করোনা মোকাবিলায় অগ্ণিপরীক্ষা আজ, জনতা কারফিউ পালনের আহ্বান মুখ্যমন্ত্রীর

নিজস্ব প্রতিনিধি, আগরতলা, ২১ মার্চ৷৷ করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় দেশ কতটা প্রস্তুত, অগ্ণিপরীক্ষা আগামীকাল৷ তাই, প্রধানমন্ত্রীর ডাকে রবিবার জনতা কারফিউ মেনে চলার জন্য ত্রিপুরাবাসীর প্রতি আবেদন জানান মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেব৷ তাঁর কথায়, ওই মারণব্যাধি মোকাবিলায় ত্রিপুরা সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত৷ বরং, বর্তমান পরিস্থিতিতে কোথাও ভ্রমণের বদলে বাড়িতে থাকাই নিরাপদ৷ তিনি অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে বলেন, ছেলেমেয়েদের বাইরে থেকে ত্রিপুরায় ফিরে আসতে বলবেন না৷ কর্মসূত্রে কিংবা উচ্চশিক্ষার জন্য ত্রিপুরায় বাইরে থাকলে তাদের সেখানেই থাকতে বলুন৷ কোনও অসুবিধায় ত্রিপুরা সরকার আপনাদের পাশে রয়েছে, অভয় দিয়ে বলেন মুখ্যমন্ত্রী৷


শনিবার সন্ধ্যায় সচিবালয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী করোনা ভাইরাস সংক্রমণ মোকাবিলায় ২২ মার্চ রবিবার দেশব্যাপী সকাল ৭টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত জনতা কারফিউ পালনের যে আহ্বান রেখেছেন তা রাজ্যেও যথাযথভাবে পালনের জন্য রাজ্যবাসীর প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি৷ তিনি বলেন, ওইদিন যাতে সবাই নিজ বাড়িতেই থাকেন৷ রাত ৯টার পরও যাতে কেউ বাড়ির বাইরে না বের হন সে ব্যাপারেও মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যবাসীর প্রতি আবেদন জানিয়েছেন৷


তিনি বলেন, করোনা ভাইরাস যেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আর না ছড়ায় সেই উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী জনতা কারফিউ-র ডাক দিয়েছেন৷ তাঁর দাবি, ইতিমধ্যেই করোনা ভাইরাস দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে৷ ত্রিপুরায় যাতে করোনা ভাইরাস না ছড়াতে পারে তার জন্য রাজ্য সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে৷ রাজ্যের বিভিন্ন রেলস্টেশন, বিমানবন্দরের যাত্রীদের স্ক্রিনিং-এর ব্যবস্থা করা হয়েছে৷ তাঁর আরও দাবি, রেশন দোকানগুলিতে যাতে চাল, ডাল সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য মজুত থাকে এবং বাজারে যাতে পর্যাপ্ত পরিমাণে শাকসবজির যোগান থাকে সে বিষয়ে নজর রাখার জন্য রাজ্যের প্রতিটি জেলার জেলাশাসকদের বলা হয়েছে৷ কোনও ব্যবসায়ী যদি কালোবাজারি করে থাকেন তা-হলে তাদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার জন্যও বলা হয়েছে৷ পাশাপাশি আগামীকাল প্রয়োজনীয় পরিষেবাগুলি ছাড়া সবকিছু বন্ধ রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে৷


মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রাজ্যের সার্বিক পরিস্থিতি কী অবস্থায় রয়েছে তা প্রতিদিন মনিটরিং করার জন্য রাজ্যস্তরীয় এবং জেলাস্তরীয় টাস্ক ফোর্স গঠন করা হয়েছে৷ ৯ সদস্য বিশিষ্ট রাজ্যস্তরীয় টাস্ক ফোর্সের চেয়ারম্যান করা হয়েছে মুখ্যসচিবকে এবং ৫ সদস্য বিশিষ্ট জেলাস্তরীয় টাস্ক ফোর্সের চেয়ারম্যান করা হয়েছে জেলাশাসককে৷ এই টাস্ক ফোর্স স্বাস্থ্য দফতরের সঙ্গে মিলে প্রতিদিন রাজ্যের পরিস্থিতির মনিটরিং করবে এবং রাজ্যবাসীকে অবগত করার উদ্দেশ্যে সাংবাদিক সম্মেলন করবে৷


