News Flash

  • Home
  • Uncategorized
  • স্বচ্ছতার সঙ্গেই করোনা-যুদ্ধে জয়লাভ সম্ভব
Image

স্বচ্ছতার সঙ্গেই করোনা-যুদ্ধে জয়লাভ সম্ভব

দীনেশ সিং

বর্তমানে গোটা বিশ্ব করোনার মহামারী নিয়ে লড়াই করছে। করোনাকে রোধ করার জন্য ব্যাপক প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত কোন নির্ণায়ক সমাধানসূত্র বেরিয়ে আসেনি। ফলে এক আতঙ্কের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসার জন্য আমাদের অতীতের দিকে ফিরে তাকাতে হবে। সেই সময়কার মনীষীরা কিভাবে এমন ধরনের সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিলেন সেই কৌশল জানতে হবে। কার্যক্ষেত্রে সে কৌশলকে প্রয়োগ করতে হবে। ভয় এবং হতাশার এই পরিবেশে কীভাবে  মনোবল বজায় রাখতে হবে সেটা মনীষীদের কার্যপদ্ধতি থেকে শিখতে হবে।  এর জন্য মহাত্মা গান্ধী থেকে ভালো উদাহরণ আর কিছু হতে পারে না।  দৃঢ়চেতা সংকল্প সাহস এর মধ্যমে এই ধরনের সংকটের সঙ্গে লড়েছিলেন মহাত্মা গান্ধী।


১৯০৫ সাল গান্ধীজী কখন মাত্র ৩৫ বছর বয়সের এক যুবক।  দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গ শহর প্লেগ মহামারীর কবলে আচ্ছন্ন।  এই শহরের এক অংশে, ভারতীয়দের জনসংখ্যা বেশ বড় ছিল।  বহু ভারতীয় এই রোগে ভুগছিলেন। আক্রান্ত ভারতীয়দের সেবা করার জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ ছিলেন তিনি।  এই সংক্রমিত রোগটি তারও হতে পারে জেনেও তিনি আর্তের সেবায় পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।  তিনি পিছিয়ে যেতে চাননি।  অ্যান্টি-অ্যান্টিবায়োটিকগুলি তখনও আবিষ্কার হয়নি।  এই কারণে প্লেগের চিকিত্সা সম্ভব হয়নি।  সংক্রমণটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছিল। গান্ধী নির্ভয়ে সংক্রামিতদের যত্নে নিযুক্ত ছিলেন,  তিনি জানতেন যে এই রোগে আক্রান্ত হলে বেঁচে ফেরার সম্ভাবনা ক্ষীণ।  তবুও তারা অধ্যবসায় করেছিল। স্ত্রী এবং চার ছোট সন্তান থাকা সত্ত্বেও স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে তার কোন পরিবার নেই এবং তাকে আশ্রিত করে কেউ বেঁচে নেই । রোগটি এমন ছিল যে আক্রান্ত হলে বেঁচে ফেরার সম্ভাবনা কম ।  একজন ব্রিটিশ মহিলা সেই সময় গান্ধীজি সহযোগী হিসেবে কাজ করছিলেন ওই মহিলা প্লেগে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিলেন।  তা সত্ত্বেও, গান্ধী পিছু হটলেন না।  এটি তাঁর অদম্য সাহসের নমুনা। এই প্রসঙ্গে একটি চিঠির উল্লেখ করতে হয় যেটি গান্ধীজী কে উদ্দেশ্য করে লেখা হয়েছিল। সেই চিঠিতে দাবি করা হয়েছিল শহীদ ভগৎ সিংয়ের সাহসিকতার তুলনায় গান্ধীজীর অহিংসার পথ ভীরুতায় ভরা। ।  গান্ধী এর জবাব দিলেন।  তবে তার দক্ষিণ আফ্রিকার উদাহরণ উপস্থাপন করেনি। ওই চিঠিতে গান্ধীজী বালগঙ্গাধর তিলক, গোপালকৃষ্ণ গোখলে সাহস এবং বলিদান এর উদাহরণ পেশ করলেন। তিনি চিঠিতে লিখলেন ভগৎ সিং, বালগঙ্গাধর তিলক এবং গোপালকৃষ্ণ গোখলের একে-অন্যের সাহস নিয়ে তুলনা করাটা ঠিক নয়। তারা প্রত্যেকেই নিজের মতন করে দেশকে সেবা করে গিয়েছে।


