বহুদলীয় রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত, তবে শাসনের কঠিন পরীক্ষায় বিএনপি: রিপোর্ট

ঢাকা/নয়াদিল্লি, ১৫ ফেব্রুয়ারি: বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বহু বছর পর “প্রকৃত বহুদলীয় রাজনীতিতে” প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। তবে বিপুল জয় পাওয়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র সামনে এখন শাসনের কঠিন পরীক্ষা— এমনটাই জানানো হয়েছে একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে।

‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক পুনর্গঠন এবং আগামীর পথ’ শীর্ষক এই রিপোর্ট প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক শান্তি অধ্যয়ন কেন্দ্র। এতে বলা হয়েছে, দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয় পেয়ে বিএনপি এখন দুর্নীতির অভিযোগ, সংখ্যালঘুদের আস্থা পুনর্গঠন, আওয়ামী লীগ সমর্থকদের উদ্বেগ এবং বাড়তে থাকা যুব বেকারত্বের মতো জটিল বিষয়গুলির মোকাবিলায় বাধ্য হবে।

রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফেরানো, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং বিতর্কিত বাণিজ্য চুক্তিগুলির ব্যবস্থাপনা অবিলম্বে অগ্রাধিকার পাবে। মনোহর পর্রিকর ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালিসিসের গবেষক স্মৃতি এস. পট্টনায়ক লিখেছেন, “বিএনপির ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতি ভারতের সঙ্গে টানাপোড়েন, স্থগিত উন্নয়ন প্রকল্প এবং আসন্ন জলবণ্টন আলোচনা— এই প্রেক্ষাপটে পরীক্ষার মুখে পড়বে।”

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে ১৯৯৬, ২০১৪ ও ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর গণতান্ত্রিক আস্থার পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদিও ২০১৮ সালের নির্বাচন আনুষ্ঠানিকভাবে বহুদলীয় ছিল, তা নিয়ে কারচুপির অভিযোগ ওঠে।

এই রাজনৈতিক রূপান্তরের সঙ্গে যুক্ত ছিল সাংবিধানিক সংস্কার নিয়ে গণভোট, যা ‘জুলাই চার্টার’ নামে পরিচিত। মোট ৭ কোটি ৬ লাখ ৪০ হাজার ৫৬টি ভোটের মধ্যে ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯টি (৬৮.১ শতাংশ) প্রস্তাবের পক্ষে পড়ে, বিপক্ষে পড়ে ৩১.৯ শতাংশ ভোট।

ঘোষিত ফল অনুযায়ী, বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ২৯৭টি আসনের মধ্যে ২১২টিতে জয় পেয়েছে। জামায়াত ৭৭টি আসন নিয়ে প্রধান বিরোধী জোটের নেতৃত্ব দিতে চলেছে। কিছু নীতিগত প্রশ্নে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে মতভেদ থাকায় ভবিষ্যতে সেই বিষয়গুলি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

রিপোর্টে বলা হয়েছে, বিএনপিকে ঘিরে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও ছোট ব্যবসা দখলের অভিযোগের ধারণা ভাঙতে হবে। যদিও দলটি প্রায় ৭,০০০ সদস্যকে দুর্নীতির অভিযোগে বহিষ্কার করেছে, তবুও বিদায়ী আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা স্বৈরাচারী আচরণ ও সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের অভিযোগের পুনরাবৃত্তি এড়াতে হবে।

সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও আওয়ামী লীগ সমর্থকদের স্বার্থ রক্ষা, রাজনৈতিকভাবে সচেতন তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা পূরণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি— এই সবই নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। অর্থনীতির মেরুদণ্ড রপ্তানি খাতে সাম্প্রতিক মন্দা পরিস্থিতি আরও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাম্প্রতিক বাণিজ্য চুক্তি নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানিযোগ্য পোশাক তৈরির জন্য মার্কিন তুলোর সুতো আমদানি করতে হবে— যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরের নিউ মুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল পরিচালনা নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তিও আপাতত স্থগিত রয়েছে।

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়েও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে রিপোর্টে। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গা জলবণ্টন চুক্তির মেয়াদ এ বছর শেষ হচ্ছে। পাশাপাশি তিস্তা জলবণ্টন ইস্যুতেও চাপ বাড়তে পারে। সীমান্ত হত্যা ও অবৈধ অনুপ্রবেশের মতো বিষয়েও বিএনপি অবস্থান স্পষ্ট করেছে।

ভারত ইতিমধ্যেই বাংলাদেশকে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলারের ঋণ সহায়তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় অতিরিক্ত ৫০০ মিলিয়ন ডলারের ঋণ দিয়েছে। তবে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর নিরাপত্তা উদ্বেগে একাধিক ভারতীয় প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদ বাংলাদেশ ছেড়ে যান। রামপাল যৌথ বিদ্যুৎ প্রকল্প থেকেও কয়েকজন ভারতীয় আধিকারিক ফিরে গিয়েছিলেন। মিরসরাই ও মংলায় প্রস্তাবিত ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রকল্পও বাতিল হয়েছে।

সব মিলিয়ে, বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের পুনর্গঠন এখন অত্যন্ত সংবেদনশীল পর্যায়ে। উভয় পক্ষই সম্পর্কের গুরুত্ব স্বীকার করলেও পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠনই ভবিষ্যতের স্থায়ী অংশীদারিত্বের চাবিকাঠি হবে।

Leave a Reply