মালদ্বীপে মোদীকে উষ্ণ অভ্যর্থনা, ভারত-মালদ্বীপ সম্পর্কের নতুন সূচনা

নয়াদিল্লি, ২৭ জুলাই : মালদ্বীপে ভারতের প্রতি কিছুটা বৈরী মনোভাব দেখা দেওয়ার পরেও, সম্প্রতি রাষ্ট্রপতি মুইজ্জুর প্রোটোকল ভেঙে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে তার আগমনে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো ভারতের কূটনৈতিক সাফল্যের একটি বড় উদাহরণ হয়ে উঠেছে। ২০২৩ সালে মালদ্বীপে ‘ইন্ডিয়া আউট’ স্লোগান এবং ভারতবিরোধী রাজনৈতিক বাতাবরণ সত্ত্বেও, এই ঘটনা দিল্লী-মালে সম্পর্কের একটি নতুন যুগের সূচনা করেছে।

বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি কেবল একটি শীতল সম্পর্কের মেটামরফোসিসই নয়, বরং ভারতের কূটনৈতিক বিচক্ষণতার প্রমাণ, যা সত্ত্বেও কোনো সংকট বা সংঘর্ষের মুখে মালদ্বীপকে প্রতিনিয়ত সমর্থন দিয়ে গেছে। ভারতের সমর্থন এবং সহায়তা, বিশেষ করে অর্থনৈতিক, অবকাঠামো এবং সামরিক সহায়তার মাধ্যমে এই সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি দৃশ্যমান চিত্র তৈরি হচ্ছে।

মুইজ্জু-সোলিহ দ্বন্দ্ব এবং প্রথম দিককার ভারতবিরোধী মনোভাব
প্রায় দুই বছর আগে, যখন মোহাম্মদ মুইজ্জু মালদ্বীভিয়ান ডেমোক্রেটিক পার্টির (এমডিপি) ইব্রাহিম মোহাম্মদ সোলিহকে পরাজিত করে মালদ্বীপের রাষ্ট্রপতি হন, তখন ভারতের প্রতি তার মনোভাব ছিল অত্যন্ত সংশয়ের। এই সময়েই ‘ইন্ডিয়া আউট’ আন্দোলন বেশ জোরালো হয়ে উঠেছিল, যার উদ্দেশ্য ছিল ভারতের প্রভাব কমানো এবং দেশটি থেকে ভারতীয় সামরিক উপস্থিতি প্রত্যাহার করা। মুইজ্জু, তখনকার সরকারের বিরুদ্ধে এই আন্দোলনে একত্রিত হয়েছিলেন, যা নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্কের নতুন সংকট তৈরি করেছিল।

সেই সময়ের পরিস্থিতি এমন ছিল যে, ভারতের সঙ্গ সম্পর্ক সুদৃঢ় করা প্রায় অসম্ভব মনে হচ্ছিল। কিন্তু, বর্তমান সময়ের ঘটনাগুলির দিকে লক্ষ্য করলে, এই সম্পর্কের পুনর্গঠন এবং মুইজ্জুর ভূমিকা রীতিমত চমকপ্রদ এবং তা ভারতের কূটনৈতিক দক্ষতার এক নতুন উদাহরণ।

মুইজ্জুর চীনের দিকে ঝোঁকাও দিল্লীর উদ্বেগের অন্যতম কারণ ছিল। ২০২৩ সালে, তিনি মালদ্বীপে চীনা প্রভাব বাড়ানোর জন্য একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন, যা ভারতের কৌশলগত স্বার্থের জন্য হুমকিস্বরূপ ছিল। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে চীনে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সফর করেন এবং সেখানে চীনের সাথে ২০টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেন। মালদ্বীপের জন্য, এই সম্পর্কের গভীরতা ছিল গুরুত্বপূর্ণ, কারণ চীন মালদ্বীপে “অ-মারাত্মক” অস্ত্র সরবরাহ করতে সম্মত হয়েছিল এবং সৈন্যদের প্রশিক্ষণ প্রদান করেছিল—যা ভারতীয় কৌশলগত অবস্থানকে দুর্বল করার একটি প্রয়াস ছিল।

এছাড়া, চীনের সাথে সম্পর্ক স্থাপন, মালদ্বীপের অর্থনৈতিক অবস্থা এবং সামরিক উপস্থিতি বিষয়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ আরও বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। মুইজ্জু সরকারের চীনের প্রতি বাড়তি ঝোঁক সম্পর্কের বিষাক্ততায় আরও এক নতুন মাত্রা যোগ করেছিল।