জোহানেসবার্গে গান্ধীজি যা করেছিলেন, তা এই শ্রেণীতেই আসে। মানুষজনকে দেখভাল করার পাশাপাশি আরও একটি দিক তিনি খুলে রেখেছিলেন, তা হল স্বচ্ছতার। ভারতীয় সম্প্রদায় যাতে পরিচ্ছন্নতায় মনোনিবেশ করেন, এটাই ছিল তাঁর প্রচেষ্টা। গান্ধীজি পরিছন্নতার দিকে অধিক গুরুত্ব দিতেন। এ জন্যই জোহানেসবার্গ নগর নিগমের তীব্র নিন্দা করেছিলেন, এবং মহামারী ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁদের ভূমিকা রয়েছে বলেও জানান। এটা সহজেই অনুমান করা যেতে পারে যে, কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে যদি গান্ধীজি থাকতেন তাহলে তিনি কী করতেন? এটা উল্লেখ করা জরুরু যে,স্প্যানিশ ফ্লুর সময়ে মহাত্মা গান্ধী ছিলেন। মনে করা হয় তিনি ভাইরাসে সংক্রমিত ছিলেন না। অন্যতম কারণ হল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে ভারতীয়দের নিয়োগ। তাঁর দুই নাতি স্প্যানিশ ফ্লুতে আক্রান্ত ছিলেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে করোনা ভ্যাকসিনের জন্য সমগ্র বিশ্বে যে প্রচেষ্টা চলছে, গান্ধীজি কী তা সমর্থন করতেন? এই প্রশ্ন উত্থাপন হওয়ার মূলত দু’টি কারণ। প্রথমত-গান্ধীজী ছিলেন প্রাকৃতিক ওষুধের একজন প্রবক্তা এবং দ্বিতীয়ত, তিনি জলবসন্ত ভ্যাকসিনের বিরোধী ছিলেন। বিরোধিতার পক্ষে তাঁর যুক্তি যুক্তিযুক্ত ছিল। তিনি বলতেন, জলবসন্ত ভ্যাকসিন তৈরির জন্য যে ধরনের নিষ্ঠুরতা চালানো হয়, তা অমানবিক। তাঁর মতে, ভ্যাকসিন তৈরির পদ্ধতি হিংসাত্মক এবং গরুর মাংস খাওয়ার মতো।


তবে, এর অর্থ এটা নয় যে, তিনি ভ্যাকসিনের ঘোরবিরোধী ছিলেন। ওয়ার্ধায় সেবাগ্রামের বাসিন্দাদের কলেরা ভ্যাকসিন নিতে বলেছিলেন তিনি। এর কারণ হল, ওই ভ্যাকসিন জলবসন্ত টিকার মতো তৈরী করা হয় না। তৈরী করার পদ্ধতির জন্য গান্ধীজির অনুযায়ী মোরারজি দেশাই কখনও টিকা নেননি। তিনি যখন প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন, তখন ব্রিটেনের মতো দেশ তাঁর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করেছিল। ব্রিটেন সেই সমস্ত দেশের মধ্যে ছিল যেখানে ভিসা পাওয়ার জন্য জলবসন্ত টিকা নেওয়া অনিবার্য ছিল। তবে, এখন গান্ধীজি থাকলে তিনি জলবসন্ত টিকার বিরোধিতা করতেন না। কারণ বর্তমান পরিস্থিতিতে ওই টিকা তৈরী করার পদ্ধতি পরিবর্তিত হয়েছে। আমার মতে, করোনা-ভ্যাকসিন তৈরির জন্য যে প্রচেষ্টা চলছে, সেই প্রচেষ্টারও বিরোধিতা করতেন না। বর্তমান পরিস্থিতিতে আরও কিছু কথা গান্ধীজির থেকে শেখা উচিত। ১৯৩২ সালের কথা। প্লেগের কবলে ছিল গুজরাট। বোরসদ তালুক সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত ছিল। সর্দার প্যাটেল সমস্ত কিছু দেখভাল করছিলেন। পরে গান্ধীজিও আসেন। বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে মানুষজনের সঙ্গে কথা বলেন। স্বচ্ছতা সম্পর্কে তাঁদের বোঝান। এসব দেখে আমাদের এখন শিক্ষা নেওয়া উচিত।


এই বিপর্যয়ের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল অর্থনীতির বেহাল দশা। লক্ষ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিকদের বেদনা, যাঁদের একজন কাজ নেই। এখন গান্ধীজি থাকলে কী করতেন? এই পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য ব্যাবহারিক পদ্ধতি অবলম্বন করতেন তিনি। সর্বাগ্রে তিনি শহর থেকে চলে যাওয়া লক্ষ লক্ষ শ্রমিকদের সুরক্ষিত গ্রামে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতেন। এরপর তাঁদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতেন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস ইরউইন শুমাকর নিজের ‘স্মাইল ইজ বিউটিফুল’ বইয়ে যে অর্থব্যবস্থার ধর্ণা রেখেছেন, ভারত যদি সেই ধারণা অবলম্বন করত তাহলে পরিযায়ী সঙ্কটের মধ্যে পড়তে হত না। আমার মতে অর্থব্যবস্থা সম্পর্কে গান্ধীজি যে চিন্তাভাবনা রাখতেন, শুমাকর ভালোভাবেই তা উপস্থাপন করেছেন। গ্রাম বদলে গিয়েছে। যদি তাঁরা গ্রামেই কাজ পেতেন তাহলে কী এত দূরে যেতেন? এজন্য গান্ধীজি সর্বদা ভাবতেন গ্রাম যেন সাবলম্বী হয়। সেই প্রচেষ্টাও তিনি করতেন। চরকা সেই সাবলম্বীর প্রতীক ছিল। তাতেই জোর দিতেন তিনি। চরকার গুরুত্ব তিনিই বুঝিয়েছিলেন। নিঃসন্দেহে, ভারতের লক্ষ লক্ষ ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ছাড়াও আত্ম-সম্মানও জরুরি। এমনকি মোরারজি দেশাই প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন তিনি প্রতিদিন চরকা থেকে সুতা কাটাতেন।