তাঁর বক্তব্য, করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় রাজ্যবাসীকে সচেতন থাকতে হবে৷ আগামী ২২ মার্চ প্রয়োজন ছাড়া যাতে কেউ বাড়ির বাইরে না বের হন সে বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে৷ রাজ্যের যে সকল ছেলেমেয়ে পড়াশুনা সহ বিভিন্ন কারণে রাজ্যের বাইরে রয়েছেন তারা যাতে এখন ভ্রমণ না করেন সে বিষয়ে অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী৷ যাঁরা যেখানেই রয়েছেন সেখানেই যাতে সুরক্ষিত থাকেন সেই ব্যবস্থা করা৷ প্রয়োজনে রাজ্য সরকারের সহযোগিতা নেওয়ার জন্যও বলেন মুখ্যমন্ত্রী৷


তিনি বলেন, ২২ মার্চ জনতার কারফিউ-র দিন সন্ধ্যা ৫টায় রাজ্যের প্রতিটি বাড়িতে উলুধনি, শঙ্খ বাজানো, হাততালি, ঘণ্টা বাজিয়ে নিজ পরিবার সহ আশেপাশে মানুষকে করোনা মোকাবিলায় জাগ্রত করতে হবে৷ পাশাপাশি এর মাধ্যমে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ মোকাবিলায় যারা নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছেন চিকিৎসা সহ বিভিন্ন পরিষেবা দিয়ে যাচ্ছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হবে৷
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ২২ মার্চ জনতা কারফিউ যথাযথভাবে পালনের মাধ্যমে প্রমাণিত হবে যে দেশবাসী করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় কতখানি প্রস্তুত৷ করোনা ভাইরাস যাতে রাজ্যে ছড়িয়ে পড়তে না পারে তার জন্য রাজ্যের জনপ্রতিনিধি, স্বাস্থ্যকর্মী সহ সকলকেই দায়িত্ব নিতে আহ্বান জানান তিনি৷
এদিন স্বাস্থ্য দফতরের সচিব ডা. দেবাশিস বসু জানান, রাজ্যে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ মোকাবিলায় রাজ্যের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে আজ রাজ্যের প্রতিটি জেলার জেলাশাসকদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে৷ আলোচনাক্রমে বেশ কিছু পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে৷ তিনি জানান, রাজ্যে এখন পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত কোনও রোগীর সন্ধান পাওয়া যায়নি৷ তবে সন্দেহভাজন ১৮১ জনকে কোয়ারেন্টাইন সেন্টারে বিশেষ নজরদারিতে রাখা হয়েছিলো৷ পরে ২৮ জনকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে৷ বর্তমানে ১৪৩ জন কোয়ারেন্টাইন সেন্টারে বিশেষ নজরদারিতে রয়েছে৷ এখন পর্যন্ত ৬৮ হাজার ৩০৪ জনকে স্ক্রিনিং করা হয়েছে৷ এছাড়া ছয়জনের রক্তের নমুনা পরীক্ষা করার জন্য পাঠানো হয়েছে৷ এছাড়া স্বাস্থ্য দফতরের উদ্যোগে কো-অপারেটিভ ট্রেনিং ইনস্টিটিউট এবং সিপার্ডের হস্টেলে নতুন দুটি কোয়ারেন্টাইন সেন্টার খোলা হয়েছে৷ সেখানে একত্রিত টয়লেটের সুযোগ-সুবিধাও রয়েছে৷


স্বাস্থ্যসচিব আরও জানান, দেশের সমস্ত আন্তর্জাতিক বিমান পরিষেবাগুলি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে৷ কিন্তু বাংলাদেশে এখনও আন্তর্জাতিক বিমান পরিষেবাগুলি বন্ধ না হওয়ার কারণে আখাউড়া চেকপোস্টের মাধ্যমে যাত্রীরা রাজ্যে প্রবেশ করার সম্ভাবনা রয়েছে৷ এই বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলা হবে৷ এছাড়াও বহির্রাজ্য থেকে যে সমস্ত ট্রাক রাজ্যে প্রবেশ করছে সেই ট্রাকচালকদেরও যথাযথ স্ক্রিনিং করা হচ্ছে৷ রাজ্যে সন্দেহভাজনদের বিশেষ নজরদারিতে রাখার জন্য প্রতিটি জেলায় কোয়ারেন্টাইন সেন্টার খোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে৷ তিনি আরও জানান, রাজ্যে এই পরিস্থিতিতে যাতে বাজারে বা ওষুধের দোকানে কোনও ধরনের কালোবাজারি না হয় সে বিষয়ে খাদ্য দফতর ও ড্রাগ কন্েন্টালার অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে৷ কালোবাজারি রুখতে আজ সন্ধ্যা থেকেই বাজারগুলিতে খাদ্য দফতরের টাস্ক ফোর্সের অভিযানও চালানো হবে বলে স্বাস্থ্যসচিব জানিয়েছেন৷