দিল্লিতে সংক্ষিপ্ত সফরে ব্যাপক জল্পনা, সন্ত্রাসবাদ ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় ঐকমত্যে পৌঁছাল ভারত–সংযুক্ত আরব আমিরশাহি

নয়াদিল্লি, ২০ জানুয়ারি: তিনি এলেন, আলোড়ন তৈরি করলেন, আর চলে গেলেন—সংযুক্ত আরব আমিরশাহির (ইউএই) রাষ্ট্রপতি শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের (এমবিজেড) দিল্লি সফরকে এভাবেই ব্যাখ্যা করছেন সামাজিক মাধ্যমের একাংশ। সোমবার সন্ধ্যায় নয়াদিল্লিতে এসে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ফিরে যাওয়ায় এই সফর ঘিরে জোরদার জল্পনা শুরু হয়।

সোমবার সন্ধ্যায় দিল্লিতে অবতরণ করেন ইউএই রাষ্ট্রপতি। বিভিন্ন সূত্রে দাবি, তাঁর সফরের সময়সীমা ছিল মাত্র এক ঘণ্টা ৪৫ মিনিট থেকে সর্বোচ্চ তিন ঘণ্টা। এই অতি সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি এবং সঙ্গে ছিলেন ইউএই-এর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী। এত স্বল্প সময়ে এত উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সফর ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে উদ্দেশ্য ও তাড়াহুড়োর কারণ নিয়ে।

তবে পরে ভারত ও ইউএই-এর যৌথ বিবৃতিতে স্পষ্ট করা হয়, এই সফর কোনওভাবেই আকস্মিক বা অপরিকল্পিত নয়। প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণেই এই সফর হয়েছে বলে জানানো হয়। যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, বৈঠকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও সমঝোতায় পৌঁছানো হয়েছে, যা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হঠাৎ করে সম্ভব নয়।

যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং রাষ্ট্রপতি শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান সন্ত্রাসবাদের সব রকম রূপ ও প্রকাশের বিরুদ্ধে তাঁদের দ্ব্যর্থহীন নিন্দা পুনর্ব্যক্ত করেছেন, যার মধ্যে সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদও অন্তর্ভুক্ত। তাঁরা একমত হন যে, কোনও দেশই সন্ত্রাসে অর্থ জোগানো, পরিকল্পনা করা বা আশ্রয় দেওয়ার কাজ করতে পারে না।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সন্ত্রাসে অর্থায়ন রুখতে ফিনান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্স-এর কাঠামোর মধ্যে সহযোগিতা আরও জোরদার করা হবে এবং মানি লন্ডারিং বিরোধী ব্যবস্থাও শক্তিশালী করা হবে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় একাধিক ব্যবহারকারী সফরটির অস্বাভাবিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এক্স (পূর্বতন টুইটার)-এ এক ব্যবহারকারী লেখেন, “রাষ্ট্রপ্রধানের সফর সাধারণত একদিন বা তার বেশি হয়। কিন্তু ইউএই প্রেসিডেন্ট গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীদের নিয়ে এসে মাত্র কয়েক ঘণ্টায় চলে গেলেন। বিষয়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও জরুরি বলে মনে হচ্ছে।”

আরেকজন লেখেন, “মাত্র দুই ঘণ্টার সফরের জন্য এমবিজেড প্রায় ইউএই-এর সব গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বকে নিয়ে এসেছিলেন। নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘটেছে।”

প্রধানমন্ত্রী দফতরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, এটি গত দশ বছরে শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের পঞ্চম ভারত সফর এবং রাষ্ট্রপতি হিসেবে তৃতীয় সরকারি সফর। বৈঠকে দুই নেতা ভারত–ইউএই বিস্তৃত কৌশলগত অংশীদারিত্বের পূর্ণ পরিসর পর্যালোচনা করেন এবং গত এক দশকে এই সম্পর্ক আরও মজবুত হয়েছে বলে উল্লেখ করেন।

বৈঠকে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতাকে এই অংশীদারিত্বের অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। কৌশলগত প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বের দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য একটি ‘লেটার অব ইনটেন্ট’ স্বাক্ষরকে স্বাগত জানান দুই নেতা।

এছাড়াও দ্বিপাক্ষিক অসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা, হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন লিমিটেড ও আবু ধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি গ্যাস-এর মধ্যে গ্যাস ক্রয়-বিক্রয় সংক্রান্ত চুক্তি-সহ একাধিক সমঝোতা স্মারক ও চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বৈঠকের মোট ১২টি গুরুত্বপূর্ণ ফলাফলের তালিকাও প্রকাশ করেন।

এই সফর এমন এক সময়ে হল, যখন ইউএই ও সৌদি আরবের মধ্যে সম্পর্ক কিছুটা টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি সৌদি আরব পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যেখানে এক দেশের উপর আক্রমণকে উভয়ের বিরুদ্ধে আগ্রাসন হিসেবে গণ্য করার কথা বলা হয়েছে।

এদিকে সোমবার সৌদি সমর্থিত ইয়েমেনি সরকার ইউএই-এর বিরুদ্ধে ইয়েমেনের মুকাল্লা বন্দরের কাছে একটি গোপন কারাগার চালানোর অভিযোগ তোলে, যদিও আবু ধাবি সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এই ঘটনা উপসাগরীয় দুই তেলসমৃদ্ধ দেশের মধ্যে বিদ্যমান মতবিরোধ আরও উসকে দিয়েছে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।

বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রী মোদি ইউএই প্রতিনিধিদলের সঙ্গে একটি ছবি শেয়ার করে বলেন, তিনি ইউএই-এর ক্রাউন প্রিন্স ও শীর্ষ নেতৃত্বকে ভারতে পেয়ে আনন্দিত। অন্যদিকে, দিল্লি ছাড়ার আগে এমবিজেড এক্স-এ পোস্ট করে জানান, প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে সাক্ষাতে তিনি ভারত–ইউএই-এর ঐতিহাসিক ও গভীর সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করার সুযোগ নিয়ে আলোচনা করেছেন।

তিনি লেখেন, “টেকসই উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে ইউএই ও ভারত ভবিষ্যতমুখী ক্ষেত্রগুলিতে একসঙ্গে কাজ চালিয়ে যাবে, যা দুই দেশের জনগণের পারস্পরিক কল্যাণ নিশ্চিত করবে।”

Leave a Reply