বিশ্ব বঙ্গ সাহিত্য ও সংসৃকতি সম্মেলনে জাগরণ সম্পাদক বললেন বিপজ্জনক আগ্রাসনে বাংলা হারিয়ে যাচ্ছে

নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা, ১৩ নভেম্বর৷৷ ইংরেজীর আগ্রাসনে বাংলা হারিয়ে যাচ্ছে৷ এই আগ্রাসন বিপজ্জনক৷ ক্ষুদ্র রাজ্য

রবিবার আগরতলায় রবীন্দ্র শতবার্ষিকী ভবনে বিশ্ব বঙ্গ সাহিত্য ও সংসৃকতি সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন জাগরণ সম্পাদক পরিতোষ বিশ্বাস৷ ছবি নিজস্ব৷
রবিবার আগরতলায় রবীন্দ্র শতবার্ষিকী ভবনে বিশ্ব বঙ্গ সাহিত্য ও সংসৃকতি সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন জাগরণ সম্পাদক পরিতোষ বিশ্বাস৷ ছবি নিজস্ব৷

ত্রিপুরায়ও বাংলা ভাষা সংকটের মুখে৷ এই ভাষার উপর বিধিনিষেধ আরোপ করে দেওয়া হচ্ছে৷ এভাবে চলতে দেওয়া যায়না৷ এর বিরুদ্ধে জনমত গঠন করে আন্দোলন গড়ে তোলার উপর গুরুত্বারোপ করেছেন জাগরণ এর সম্পাদক পরিতোষ বিশ্বাস৷ রবিবার আগরতলায় রবীন্দ্র শতবার্ষিকী ভবনে বিশ্ব বঙ্গ সাহিত্য ও সংসৃকতি সম্মেলনের সমাপ্তি দিনে উত্তর পূর্বাঞ্চলের সংবাদপত্র, সাহিত্য, সংসৃকতির সমস্যা ও উত্তরণের পথ শীর্ষক আলোচনায় বক্তব্য রাখেন শ্রীবিশ্বাস৷
এই আলোচনাায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে জাগরণ সম্পাদক গভীর উদ্বেগের সঙ্গে বলেন, ত্রিপুরায়ও বাংলা ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে৷ আমরা গর্ব করে বলি আগরতলা সংসৃকতির শহর৷ কোথায় সেই সংসৃকতির দৃশ্যমানতা৷ আমরা ভারতবর্ষের নাগরিক৷ আমরা বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারব না৷ এটা তো গভীর উদ্বেগের৷ এভাবে চলতে দেওয়া যায় না৷ আমাদের মাতৃভাষা বাংলা৷ যেকোন ভাষাকেই আমরা শ্রদ্ধা করি৷ তার জন্য বাংলা ভাষাকে অবমাননা, প্রত্যাখান করা ঠিক নয়৷ বাংলা ভাষাকে বাঁচানো, তার যে ইতিহাস, ঐতিহ্য মানুষের মধ্যে তার প্রসরতা সেটাকে ধরে রাখা যাচ্ছে না৷ জাগরণ এর সম্পাদক গভীর উদ্বেগের সঙ্গে বলেন, ত্রিপুরার রাজ্য ভাষা বাংলা, ইংরেজী ও ককবরক৷ তারপরও কোন সরকারী অফিসে বাংলা ভাষায় কোন কাজ হয় না৷ যদিও ত্রিপুরার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের মানুষ বাঙালী৷ বাংলা ভাষায় কথা বলেন৷ সেখানেই বাংলা ভাষা আজ উপেক্ষিত৷ এটা চলতে পারে না বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন৷
[vsw id=”Am6OlkVykJ4″ source=”youtube” width=”425″ height=”344″ autoplay=”yes”]প্রসঙ্গেক্রমে পরিতোষ বিশ্বাস বলেন, বহু দুর্য্যোগ আমাদের সামনে এসেছে৷ কিন্তু, আজকের মতো দুর্য্যোগ আগে কোনদিন এসেছে বলে মনে হয়না৷ আগরতলার মাটিতে যেহেতু এই সাহিত্য ও সংসৃকতি সম্মেলন হচ্ছে তাই তিনি বলেন, এখানে ইংরেজী পত্রিকা রয়েছে দুইটি, ককবরক পত্রিকা রয়েছে একটি এবং বাংলা ভাষায় দৈনিক ষোলটি পত্রিকা বেরুয়৷ তিনি বলেন, সাহিত্য পত্র আমাদের উত্তর পূর্বাঞ্চলে তেমন সন্ধান পাওয়া যায়না৷ খুব কম৷ ত্রিপুরায় সাহিত্য পত্র তো হারিয়েই গিয়েছে৷ ছোট বেলায়, আমরা যখন কলেজে পড়তাম তখন সাহিত্য পত্রের ছড়াছড়ি ছিল বলে জানান শ্রীবিশ্বাস৷ তিনি বলেন, লিটল ম্যাগাজিন সাহিত্যিকদের জন্ম দেয়৷ গল্পকার, উপন্যাসিক বেড়িয়ে আসতেন এই লিটল ম্যাগাজিনের মধ্য দিয়ে৷ তাদের লেখনি উদ্ভাসিত হয়েছে লিটল ম্যাগাজিনের মাধ্যমেই৷ আজ দুর্ভাগ্যের বিষয় লিটল ম্যাগাজিন আমরা দেখিনা৷ এটা বাংলা ভাষা, বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে দুঃসংবাদ৷ আজ আমরা আতঙ্কিত ও উদ্বিগ্ণ৷
