ত্রিপুরায় বিজেপির উত্থান নিয়া রাজ্যের রাজনৈতিক মহল কতখানি ভাবিত তাহা এখনও স্পষ্ট নহে৷ তবে, দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব যে, এই প্রত্যন্ত রাজ্যে দলের আধিপত্য কায়েমে সচেষ্ট তাহা অনেকটাই পরিস্কার৷ ঘন ঘন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের রাজ্য সফর অন্তত সেই ইঙ্গিতই বহন করিতেছে৷ রাজ্যে কেন্দ্রের মন্ত্রিদের এক সাথে দুই কাজ সারিয়া নিতে দেখা যায়৷ সাম্প্রতিককালে, রাজ্য যে ক’জন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী আসিয়াছেন তাঁহারা সরকারী কর্মসূচীতে যেমন অংশ নিয়াছেন তেমনি রাজনৈতিক কর্মকান্ডেও যুক্ত হইয়াছেন৷ শুধু যুক্ত হওয়া নহে, একেবারে জ্বালাময়ী ভাষণ রাখিতেছেন৷ বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে কামান দাগাইতেছেন৷ কেন্দ্রের ডোনারমন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং এইবার রাজ্য সফরে আসিয়া বিভিন্ন কর্মসূচীতে অংশ নিয়াছেন৷ তিনি রাজ্যে আইনশৃঙ্খলার বিষয়ে জ্বালাময়ী বক্তব্য রাখিয়াছেন৷ বিজেপি’র নেতা কর্মীর আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি সম্পর্কে তাহাকে রীতিমতো হুমকির সুর চড়াইতে দেখা গিয়াছে৷ তিনি বলিয়াছেন, আমরা অসহিষ্ণু নহি৷ কিন্তু রাজ্যে চরম অসহিষ্ণুতা চলিতেছে৷ রাজ্যে আইন শৃঙ্খলার বিষয়ে তিনি মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গেও আলোচনা করিয়াছেন বলিয়া জানাইয়াছেন৷ অনুষ্ঠিত কর্মী সভায় তিনি দুই হাজার আঠার সালে রাজ্য হইতে সিপিএম হঠানোর ডাক দিয়াছেন৷ প্রশ্ণ উঠিয়াছে, ত্রিপুরার আইন শৃঙ্খলার অবনতি কি অন্যান্য রাজ্যের রেকর্ড ভাঙ্গিয়াছে? ত্রিপুরার বুকে অতীতে যে রাজনৈতিক রক্তারক্তির ঘটনা ঘটিয়াছে তাহার সিকি ভাগও তো এখন হইয়াছে এমন মনে হইতেছে না৷ এই ত্রিপুরার কংগ্রেসের দুর্বৃত্তদের হাতে বহু সিপিএম কর্মীর প্রাণবলি হইয়াছে৷ তেমনি সিপিএম দুর্বৃত্তরাও বহু কংগ্রেস নেতা কর্মীর রক্ত পান করিয়াছে, প্রাণ ছিনাইয়াছে৷ এইসব রাজনৈতিক হত্যাকান্ডের ঘটনার ইতিহাস তো মুছিয়া যাইবার নহে৷ আজও সেই বীভৎস রাজনৈতিক হত্যালীলার ঘটনায় রাজনীতির উপর মানুষের অশ্রদ্ধার উদ্রেগ করিয়াছিল৷ সেই রাজনৈতিক পরিস্থিতির সামনে দাঁড়াইয়াও রাজনীতির কর্মকান্ড অব্যাহত ছিল৷ আজ কয়েকটি রাজনৈতিক আক্রমণের ঘটনাতেই কেন্দ্রের মন্ত্রী রীতিমতো অগ্ণিশর্মা হইতেছেন৷ স্থানীয় নেতারা দৌড়াইতেছেন রাজ্যপালের কাছে৷ প্রচারের নিমিত্ত ছবি তুলিতেছেন৷ এইভাবে দলের শক্তিবৃদ্ধি হইতে পারে না৷ গ্রামাস্তরে সংগঠন কোথায়? রবীন্দ্র ভবনে ভীড়ে ঠাসা কর্মী নেতা দেখিয়া আশ্বস্ত হইবার কোনো সুযোগ নাই৷ কারণ, রাজ্যের গ্রামীণ শক্তিই একটি দলের প্রাণ শক্তিকে উজ্জীবিত করিতে পারে৷ ২০১৮ সালে, দুইবছরের মধ্যেই বিজেপি সিপিএমকে রাজ্য হইতে উৎখাত করিবে? দলের কর্মী সমর্থকদের মনকে চাঙ্গা করিতে, মানসিক শক্তি বাড়াইতে নেতারা এমন জ্বালাময়ী বত্তৃণতা দিয়াই থাকেন৷ কিন্তু নেতারা বোধহয় ভুলিয়া গিয়াছেন যে, জনসাধারণ এখন অনেক বেশি সজাগ৷ চোখ কান খোলা রাখিয়া মনে মনে সব বিচার করিতে পারে৷ এরাজ্যের সিপিএম বিরোধী মানুষ অর্থাৎ সাধারণ কংগ্রেস কর্মীরা বুঝিতে পারিয়াছিলেন অনেকদিন পূর্ব হইতেই কংগ্রেস সিপিএম ভাই ভাই৷ এতকাল ত্রিপুরায় কংগ্রেসীদের সঙ্গে প্রতারণা করিয়া গিয়াছেন দলের হাইকমান্ড৷ শীর্ষস্তরে কংগ্রেস-সিপিএম একসূত্রে গাঁথা৷ কিন্তু দুই দলের কর্মীরাই রক্ত ঝরাইয়াছে, প্রাণ বলি দিয়াছে৷
সেই যুদ্ধং দেহী অবস্থা কি তৈরি করিতে পারিয়াছে বিজেপি? রাজ্যে দলের নেতা কর্মীরা কি ময়দানে সিপিএম দলের সঙ্গে লড়াই করিবার নূ্যনতম শক্তি সঞ্চয় করিবার সুযোগ আছে? এরাজ্যের বিরোধী শিবির এখন আর আগের মতো গলা বাড়াইয়া দিতে নারাজ৷ কথায় আছে, চাচা আপন প্রাণ বাঁচা৷ সাধারণ কর্মীরা এখন পড়িয়া পড়িয়া মার খাইবার পক্ষে নহেন৷ কেন্দ্রের বিজেপি নেতারা কি রাজ্যের গ্রাম পাহাড় চষিয়া বেড়াইয়াছেন? আর গ্রাম পাহাড়ে দলের শিকড় পরিব্যাপ্ত করিতে না পারিলে ২০১৮-র স্বপ্ণ দেখাই সার হইবে৷ ডোনার মন্ত্রী তথা বিজেপির বরিষ্ঠ নেতা সিং মহাশয় দলকে উজ্জীবিত করিতে সচেষ্ট হইয়াছেন৷ কিন্তু রাজ্যে দলের কান্ডারীরা কোন্ পথে? তাহারা কি তৃণমূল স্তরে অভিযানে সাহসী হইয়াছেন? সিংজী দলের নির্দেশে রাজ্যে দলকে উজ্জীবনের আওয়াজ দিয়া চলিয়াছেন৷ কিন্তু রাজ্য নেতৃত্বের শক্তিশালী অভিযান কোথায়? রাজ্যে আইনশৃঙ্খলার অবনতির অভিযোগে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সরব হইয়াছেন৷ কিন্তু রাজ্য নেতারা কি ভূমিকা নিতে পারিয়াছেন?
2016-03-28