কাবুল, ১১ ফেব্রুয়ারি (আইএএনএস) : বালুচিস্তানে সাম্প্রতিক হামলাগুলি কেবল নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জই নয়, বরং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ব্যর্থতার প্রতিফলন এমনই মন্তব্য উঠে এসেছে আফগানিস্তানের প্রধান সংবাদমাধ্যম খামা প্রেসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, প্রদেশে ক্রমবর্ধমান সহিংসতার শিকড় পাকিস্তানের স্বাধীনতার সময়কাল পর্যন্ত বিস্তৃত।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বালুচিস্তানের ক্ষোভ ও বঞ্চনার প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরেই উপেক্ষিত। জোরপূর্বক গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। অধিকারকর্মীদের মতে, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করার ফলে অনেকের কাছে সশস্ত্র প্রতিরোধই একমাত্র বিকল্প হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
গত ৩১ জানুয়ারি বালুচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) ‘অপারেশন হেরফ ২.০’ নামে ১২টি জেলায় সমন্বিত হামলা চালায়, যার মধ্যে কোয়েটা, গওয়াদর ও মাসতুং উল্লেখযোগ্য। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই অভিযানে ১৭ জন পুলিশকর্মী ও ৩১ জন সাধারণ নাগরিক নিহত হন। পাল্টা অভিযানে ১৪৫ জন জঙ্গি নিহত হয়েছে বলে পাকিস্তানি বাহিনীর দাবি, যদিও বিএলএ এই সংখ্যাকে বিতর্কিত বলেছে। হামলায় গুলিবর্ষণ, আত্মঘাতী বিস্ফোরণ এবং অস্থায়ীভাবে থানা ও সরকারি দফতর দখলের ঘটনা ঘটে। এরপর বালুচিস্তানে নিরাপত্তা অভিযান জোরদার হয়েছে বলে খবর। মানবাধিকার কর্মীদের একাংশ স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতি আচরণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
এক মতামত নিবন্ধে বলা হয়েছে, বালুচিস্তানের সাম্প্রতিক সহিংসতা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং পাকিস্তানের স্বাধীনতার সময় থেকে চলা সংঘাতের নাটকীয় বৃদ্ধি। এই সংকট বোঝার জন্য ঐতিহাসিক বঞ্চনা, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং রাজনৈতিক ব্যর্থতার দিকে নজর দিতে হবে।
পাকিস্তানের মোট ভৌগোলিক এলাকার ৪৪ শতাংশ জুড়ে বিস্তৃত বালুচিস্তানে দেশের মাত্র ৬ শতাংশ মানুষ বাস করেন। প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও এটি পাকিস্তানের দরিদ্রতম প্রদেশ। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ বহুমাত্রিক দারিদ্র্যে বাস করেন এবং বেকারত্বের হার ৩৩ শতাংশ। সুই গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাকিস্তানের প্রায় ৩৫-৪০ শতাংশ প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ হয়। এছাড়া তামা, সোনা ও কয়লার উল্লেখযোগ্য ভাণ্ডার রয়েছে।
চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (সিপিইসি), বিশেষ করে গওয়াদর বন্দর উন্নয়ন প্রকল্প নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। অভিযোগ, ভূমি অধিগ্রহণ, কর্মসংস্থানে বঞ্চনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে বাদ পড়ার ফলে অর্থনৈতিক প্রান্তিকীকরণ বাড়ছে।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ জোরপূর্বক গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকে কেন্দ্র করে। বালুচ ইয়াকজেহতি কমিটি (বিওয়াইসি) ২০২৫ সালে ১,২২৩টি গুমের ঘটনার কথা জানিয়েছে। বালুচিস্তান হিউম্যান রাইটস কাউন্সিল ২০২৫ সালে ১,৪৫৫টি ঘটনার নথিভুক্তির দাবি করেছে, যার মধ্যে ১,৪৪৩ জন পুরুষ ও ১২ জন মহিলা। তাদের তথ্যানুসারে, বছরের শেষে ১,০৫২ জন নিখোঁজ ছিলেন, ৩১৭ জনকে মুক্তি দেওয়া হয়, ৮৩ জন হেফাজতে নিহত হন এবং তিনজনকে জেলে পাঠানো হয়।
বিওয়াইসি-র বার্ষিক প্রতিবেদনে ২০২৫ সালে ১৮৮টি কথিত বিচারবহির্ভূত হত্যার উল্লেখ রয়েছে, যার মধ্যে ৭৫টি ‘কিল অ্যান্ড ডাম্প’ নীতির সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ। মাকরান বিভাগ ও আওয়ারান জেলা সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বালুচিস্তানে পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর প্রায় ৭৩৬টি স্থায়ী ও ৩০০টি অস্থায়ী চেকপোস্ট রয়েছে, যা সমালোচকদের মতে এক ধরনের সামরিকীকরণের চিত্র তুলে ধরে। বালুচ বিদ্রোহে নারী আত্মঘাতী হামলাকারীদের অংশগ্রহণও লক্ষ্য করা গেছে। পিতৃতান্ত্রিক সমাজে এই অংশগ্রহণ প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের উপসংহারে বলা হয়েছে, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন ও ন্যায্য সম্পদ বণ্টনের দাবিকে প্রায়শই বিচ্ছিন্নতাবাদ হিসেবে দেখা হয়েছে এবং ভিন্নমতকে ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে। সমালোচকদের মতে, সংলাপের পরিবর্তে নিরাপত্তা-কেন্দ্রিক কৌশল পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে এবং শিক্ষিত শহুরে যুবকদের একাংশকে বিদ্রোহের দিকে ঠেলে দিয়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রান্তিকীকরণ, অর্থনৈতিক শোষণ ও অধিকার সংক্রান্ত সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান ছাড়া সামরিক পদক্ষেপে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

