গুয়াহাটি, ৮ ফেব্রুয়ারি : কংগ্রেস সাংসদ গৌরব গগৈ, তাঁর ব্রিটিশ স্ত্রী এলিজাবেথ কোলবার্ন এবং পাকিস্তানি নাগরিক আলি তৌকির শেখের মধ্যে “গভীর যোগসূত্র” রয়েছে বলে রবিবার অভিযোগ করেন অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। তিনি দাবি করেন, এই যোগসূত্রের মাধ্যমে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা আইবি-র তথ্য গোপনে প্রতিবেশী দেশে পৌঁছানো হয়েছে। আজ গুয়াহাটিতে এক সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী আরও অভিযোগ করেন, ভারতে কাজ করার সময় এলিজাবেথ কোলবার্নের বেতন প্রদানে ফরেন কনট্রিবিউশন রেগুলেশন অ্যাক্ট (এফসিআরএ) লঙ্ঘন করা হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী শর্মার দাবি, ২০১৩ সালে গৌরব গগৈ একটি “অত্যন্ত গোপন” সফরে পাকিস্তান যান এবং সেখানে তিনি “কোনও ধরনের প্রশিক্ষণ” নিয়েছিলেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। সে সময় গগৈয়ের পিতা তরুণ গগৈ অসমের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, আমাদের বিশ্বাস, গৌরব গগৈ, এলিজাবেথ কোলবার্ন ও আলি তৌকির শেখের মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আমরা মনে করি, এলিজাবেথ এবং আলি তৌকির শেখ একটি আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ ছিলেন।
তিনি দাবি করেন, ভারত সরকারের অনুমতি ছাড়াই তাঁরা স্থানীয় পৌর সংস্থাগুলির সঙ্গে কাজ করতেন, যা অসম পুলিশের এখতিয়ারের বাইরে। সেই কারণে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের মাধ্যমে জাতীয় স্তরের তদন্তের সুপারিশ করা হয়েছে। হিমন্ত বিশ্ব শর্মার বক্তব্য অনুযায়ী, এলিজাবেথ প্রথমে পাকিস্তানে শেখের সংস্থা ‘লিড পাকিস্তান’-এ কাজ করতেন। পরে তাঁকে ভারতে স্থানান্তর করা হলেও তাঁর বেতন পাকিস্তানি নাগরিক আলি তৌকির শেখই দিতেন। অভিযোগ করা হয়, ‘লিড পাকিস্তান’ থেকে অর্থ ‘লিড ইন্ডিয়া’-তে পাঠানো হয় এবং সেখান থেকে এফসিআরএ নিয়ম এড়িয়ে এলিজাবেথকে বেতন দেওয়া হতো।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, শত্রু রাষ্ট্রের কোনও সংস্থা ভারতীয় প্রতিষ্ঠানে অনুদান দিতে পারে না। সম্ভবত ইউপিএ সরকারের আমলে বিশেষ অনুমতি নেওয়া হয়েছিল। আরও অভিযোগ করা হয়, ভারতে কাজ করার সময় এলিজাবেথ বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করে পাকিস্তানে শেখের কাছে পাঠাতেন। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, নরেন্দ্র মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার পর জলবায়ু সংক্রান্ত বিষয়ে তিনি আইবি সূত্র থেকে তথ্য পেয়ে শেখের কাছে ৪৫ পাতার একটি রিপোর্ট পাঠিয়েছিলেন।
শর্মা জানান, ‘লিড ইন্ডিয়া’-তে কাজ করার সময় এলিজাবেথ ছয়বার ইসলামাবাদ সফর করেন এবং পরে অন্য একটি এনজিওতে যুক্ত হওয়ার পর আরও তিনবার পাকিস্তান যান। তাঁর দাবি, বিষয়টি গোপন রাখতে এলিজাবেথ সবসময় আত্তারি সীমান্ত দিয়েই যাতায়াত করতেন, বিমানে নয়।
মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, সরাসরি পাকিস্তান থেকে অর্থ পাওয়া সহজ নয় এবং এর পেছনে ইউপিএ সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ “আরও এক হ্যান্ডলার” থাকতে পারে। তাঁর অভিযোগ, এলিজাবেথের একটি পাকিস্তানি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ছিল, তবে জিজ্ঞাসাবাদের সময় সেটি বন্ধ হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট উত্তর দেননি।
শর্মা দাবি করেন, গৌরব গগৈ তাঁর নির্বাচনী হলফনামায় এই পাকিস্তানি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের উল্লেখ করেননি। তাঁর মতে, গগৈয়ের নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বীর উচিত নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ দায়ের করা। মুখ্যমন্ত্রী জানান, এলিজাবেথ কোলবার্নের উপস্থিতি ভারতের পক্ষে ক্ষতিকর বলে তাঁর ভিসা বাতিলের আবেদন করা হবে।
গৌরব গগৈর পাকিস্তান সফর প্রসঙ্গে শর্মা বলেন, ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে গগৈ ১০ দিনের জন্য পাকিস্তানে ছিলেন। ভিসা ছিল শুধু লাহোরের জন্য, কিন্তু তিনি ইসলামাবাদ ও করাচিতেও যান। সেই সময় তিনি সামাজিক মাধ্যমে সম্পূর্ণ নীরব ছিলেন, যা সন্দেহজনক বলে দাবি করেন মুখ্যমন্ত্রী। শর্মার অভিযোগ, পাকিস্তান থেকে ফেরার পর সাংসদ হওয়ার পরে গগৈ লোকসভায় প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, পারমাণবিক কেন্দ্র ও সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন।
মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, ২০২২ সালে গগৈ তাঁর ছেলের ভারতীয় পাসপোর্ট জমা দেন, কারণ সেই সময় নাবালক সন্তান ব্রিটিশ নাগরিকত্ব পায়। তিনি ধর্ম সংক্রান্ত বিষয় নিয়েও মন্তব্য করেন, যা ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এক প্রশ্নের উত্তরে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, অসম পুলিশের এসআইটি গৌরব গগৈকে জিজ্ঞাসাবাদ করেনি, কারণ তিনি একজন বর্তমান সাংসদ। আমরা তাঁর পদমর্যাদাকে সম্মান দেখিয়ে বিষয়টি কেন্দ্রের ওপর ছেড়ে দিয়েছি, বলেন তিনি।
গ্রেপ্তার প্রসঙ্গে শর্মা বলেন, এখন তাঁকে গ্রেপ্তার করলে নির্বাচনের আগে রাজনীতি করার অভিযোগ উঠবে। তিনি দাবি করেন, পাকিস্তানে থাকা ১০ দিনের প্রতিটি মুহূর্তের ছবি ও নথি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে এবং সেই কারণে গগৈ বর্তমানে ভারতের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ রাজনীতিক।
মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, ইউপিএ সরকারের আমলে ২০১০ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে আলি তৌকির শেখ ১৩ বার ভারতে এসেছিলেন এবং আন্তর্জাতিক স্তরে “ভারত-বিরোধী বয়ান” ছড়ানোর কাজ করতেন। তাঁর দাবি, তদন্ত শুরু হওয়ার পর শেখ সমস্ত টুইট মুছে ফেলেছেন।

