আগরতলা, ১৯ ফেব্রুয়ারি: রাজ্যের সাম্প্রতিক একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে আজ এক সাংবাদিক সম্মেলনে বিস্তৃত বক্তব্য রাখেন প্রদেশ কংগ্রেসের মুখপাত্র প্রবীর চক্রবর্তী। বিশ্রামগঞ্জে প্রস্তাবিত নগর পঞ্চায়েত গঠন, ককবরক ভাষার লিপি বিতর্ক, এডিসি-সংক্রান্ত অভিযোগ, শিক্ষা ও বনাধিকার ইস্যু থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি—সবকিছু নিয়েই রাজ্য সরকার ও শাসক জোটকে তীব্র আক্রমণ করেন তিনি।
প্রবীর চক্রবর্তী বলেন, বিশ্রামগঞ্জে নগর পঞ্চায়েত গঠনের বিষয়ে কংগ্রেস নীতিগতভাবে বিরোধী নয়। তবে এলাকা মিশ্র জনবসতিপূর্ণ এবং লাগোয়া এডিসি অঞ্চলের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বিশেষ কমিশন গঠন করে সব অংশের মানুষের মতামত নিয়ে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত কার্যকর করা উচিত ছিল।
তিনি অভিযোগ করেন, ওয়ার্ড বিন্যাসের সিদ্ধান্তের পর তিপ্রা মথার শীর্ষ নেতৃত্ব জেলাশাসকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নগর পঞ্চায়েত গঠনের বিরোধিতা করে এডিসি এলাকার ৩০ শতাংশ অন্তর্ভুক্তির দাবি তোলে। যদিও জেলা প্রশাসন জানায়, প্রস্তাবিত নগর পঞ্চায়েতে এডিসির কোনও এলাকা নেই এবং সংশ্লিষ্ট বিধায়ক ও এমডিসি বৈঠকে উপস্থিত থেকে সহমত পোষণ করেছিলেন। এই অবস্থানকে “দ্বিচারিতা” বলে কটাক্ষ করেন কংগ্রেস মুখপাত্র।
এছাড়াও এদিন এডিসি এলাকায় জমি হস্তান্তর, বনাধিকার আইন সংশোধন এবং গ্রাম কমিটির ক্ষমতা হ্রাস প্রসঙ্গে তিনি কেন্দ্রের সরকারকে দায়ী করেন। তাঁর অভিযোগ, এডিসিতে ক্ষমতাসীন তিপ্রা মথাও সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলি বাতিল করে দেওয়ায় যথেচ্ছভাবে জমি হস্তান্তরের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তিনি আরও দাবি করেন, বহু মূল্যবান জমি শিল্পপতিদের হাতে তুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে আইন মানা হয়নি। যদিও এসব অভিযোগের স্বপক্ষে তিনি নির্দিষ্ট সরকারি নথি পেশ করেননি।
ককবরক লিপি বিতর্ক ও শিক্ষানীতি
ককবরক ভাষায় রোমান লিপি চালুর দাবিতে আন্দোলন প্রসঙ্গে প্রবীর চক্রবর্তী বলেন, পরীক্ষা মরসুমে এই ইস্যু তুলে ধরা ছাত্রছাত্রীদের বিভ্রান্ত করছে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ১৮৯৭ সালে দৌলত আহমেদ এবং ১৮৯৯ সালে রাধামোহন ঠাকুর (দেববর্মণ) ককবরক ব্যাকরণ রচনা করেন এবং দীর্ঘদিন বাংলা লিপিতেই তা চর্চিত হয়েছে।
লিপি বিতর্ক নিরসনে ভাষাবিদ পবিত্র সরকার-এর নেতৃত্বে গঠিত কমিশনের মতামত ছিল—বাংলা বা রোমান, কোনও লিপিই চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়; সিদ্ধান্ত আদিবাসী সমাজের ওপরই ছেড়ে দেওয়া উচিত।
তিনি অভিযোগ করেন, এডিসিতে ক্ষমতাসীন থাকার পরও সংশ্লিষ্ট দল ককবরক লিপি বিষয়ে বাস্তব পদক্ষেপ নেয়নি। পাশাপাশি ২০২০ সালের নতুন শিক্ষানীতি ও স্কুল একত্রীকরণের ফলে পাহাড়ি এলাকায় স্কুল দূরে সরে যাওয়ায় ড্রপ-আউট বাড়ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
সাম্প্রতিক সময়ে শাসক জোটের শরিকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব, দুর্নীতির অভিযোগ এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতির বিষয়েও সরব হন কংগ্রেস মুখপাত্র। তিনি দাবি করেন, মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং শরিক দলের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুললেও তার কোনও কার্যকরী ফল দেখা যাচ্ছে না।
বিশেষ করে সাংবাদিকদের উপর হামলা, আদালত প্রাঙ্গণে হুমকি, সংবাদপত্র সম্পাদকদের বাড়ির সামনে বিক্ষোভ ও জাতীয় সড়ক অবরোধের ঘটনায় পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ তোলেন তিনি। গণতন্ত্রের “চতুর্থ স্তম্ভ”-এর স্বাধীনতা রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান প্রবীর চক্রবর্তী।
সমগ্র পরিস্থিতিতে আদিবাসী সমাজের তরুণ প্রজন্ম ও শান্তিকামী রাজ্যবাসীর কাছে বিষয়গুলি বিবেচনা করে ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আবেদন জানান তিনি। পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ অবস্থানের ওপর জোর দেন। উল্লেখ্য, উত্থাপিত অভিযোগগুলির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দল বা সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

