নয়াদিল্লি, ২২ জুন : ইরানে মার্কিন বোমাবর্ষণের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে পাঁচটি বাম দল। কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া (মার্কসবাদী), কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া, কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী লিবারেশন), রেভল্যুশনারি সোশ্যালিস্ট পার্টি এবং ফরওয়ার্ড ব্লক—এই পাঁচটি বাম দল এক যৌথ বিবৃতিতে মার্কিন হামলার নিন্দা জানিয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মার্কিন হামলা ইরানের সার্বভৌমত্ব এবং আন্তর্জাতিক আইন, বিশেষত রাষ্ট্রপুঞ্জ সনদের মারাত্মক লঙ্ঘন। তাদের মতে, এই হামলার ফলে বিশ্বজুড়ে উত্তেজনা বাড়বে, পশ্চিম এশিয়ায় অস্থিরতা সৃষ্টি হবে এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতির উপর গভীর প্রভাব পড়বে। বাম দলগুলোর দাবি, ইরানকে লক্ষ্য করে এই আগ্রাসন মূলত বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের অংশ হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে।
বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, আমেরিকা এবং ইজরায়েল দাবি করেছে যে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দ্বারপ্রান্তে ছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি ১৯ জুন স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, “আমরা ইরান কর্তৃক পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে কোনো সংগঠিত প্রচেষ্টার প্রমাণ পাইনি।” এমনকি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলিও ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে—এমন কোনো চূড়ান্ত তথ্য জানাতে ব্যর্থ হয়েছে। এর পাশাপাশি, ইরান এখনো পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির স্বাক্ষরকারী দেশ, যা ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচির প্রতি আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে।
এই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে ১২ জুন ইজরায়েল ইরানে হামলা চালিয়েছিল, যা ইরান-আমেরিকা আলোচনার সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করেছিল। এই হামলার পর, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দু’সপ্তাহের জন্য আলোচনার সময় নির্ধারণ করেছিলেন, কিন্তু একই সময়ে আমেরিকা এবং ইজরায়েল একযোগে এই আগ্রাসনে অংশ নেয়। বাম দলগুলির দাবি, আমেরিকা-ইজরায়েল জোট তাদের নিজস্ব গোয়েন্দা তথ্য বা কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার কোনো গুরুত্ব না দিয়ে ইরান ও পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ চাপিয়ে দিতে চাইছে।
এই হামলার আসল উদ্দেশ্য, তাদের মতে, ইরানকে ধ্বংস করা, পশ্চিম এশিয়ায় সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা এবং বৈশ্বিক সম্পদের উপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করা। বাম দলগুলো আরো জানিয়েছে যে, এই হামলা মূলত সামরিক-শিল্প কমপ্লেক্স এবং আন্তর্জাতিক পুঁজির স্বার্থ রক্ষার জন্য।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, আমেরিকা ইরানে বি-২ স্টিলথ বম্বার ব্যবহার করে বাংকার-বাস্টার বোমা ফেলেছে—যা পূর্বে ইরাকে ‘অবিশ্বাসযোগ্য’ অভিযোগের ভিত্তিতে আগ্রাসন চালানোর পুনরাবৃত্তি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যেটি একমাত্র দেশ হিসেবে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করেছে, এখন আবার পারমাণবিক অস্ত্রের হুমকি দিচ্ছে, যা অত্যন্ত বিদ্রূপাত্মক বলে মন্তব্য করা হয়েছে।
বাম দলগুলো সতর্ক করেছে যে, এই হামলার ফলে বিশ্বশান্তি ও সাধারণ মানুষের জীবনে মারাত্মক প্রভাব পড়বে, বিশেষত ভারতসহ সেইসব দেশ, যারা পশ্চিম এশিয়ার তেল আমদানি ও অভিবাসী শ্রমের উপর নির্ভরশীল। যুদ্ধের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ, যারা এই অঞ্চলের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক সংকটের শিকার হবে।
বিবৃতিতে ভারত সরকারকে অবিলম্বে মার্কিন-ইজরায়েলপন্থী পররাষ্ট্রনীতি ত্যাগ করে যুদ্ধ বন্ধে আন্তর্জাতিক উদ্যোগে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। তাদের মতে, ভারত সরকারকে দেশের জনগণের স্বার্থে এই সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সংগঠিত করতে হবে। দেশের সকল শান্তিপ্রিয় নাগরিকদের আহ্বান জানানো হয়েছে এই হামলার নিন্দায় অংশ নিতে।
ইরানও এই হামলার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। ইরানের বিদেশ মন্ত্রণালয় এই হামলাকে “ক্রূর আক্রমণাত্মক” এবং “অন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের লঙ্ঘন” হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তারা দাবি করেছে, আমেরিকা ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়েছে, যেগুলো আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার অধীনে রয়েছে। ইরান সরকার, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ এবং আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার কাছে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছে।
ইরান আরও অভিযোগ করেছে যে, আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা পক্ষপাতিত্ব করছে এবং যুদ্ধউন্মাদ দেশের পক্ষে কাজ করছে। তারা সতর্ক করেছে যে, এই হামলার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিরবতা এক বিপজ্জনক নজির তৈরি করবে এবং এটি বৈশ্বিক আইন এবং কূটনীতির প্রতি অবমাননা হিসেবে গণ্য হবে।
আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা জানিয়েছে, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে মার্কিন হামলার পর কোনো ধরনের বিকিরণ বৃদ্ধির প্রমাণ তারা পায়নি। তবে সংস্থাটি জানিয়েছে, এ বিষয়ে আরও তথ্য পাওয়া গেলে পরবর্তী মূল্যায়ন করা হবে।
ইরানের পরমাণু শক্তি সংস্থা জানিয়েছে, তাদের সকল পরমাণু স্থাপনা নিরাপদ এবং বিজ্ঞানীরা কাজ চালিয়ে যাবেন। তারা এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ারও সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এছাড়া, ইরান দাবি করেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ফোর্ডো, নতাঞ্জ ও এসফাহান পরমাণু স্থাপনাগুলোর উপর হামলা চালিয়েছে। ইরান সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই হামলা আন্তর্জাতিক আইনের মারাত্মক লঙ্ঘন, এবং এর ফলে ইরানের পরমাণু শক্তি কর্মসূচির কোনও ক্ষতি হয়নি।
ইরান আরও ঘোষণা করেছে যে, তারা এই হামলার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে লড়বে এবং কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
এই ঘটনাটি বিশ্বব্যাপী পরমাণু নিরাপত্তা এবং কূটনৈতিক সমঝোতার প্রশ্ন উত্থাপন করেছে, এবং এটি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের দাবি করেছে।
2025-06-22