তিনি হাসতেন এবং বলতেন, যতক্ষন না পর্যন্ত তুমি নিজে চরকা চালাবে ততক্ষন পর্যন্ত এর শক্তি অনুধাবন করতে পারবে না। কয়েক বছর পরে, আমি বুঝতে পারি মোরারজি ভাই কতটা সঠিক ছিলেন। আমি যখন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে চরকা নিয়ে এসেছিলেন, তখন এর শক্তি বুঝতে পেরেছিলাম। শীঘ্রই শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইতিবাচক প্রভাব দেখতে পারছিলাম, যা অবিশ্বাস্য ছিল। অনেকেই বলতে থাকেন, চরকা তাঁদের হতাশা কমিয়ে দিয়েছে এবং মাইগ্রেনের সমস্যা দূর করেছে। মহামারীর এই অন্ধকারে, যখন ভয় ও হতাশা মানুষকে পর্যবসিত করেছে এবং কর্মসংস্থান হারিয়েছে, তখন মহাত্মা গান্ধীর পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে তিনি ভ্যাকসিনের বিরোধী ছিল না, তিনি চেয়েছিলেন গ্রামের মানুষজন নিজেরাও কিছু চিন্তাভাবনা করুক এবং একটি স্বনির্ভর অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিকাশ করুক। যার মধ্যে চরকা এবং অন্যান্য জিনিস অনুঘটক হিসাবে কাজ করে। তিনি একটি গ্রামে চরকার মাধ্যমে সুতো কাটার সুবিধা সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছিলেন, আপনি যদি চরকায় সুতো কাটা শুরু করেন, তাহলে আমি আপনাকে আশ্বাস দিচ্ছি য্থায্থ সময়ে শিল্পায়ন হবে। করোনা-পরিস্থিতিতে গান্ধীজির চিন্তাভাবনা প্রত্যাশার প্রতীক।

(লেখক দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য)

Releated Posts

পাঁচ বছর ধরে বিধবা ভাতা অধরা, অসুস্থ বৃদ্ধা শাশুড়ির জন্য মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আবেদন পুত্রবধূর

জম্পুইজলা, ২৭ সেপ্টেম্বর:  স্বামীর মৃত্যুর পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও মেলেনি বিধবা ভাতা। বয়স ৭০ বছর, শারীরিক অসুস্থতায় জর্জরিত।…

ByByReshmi Debnath Sep 27, 2026

১৭ সেপ্টেম্বর থেকে ত্রিপুরায় মাসব্যাপী ‘সেবা সংকল্প অভিযান’: মুখ্যমন্ত্রী

আগরতলা, ১৪ সেপ্টেম্বর: প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্মদিন উপলক্ষে আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে ত্রিপুরায় শুরু হচ্ছে মাসব্যাপী ‘সেবা সংকল্প…

ByByTaniya Chakraborty Sep 14, 2026

সরকারি অফিস নির্মাণের জন্য চা গাছ কাটার অভিযোগ, চা বাগানে শ্রমিকদের বিক্ষোভ

আগরতলা, ৯ সেপ্টেম্বর: সরকারি অফিস নির্মাণের জন্য জমি পরিষ্কারের নামে বোল্ডোজার দিয়ে চা গাছ কেটে ফেলার অভিযোগকে কেন্দ্র…

ByByTaniya Chakraborty Sep 9, 2026

বিলোনিয়ায় ৬৫তম জাতীয় শিক্ষক দিবস উদযাপন, সম্মানিত ২৫ অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-শিক্ষিকা

নিজস্ব প্রতিনিধি, বিলোনিয়া, ৫ সেপ্টেম্বর: বিদ্যালয় শিক্ষা পরিদর্শক, বিলোনিয়া এবং শিক্ষক দিবস উদযাপন কমিটির উদ্যোগে শনিবার বিলোনিয়া কলেজ স্কয়ার সংলগ্ন…

ByByNews Desk Sep 5, 2026
Scroll to Top