চেন্নাই, ২০ জানুয়ারি:
তামিলনাড়ুর রাজ্যপাল আর এন রবি মঙ্গলবার জাতীয় সঙ্গীতের ‘অবমাননা’র অভিযোগ তুলে রাজ্য সরকারের প্রস্তুত করা প্রথাগত ভাষণ পাঠ করতে অস্বীকার করেন এবং শীতকালীন অধিবেশনের প্রথম দিনেই বিধানসভা ত্যাগ করেন। টানা তৃতীয় বছরের মতো রাজ্যপালের এই পদক্ষেপে শাসক দ্রাবিড় মুনেত্র কাজাগাম (ডিএমকে)-র সঙ্গে নতুন করে সংঘাত তীব্র হয়েছে।
এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্টালিন সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান, যাতে বছরের শুরুতে রাজ্যপালের প্রথাগত ভাষণ দেওয়ার প্রথা বাতিল করা যায়। তিনি অভিযোগ করেন, রাজ্যপাল তামিলনাড়ুর জনগণকে অপমান করেছেন। পাশাপাশি বিধানসভায় একটি প্রস্তাব এনে ঘোষণা করা হয়, রাজ্যপালের ইংরেজি ভাষণের পাঠ সম্পন্ন হয়েছে বলে তা নথিভুক্ত করা হবে।
২০২১ সালের মে মাসে আর এন রবি রাজ্যপাল নিযুক্ত হওয়ার পর থেকেই তাঁর সঙ্গে ডিএমকে সরকারের সম্পর্ক টানাপোড়েনের। ২০২২ সালে তিনি প্রথাগত ভাষণ পাঠ করলেও, ২০২৩ সালে ভাষণের কিছু অংশ বাদ দিয়ে নিজের মন্তব্য যোগ করেন। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে তিনি ভাষণ না পড়েই বিধানসভা ত্যাগ করেন।
ডিএমকে অভিযোগ করেছে, বিজেপি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্র সরকার ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করতে চাইছে এবং অ-বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলির কাজে হস্তক্ষেপ করতে রাজ্যপালদের ব্যবহার করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, চলতি বছরই তামিলনাড়ুতে বিধানসভা নির্বাচন হওয়ার কথা।
রাজ্যপালের দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, ভাষণ না পড়া ও সভা ত্যাগের পিছনে মোট ১২টি কারণ রয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, “জাতীয় সঙ্গীতকে বারবার অপমান করা হয়েছে এবং মৌলিক সাংবিধানিক দায়িত্ব উপেক্ষিত হয়েছে।”
তামিলনাড়ুতে বিধানসভার শুরুতে রাজ্য সঙ্গীত ‘তামিল থাই ভাজ্তু’ এবং অধিবেশনের শেষে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের প্রথা রয়েছে। তবে ২০২৫ সাল থেকে রাজ্যপাল অধিবেশনের শুরুতেও জাতীয় সঙ্গীত বাজানোর দাবি জানিয়ে আসছেন।
রাজ্যপালের দপ্তরের অভিযোগ, তাঁর বক্তব্য দেওয়ার সময় বারবার মাইক্রোফোন বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং তাঁকে কথা বলতে দেওয়া হয়নি। পাশাপাশি তিনি যে ভাষণ পড়তে অস্বীকার করেছেন, তাতে অসত্য ও বিভ্রান্তিকর দাবি রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। বিবৃতিতে নারীদের নিরাপত্তা, মাদক সমস্যা, দলিতদের উপর হামলা এবং শিক্ষার মানের অবনতির বিষয়গুলি উপেক্ষিত হয়েছে বলে অভিযোগ তোলা হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, “১২ লক্ষ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ এসেছে—এই দাবি সত্য থেকে বহু দূরে।” এছাড়া প্রাচীন মন্দির সংরক্ষণ সংক্রান্ত উচ্চ আদালতের নির্দেশ পাঁচ বছর পরেও কার্যকর না হওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। বহু মন্দিরে ট্রাস্টি বোর্ড নেই এবং সরাসরি রাজ্য সরকারের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে বলেও দাবি করা হয়েছে। “লক্ষ লক্ষ ভক্ত মন্দির পরিচালনার অব্যবস্থায় আহত ও ক্ষুব্ধ,” বলা হয় বিবৃতিতে।
রাজ্যপাল সভা ত্যাগ করার পর স্পিকার এম আপ্পাভু তামিল ভাষায় ভাষণ পাঠ করেন। সেখানে বিজেপি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্র সরকারের বিরুদ্ধে তামিলনাড়ুর প্রাপ্য অর্থ আটকে রাখার অভিযোগ তোলা হয়। ভাষণে বলা হয়, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে অনুমোদন ও অর্থ বরাদ্দ না দেওয়ার মাধ্যমে কেন্দ্র রাজ্যের প্রতি বিরূপ মনোভাব দেখাচ্ছে।
ঘূর্ণিঝড় ‘মিচং’ ও ‘ফেঙ্গাল’-এর মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় কেন্দ্রের তরফে অপ্রতুল সাহায্য পাওয়ার কথাও ভাষণে উল্লেখ করা হয়। সমগ্র শিক্ষা অভিযানের আওতায় বরাদ্দকৃত ৩,৫৪৮ কোটি টাকা না পাওয়ায় রাজ্য সরকারকেই সম্পূর্ণ ব্যয় বহন করতে হয়েছে বলে জানানো হয়।
ভাষণে কেন্দ্রের VB-G-RAM-G প্রকল্প প্রত্যাহার করে মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা প্রকল্প চালু রাখার দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে তিন ভাষা নীতি মানা হবে না এবং হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার বিরোধিতার কথাও পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
মুখ্যমন্ত্রী স্টালিন বলেন, প্রতি বছর সরকার ভাষণ প্রস্তুত করলেও রাজ্যপাল তা না পড়েই বিরোধিতা করছেন, যা কাম্য নয়। তাঁর কথায়, “শুধু তামিলনাড়ুতেই নয়, বহু রাজ্যে রাজ্যপালরা নির্বাচিত সরকারের কাজে বাধা সৃষ্টি করছেন। বছরের শুরুতে সরকারের নীতিগত ভাষণ পাঠ করা রাজ্যপালের দায়িত্ব। কেউ যখন বারবার সেই রীতি লঙ্ঘন করেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—এই নিয়ম রাখার প্রয়োজন কী?”

