গাজা , ১৪ সেপ্টেম্বর : ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইজরায়েলি সামরিক বাহিনীর চালানো বোমাবর্ষণে ফের রক্তাক্ত হয়েছে গাজা সিটি। শনিবার, গাজা সিটির বিভিন্ন এলাকায় চালানো একের পর এক বিমান হামলায় অন্তত ৩২ জন নিহত হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ১২ জন শিশু। স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, শিফা হাসপাতালে আনা মৃতদেহগুলোর মধ্যে এক পরিবারের ১০ সদস্য রয়েছেন, যাদের মধ্যে ছিলেন মা ও তার তিন শিশু সন্তান। গাজার শেখ রাদওয়ান এলাকায় একটি বাড়ি লক্ষ্য করে চালানো এক হামলায় এই প্রাণহানি ঘটে। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন আল-হেলাল স্পোর্টিং ক্লাবের ফুটবলার মোহাম্মদ রামেজ সুলতান, যিনি তার পরিবারের আরও ১৪ সদস্যসহ নিহত হন। ইজরায়েলি বাহিনী জানিয়েছে, তারা হামাসের গোপন ঘাঁটি লক্ষ্য করে অভিযান চালাচ্ছে এবং হামাস নিয়ন্ত্রিত হাই-রাইজ ভবনগুলিতে নজরদারি সরঞ্জাম থাকার প্রমাণও তারা পেয়েছে। তবে, বেসামরিক প্রাণহানির বিষয়ে ইজরায়েল এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
গাজা থেকে মানুষজনকে দক্ষিণে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিলেও বাস্তবে অনেকেই এখনও গাজা সিটিতেই আটকে রয়েছেন। জাতিসংঘের মতে, আগস্টের মাঝামাঝি থেকে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রায় ১ লক্ষ মানুষ গাজা সিটি ত্যাগ করেছেন, যদিও ইজরায়েলি বাহিনী দাবি করেছে এই সংখ্যা প্রায় ২.৫ লক্ষ। বাস্তুচ্যুতদের জন্য আশ্রয়স্থল গঠনের উদ্যোগে জাতিসংঘের পাঠানো ৮৬,০০০-এরও বেশি তাঁবু ও ত্রাণসামগ্রী এখনো গাজার প্রবেশপথে আটকে রয়েছে। ফলে, যারা স্থানান্তরিত হতে পারছেন, তাদের আশ্রয় পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এদিকে, গত ২৪ ঘণ্টায় গাজায় অপুষ্টিজনিত কারণে আরও সাতজনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে শিশুও রয়েছে। এ নিয়ে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এমন মৃত্যু হয়েছে মোট ৪২০ জনের, যার মধ্যে শিশু ১৪৫ জন।
ইজরায়েলের এই আক্রমণের প্রতিবাদে তেল আভিভে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন হামাসের হাতে বন্দি থাকা ইজরায়েলি নাগরিকদের পরিবারের সদস্যরা। তারা দাবি করেছেন, প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর কৌশল পুরোপুরি ব্যর্থ এবং তাঁর আক্রমণাত্মক অবস্থান তাদের আপনজনদের জীবন বিপন্ন করে তুলছে। বন্দি এক যুবক মাতান জাংগাউকরের মা বলেন, “প্রতিবার আলোচনায় অগ্রগতি হলে নেতানিয়াহু কাউকে বোমা মারেন। এবারও তিনি আশার উপরেই আঘাত হেনেছেন।” এদিকে, গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মতে, গত ১১ মাসে ইজরায়েলি অভিযানে গাজায় নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে কমপক্ষে ৬৪,৮০৩ জনে, যার মধ্যে প্রায় অর্ধেকই নারী ও শিশু। গাজার অধিকাংশ শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, এবং প্রায় ৯০% জনগণ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
অক্টোবর ৭, ২০২৩ তারিখে হামাসের নেতৃত্বাধীন জঙ্গিরা ইজরায়েলে ঢুকে ১,২০০ জনকে হত্যা করে এবং ২৫১ জনকে অপহরণ করে, যার প্রতিশোধ নিতে ইজরায়েল গাজায় এই ধারাবাহিক সামরিক অভিযান শুরু করে। বর্তমানে গাজা সিটি ইজরায়েলের প্রধান লক্ষ্য, এবং সেখানকার বাসিন্দাদের দ্রুত দক্ষিণে চলে যাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে অনেকেই বারবার স্থানচ্যুতি ও নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবে থেকে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। জাতিসংঘ এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই ব্যাপারে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং বলেছে, এমন অব্যাহত আক্রমণ মানবিক বিপর্যয় আরও গভীর করবে।
এই ঘটনা আজ বিশ্ববাসীকে একটি কঠিন বার্তা দিচ্ছে— সামরিক সংঘাত একদিকে যেমন হাজারো প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে, অন্যদিকে মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে করে তুলছে চরম অনিশ্চিত ও নিরাপত্তাহীন। আন্তর্জাতিক মহলের জরুরি হস্তক্ষেপ ছাড়া, এই মানবিক সংকটের সমাধান যে শীঘ্র আসছে না, তা বলাই বাহুল্য।

