কাঠমান্ডু, ২০ জানুয়ারি (আইএএনএস): নেপালের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ও নেপালি কংগ্রেসের সভাপতি শের বাহাদুর দেউবা আর সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন না। আগামী ৫ মার্চ অনুষ্ঠিত হতে চলা হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস নির্বাচনে তিনি প্রার্থী হচ্ছেন না বলে মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে।
দেউবার মুখ্য ব্যক্তিগত সচিব ভানু দেউবা সামাজিক মাধ্যমে এক বার্তায় লেখেন, “নেপালি কংগ্রেসের সভাপতি ও প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শের বাহাদুর দেউবা আসন্ন হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন না।”
গত কয়েক মাসে একের পর এক রাজনৈতিক ধাক্কাই দেউবাকে এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তিনি আর নেপালি কংগ্রেসের সভাপতি পদে পুনর্নির্বাচিত হতে পারতেন না, তবু আরও একবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা তিনি ধরে রেখেছিলেন।
২০২৪ সালে নেপালি কংগ্রেস (এনসি) ও কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউএমএল)-এর মধ্যে কে পি শর্মা ওলির নেতৃত্বে সরকার গঠনের যে সমঝোতা হয়েছিল, তা কার্যকর হলে দেউবা ষষ্ঠবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ পেতে পারতেন। ওই চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৭ সালের নির্ধারিত সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে ওলি ও দেউবা প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করার কথা ছিল। তবে গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে জেন-জি আন্দোলনের জেরে ওলি সরকার পতন হওয়ায় দেউবার সেই স্বপ্ন বড় ধাক্কা খায়।
৭৯ বছর বয়সি এই নেতার জন্য আরেকটি বড় ধাক্কা আসে চলতি বছরের জানুয়ারির শুরুতে। দেউবার আপত্তি সত্ত্বেও বিশেষ সাধারণ সম্মেলনের মাধ্যমে নেপালি কংগ্রেসে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচিত হয়, যেখানে গগন থাপা দলের হাল ধরেন। নির্বাচন কমিশন থাপা নেতৃত্বাধীন কমিটিকে স্বীকৃতি দেওয়ায় দেউবা ও তাঁর অনুগামীরা কার্যত কোণঠাসা হয়ে পড়েন। সুপ্রিম কোর্টই তখন তাঁদের শেষ ভরসা হয়ে ওঠে।
এরই মধ্যে একাধিক দেউবা-ঘনিষ্ঠ নেতা থাপার শিবিরে যোগ দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। শেষ পর্যন্ত দেউবার সচিবালয় জানায়, তিনি আর কোনও নির্বাচনে লড়বেন না।
উল্লেখযোগ্যভাবে, থাপার নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটি দেউবার দীর্ঘদিনের কেন্দ্র থেকে দেউবা-ঘনিষ্ঠ নাইন সিং মহারকে প্রার্থী করেছে। এতে দেউবা অনুগামীদের একাংশকে সঙ্গে রাখার চেষ্টা স্পষ্ট বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
১৯৯০ সালে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর ১৯৯১ সালের নির্বাচন থেকে টানা সংসদ সদস্য ছিলেন শের বাহাদুর দেউবা। তিনি সাতবার নির্বাচিত হন এবং পাঁচবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন—১৯৯৫, ২০০১, ২০০৪, ২০১৭ ও ২০২১ সালে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের শেষে এসে দেউবার নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেপালি কংগ্রেসে সম্ভাব্য ভাঙন এড়াতে সহায়ক হয়েছে বলেও মত পর্যবেক্ষকদের। তবে এর মধ্য দিয়েই কার্যত জাতীয় রাজনীতি থেকে তাঁর সক্রিয় অধ্যায়ের ইতি ঘটল।
কে পি শর্মা ওলি এবং পুষ্প কমল দাহাল ‘প্রচণ্ড’-এর সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে নেপালের রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী মুখ ছিলেন দেউবা। জেন-জি আন্দোলনের চাপে দেশের তিন প্রধান রাজনৈতিক দলের প্রবীণ নেতৃত্বের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও, নিজ দলের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ সামাল দিতে ব্যর্থ হলেন দেউবা।
ওলি যেখানে নিজের দলে নেতৃত্ব ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন, সেখানে প্রচণ্ড বাম দলগুলিকে একত্রিত করে নিজের অবস্থান মজবুত করার চেষ্টা করছেন। এই প্রেক্ষাপটে, দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করা নেতাদের প্রতি ভোটারদের আস্থা কতটা থাকবে, সেই প্রশ্নই এখন নেপালের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা।