তবে, ভারত কূটনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে থেকেও মালদ্বীপকে সমর্থন জুগিয়েছে এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নয়নকে অব্যাহত রেখেছে। ২০২৩ সালের শেষের দিকে, ভারত মালদ্বীপের ৪০৯ মিলিয়ন ডলার ঋণ মওকুফের জন্য একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করে, যা তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে থাকা মালদ্বীপের জন্য একটি বড় সহায়তা ছিল।

এছাড়া, ভারত মালদ্বীপকে তার আর্থিক সংকট মোকাবেলা করতে সাহায্য করেছে। ২০২৪ সালের মে মাসে, ভারত স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া (এসবিআই)-এর মাধ্যমে ৫০ মিলিয়ন ডলারের ট্রেজারি বিল এক বছরের জন্য রোলওভার করে এবং দেশটির জন্য বাজেট সহায়তা বাড়ায়। এরপর, অক্টোবর মাসে ভারত ৪০০ মিলিয়ন ডলারের জরুরি আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণা করে এবং ৩,০০০ কোটি টাকা (প্রায় ৩৬০ মিলিয়ন ডলার) মুদ্রা বিনিময় চুক্তি করেছিল, যা মালদ্বীপের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি শোধরাতে কার্যকর প্রমাণিত হয়।

একদিকে, ভারতের লাক্ষাদ্বীপের বিকল্প পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে প্রচার মালদ্বীপের জন্য একটি উদ্বেগের বিষয় হয়ে ওঠে। গত বছর প্রধানমন্ত্রী মোদী লাক্ষাদ্বীপের একটি সৈকত থেকে তার ছবি পোস্ট করেছিলেন, যা মালদ্বীপের পর্যটন খাতের জন্য হুমকিস্বরূপ মনে হয়েছিল। তবে, এই প্রচারের পরও, ভারতের অভ্যন্তরে ভারতীয় সেলিব্রিটিদের সামাজিক মাধ্যমের পোস্ট এবং অন্যান্য পর্যটকদের মাধ্যমে মালদ্বীপের জনপ্রিয়তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।

মালদ্বীপে ভারত সরকারের অবকাঠামো সহায়তা একাধিক প্রকল্পের মাধ্যমে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো গ্রেটার মালে কানেক্টিভিটি প্রজেক্ট, যার আওতায় ৫০০ মিলিয়ন ডলারের একটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে, মালে শহরের সাথে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী দ্বীপ—ভিলিঙ্গিলি, গুলহিফালহু, এবং থিলাফুশির—এর সংযোগ স্থাপন করা হচ্ছে, যা ৬.৭৪ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতু এবং কজওয়ে নেটওয়ার্ক নির্মাণের মাধ্যমে কার্যকর হবে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে, মালদ্বীপের প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যার জন্য উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি হবে।

এছাড়া, ভারত মালদ্বীপে আবাসন, স্যানিটেশন, পরিচ্ছন্ন শক্তি স্থাপন এবং অন্যান্য উন্নয়নমূলক প্রকল্পে ব্যাপক সহায়তা প্রদান করেছে, যা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করেছে।

মালদ্বীপের রাষ্ট্রপতি মুইজ্জুর ভারতবিরোধী মনোভাব সত্ত্বেও, ভারত তার কূটনীতির মাধ্যমে সম্পর্ক পুনর্গঠনে সফল হয়েছে। ভারতের ধারাবাহিক আর্থিক সহায়তা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং অন্যান্য সাহায্য মালদ্বীপের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে সহায়ক হয়েছে। মালদ্বীপের চীনের দিকে ঝুঁকানো সত্ত্বেও, ভারত তার শান্ত ও প্রভাবশালী কূটনীতির মাধ্যমে সম্পর্কের উন্নয়ন নিশ্চিত করেছে।

এখন, দু’দেশের সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে, যেখানে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে রাজনৈতিক স্রোত আবারও পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী মোদীর মালদ্বীপ সফরের উষ্ণ অভ্যর্থনা, ভারতীয় সহায়তার অবিচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতা এবং কৌশলগত সম্পর্কের উন্নয়ন আগামী দিনে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা যাচ্ছে।