায় গ্রামবাসীরা। বিবস্ত্র করে তাঁদের মারধর করা হয় বলে অভিযোগ। পরে ধূপগুড়ি থানার পুলিস গিয়ে তাঁদের উদ্ধার করে।
এই ঘটনায় রাজস্থান সরকারের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার আবেদন জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন মহাত্মা গান্ধীর প্রপৌত্র তুষার গান্ধী ও কংগ্রেস নেতা তেহসিন পুনাওয়ালা। তাঁদের দাবি, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ সত্ত্বেও গণপিটুনি ও গো-রক্ষার ঘটনা দেখা যাচ্ছে। তাই এই নির্দেশ মানার জন্য নির্দেশিকা জারি করতে হবে। নির্দেশ অমান্য করায় রাজস্থান সরকারের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। এই মামলা পরবর্তী শুনানি অাগামী ২৮ অগাস্ট আবেদনের শুনানি হবে বলে প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্র, বিচারপতি এ এম খানবিলকর ও বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়ের বেঞ্চ জানিয়েছে।
পরিবারের একমাত্র রোজগেরে ছিলেন ২৮ বছর বয়সি আকবর| ভেবেছিলেন আয় বাড়াতে দুধের ব্যবসা করবেন| তাই গোরু কিনতে বন্ধু আসলামকে নিয়ে গত শুক্রবার হরিয়ানার মেওয়াটের কুলগাঁও থেকে মোটর বাইকে রাজস্থানের আলওয়ার জেলার লালাওয়ান্ডি গ্রামের দিকে রওনা হয়েছিলেন আকবর খান| গোরু কিনে বাড়ি ফেরার পথে রাত একটা নাগাদ গোরু পাচারকারী সন্দেহে তাঁদের উপর হামলা চালানো হয়| আসলাম প্রাণে বাঁচলেও, গণপিটুনিতে গুরুতর আহত হন আকবর| হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর ভোর চারটে নাগাদ আকবরের মৃত্যু হয়| রামগড় জেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রের চিকিত্সক ড. হাসান জানিয়েছেন, ‘ভোর চারটে নাগাদ আক্রান্তের মৃত্যু হয়| একজন পুলিশ অফিসারের নির্দেশে মৃতদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়|’ আকবরের মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশের বিরুদ্ধে উঠছে গড়িমসির অভিযোগ| সূত্রের খবর, আকবরকে উদ্ধার করার পর প্রথমে তাঁকে স্নান করানো হয়, তারপর উদ্ধার হওয়া গোরুগুলোকে অন্যত্র পাঠানোর ব্যবস্থা করে| তারপর থানায় নিয়ে যাওয়া হয় আকবরকে| এমনকি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে রাস্তায় দাঁড়িয়ে চা-ও খান পুলিশ কর্মীরা| ভোর চারটে নাগাদ হাসপাতালে পৌঁছনোর পর চিকিত্সকরা আকবরকে মৃত বলে ঘোষণা করেন|