সংবাদ মাধ্যম প্রসঙ্গে জাগরণ সম্পাদক বলেন, আমরা ওয়েবসাইটের যুগে এসেছি৷ ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়ার যুগে এগুচ্ছি৷ কিন্তু, যে সংসৃকতি ও ঐতিহ্যের হাত ধরে আমাদের বাংলা সাহিত্য বিকশিত হয়েছে, সেই ঐতিহ্য হারিয়ে গিয়েছে৷ আমরা চাই ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়া আরও বিকশিত হোক৷ কিন্তু, তার অর্থ এই নয় যে আমাদের ঐতিহ্যকে গ্রাস করবে৷ এটা খুবই দুঃখের৷ পরিতোষ বিশ্বাস গভীর উদ্বেগের সঙ্গে বলেন, এখন আমাদের সন্তানরা, এই প্রজন্ম রবীন্দ্রনাথকে জানে না, নজরুলকে জানে না, শরৎচন্দ্রকে জানে না৷ একদিন পৃথিবীকেই ভুলে যাবে৷
বাংলা ভাষা আজ যেভাবে উপেক্ষিত হচ্ছে, ঐতিহ্য হারাচ্ছে তার বিরুদ্ধে জনমত গঠন করে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে বলে শ্রীবিশ্বাস অভিমত ব্যক্ত করেন৷ এই প্রসঙ্গে তিনি বিশ্ব বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, আমরা সংসৃকতি চর্চা করব, সঙ্গীতের সাধনা করব ঠিকই কিন্তু, বাংলা ভাষার উপর যে আগ্রাসন হচ্ছে তার বিরুদ্ধে একটি গণ আন্দোলন গড়ে তোলা হোক৷ এটা সবচেয়ে বড় আন্দোলন বলে তিনি মনে করেন৷ আর এই আন্দোলনের সময় এসে গিয়েছে৷ আর দেরী করা চলে না৷ তাছাড়া উত্তর পূর্বাঞ্চলের সংবাদপত্র, সাহিত্য, সংসৃকতির সমস্যা ও উত্তরণের পথ শীর্ষক আলোচনায় যে উত্তরণের পথের কথা বলা হচ্ছে, সেই উত্তরণের পথ যদি বলতে হয় তাহলে মানুষকে সেইভাবে বোঝাতে হবে৷ যারা এই সমস্যার সৃষ্টি করছেন সংকীর্ণ স্বার্থে, রাজনৈতিক স্বার্থে তাদেরকে চিহ্ণিত করতে হবে৷ এর থেকে যদি আমরা পিছিয়ে যাই তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ বিপন্ন হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন৷
সম্মানীত অতিথির ভাষণে জাগরণ সম্পাদক বলেন, বাংলা ভাষার পাশাপাশি ইংরেজী ভাষার গুরুত্বও রয়েছে৷ এখন ছোট ছোট ছোট শিশুরা বাংলা ভাষা পড়ছে না৷ অভিভাবকরা বাংলা মাধ্যম সুকলে ছেলেমেয়েদের পাঠাচ্ছেন না৷ ইংরেজী মাধ্যম সুকল এখানে গড়ে উঠছে৷ ইংরেজী আমরা বর্জন করতে পারব না৷ ইংরেজী একটি আন্তর্জাতিক ভাষা৷ এই ভাষাকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা মানে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা৷ এটা চলতে দেওয়া যায় না৷ এখানেই বিশ্ব বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনকে এগিয়ে আসতে হবে৷ এই প্ল্যাটফর্মে আসতে হবে৷ এটাই হবে বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনের সবচেয়ে বড় কাজ বলে অভিমত ব্যক্ত করেন জাগরণ সম্পাদক৷ তিনি আরও বলেন, সাহিত্য চর্চা নিয়ে এতটা সময় দিতে পারছে না৷ কেন পারছে না৷ কারণ আমরা সাহিত্য আলোচনায় উৎসাহী নই৷ সাহিত্য নিয়ে আমাদের যে উদাসীনতা, আমাদের যে মানসিকতা এরজন্য ঐতিহ্য হারাতে বসেছি, সংসৃকতি হারাতে বসেছি৷ আজ নেই কোন প্রতিবাদ, নেই কোন প্রতিরোধ৷ বাংলা ভাষায় বানান নিয়েও জাগরণ সম্পাদক গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন৷ তিনি জানান, পশ্চিমবাংলার বিভিন্ন বাংলা সংবাদপত্রে যে বানান ব্যবহার করা হয় তা বাংলা অভিধান খুললে দেখা যায় অন্যরকম৷ বাংলা ভাষায় বানান সম্পর্কে একটি বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন৷ যাতে বাংলা ভাষার যে দুর্বলতা তা কাটিয়ে উঠতে পারি৷
এদিন, উত্তর পূর্বাঞ্চলের সংবাদপত্র, সাহিত্য, সংসৃকতির সমস্যা ও উত্তরণের পথ শীর্ষক আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্যন্দন সম্পাদক সুবল কুমার দেও বাংলা ভাষার উপর আগ্রাসন চলছে বলে মন্তব্য করে উদ্বেগ প্রকাশ করেন৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *