আত্মসমর্পণের ঢেউয়ে ফিকে হচ্ছে ‘রেড ড্রিম’, মাওবাদী আন্দোলন কি শেষ অধ্যায়ে?

নয়াদিল্লি, ১৫ ফেব্রুয়ারি: কয়েক দশক ধরে ভারতের ঘন জঙ্গল, আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকা এবং মতাদর্শিক প্রচারের ওপর ভর করে টিকে ছিল বামপন্থী উগ্রবাদ বা মাওবাদী আন্দোলন। মধ্য ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে থাকা তথাকথিত ‘রেড করিডর’ এক সময় নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছিল। প্রান্তিক মানুষের অধিকারের দাবিতে নিজেদের ‘বিপ্লবী’ আন্দোলন হিসেবে তুলে ধরলেও ২০২৫ সালে এসে সেই বর্ণনায় বড় ধাক্কা লেগেছে।

নিরাপত্তা বাহিনীর একাধিক সফল অভিযানের পাশাপাশি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে মাওবাদীদের ক্রমবর্ধমান আত্মসমর্পণের ঘটনা। ছত্তীসগঢ়, মহারাষ্ট্র, ওডিশা ও ঝাড়খণ্ডে একের পর এক ক্যাডার— এমনকি শীর্ষ কমান্ডাররাও— জঙ্গল ছেড়ে বেরিয়ে এসে অস্ত্র সমর্পণ করছেন। তাঁরা অস্ত্র জমা দিয়ে পুনর্বাসন কর্মসূচি গ্রহণ করছেন এবং সংগঠনের ভেতরের তথ্যও প্রকাশ করছেন। পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি সংঘাতের চরিত্রে মৌলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল বন্দুকযুদ্ধের মাধ্যমে বিদ্রোহের অবসান হয় না; মতাদর্শ দুর্বল হলে তবেই সংগঠন ভেঙে পড়ে। দীর্ঘদিন ধরে প্রান্তিক মানুষের ন্যায়বিচারের দাবিতে আন্দোলনের দাবি করা হলেও বাস্তবে সংগঠনের ভিতরে নেতৃত্ব ও সাধারণ সদস্যদের মধ্যে বৈষম্য ছিল স্পষ্ট। শীর্ষ নেতারা তুলনামূলক নিরাপদে থাকলেও তরুণ আদিবাসী সদস্যদের সামনের সারিতে ঠেলে দেওয়া হত। সহিংসতা বাড়লেও উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক সাফল্য বা ভূখণ্ডগত দখল আসেনি।

২০২৫ সালের ২৯ জানুয়ারি ছত্তীসগঢ়ের সুকমায় পিপলস লিবারেশন গেরিলা আর্মি-র সেকশন ১ কোম্পানির ডেপুটি কমান্ডার কালমু মাংডু, টিম কমান্ডার সমীর ওরফে সুক্কা এবং ক্যাডার মাদাভি বুধরির আত্মসমর্পণ এই পরিবর্তনের প্রথম বড় ইঙ্গিত দেয়। মার্চ মাসে বিজাপুরে ডিভিশনাল কমিটি সদস্য দিনেশ মোডিয়ামের আত্মসমর্পণ সংগঠনের ভিতরের ফাটল আরও স্পষ্ট করে।

সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে ১৪ অক্টোবর, ২০২৫-এ, যখন সিপিআই (মাওবাদী)-র পলিটব্যুরো সদস্য ও মুখপাত্র মল্লোজুলা ভেনুগোপাল রাও ওরফে ভূপতি/সোনু/অভয় মহারাষ্ট্রের গড়চিরোলিতে প্রায় ৬০ জন ক্যাডারসহ আত্মসমর্পণ করেন। তাঁর স্ত্রী তারাক্কাও এর আগে আত্মসমর্পণ করেছিলেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা সংগঠনের মনোবলে বড় আঘাত হানে।

ডিসেম্বর মাসেও আত্মসমর্পণের ধারা অব্যাহত থাকে। ১০ ডিসেম্বর গড়চিরোলিতে কিরণ হিডমা কোয়াসি ওরফে ভীমা, যিনি নব্বইয়ের দশক থেকে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, আত্মসমর্পণ করেন। ১২ ডিসেম্বর সুকমায় আর এক সশস্ত্র ক্যাডার মিডিয়াম ভীমা অস্ত্র জমা দেন। ১৩ ডিসেম্বর মহারাষ্ট্রের গন্ডিয়ায় এরিয়া কমিটি সদস্য রোশন ওরফে মারা ভেদজা এবং সুভাষ ওরফে পোজ্জা রাভার আত্মসমর্পণ মহারাষ্ট্র-ছত্তীসগঢ় করিডর কার্যত স্তব্ধ করে দেয়।

বস্তার, সুকমা, গড়চিরোলি ও ঝাড়খণ্ডের বিভিন্ন অংশে আত্মসমর্পণের এই ধারাবাহিকতা কাকতালীয় নয় বলে মত পর্যবেক্ষকদের। তাঁদের মতে, সিপিআই (মাওবাদী) সংগঠনটি এখন শুধু সামরিক শক্তি হিসেবে নয়, একটি মতাদর্শ হিসেবেও দুর্বল হয়ে পড়েছে। একসময়ের ভয়ের ‘রেড করিডর’ এখন বিচ্ছিন্ন পকেটে সীমাবদ্ধ।

বিশ্লেষকদের মতে, যখন সশস্ত্র সংগঠনের সদস্যদের কাছে টিকে থাকার চেয়ে আত্মসমর্পণ নিরাপদ মনে হয়, তখন পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে। ২০২৫ সালের ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত দিচ্ছে, ভারতের দীর্ঘদিনের মাওবাদী সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই হয়তো শেষ অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে— শুধু বন্দুকের নল দিয়ে নয়, বরং একসময়ের শক্তিশালী বিপ্লবী মিথের নীরব অবক্ষয়ের মধ্য দিয়ে।

তবে বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, শূন্যস্থান যেন আবার কোনও সহিংস মতাদর্শে পূরণ না হয়। তার বদলে সুশাসন, উন্নয়ন এবং স্থানীয় মানুষের সঙ্গে স্থায়ী আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

Leave a Reply