করিমগঞ্জ (অসম), ১৩ সেপ্টেম্বর (হি.স.) : মাদক-হাট, দুর্নীতি, দুষ্কৃতীদের আখড়ায় পরিণত হয়েছে করিমগঞ্জ জেলা কারাগার। টাকা দিলেই মেলে জামাই আদর। হেরোইন, ব্রাউন সুগার, ইয়াবা, গাঁজা সহ নানা ধরনের মাদক ও মদের অবাধ কারবার চলে কারাগারের ভিতরে। ড্রাগস সেবনের পাশাপাশি কারাগারের ভেতরে রাত জেগে বসে জুয়ার আসরও। কারাগারে বন্দি হাজতবাসীদের আত্মীয়স্বজনরা দেখা করতে আসলে দিতে হয় নগদ টাকা। জুয়া খেলায় সাহায্য সহ ড্রাগস সরবরাহের সাথে জড়িত কারাগারের একাংশ কর্মী। করিমগঞ্জ জেলা কারাগারের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এতদিন কেউ এ ব্যাপারে মুখ না খুললেও এবার এ সব ঘটনার বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন সম্প্রতি জামিন-প্রাপ্ত জনৈক ব্যক্তি।
কারাগারের সংগঠিত নানা ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতি এবং মাদক ও জুয়ার আড্ডার তথ্য তুলে ধরেছেন করিমগঞ্জের ময়না মিয়াঁ। ক্ষোভ প্রকাশ করে ময়না বলেন, জেলা কারাগার দিন দিন অনিরাপদ হয়ে উঠছে। একাংশ কারাকর্মীদের সহযোগিতায় মাদকের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। টাকার বিনিময়ে সরবরাহ করা হয় মদ, গাঁজা, হেরোইন ও ইয়াবা।
ঘটনার বিবরণ দিয়ে তিনি বলেন, কয়েকমাস আগে প্রতিবেশীর চক্রান্তমূলক এক মামলায় তিনি নিজে এবং তার ছেলে আলতাফ হোসেনকে হাজতবাস করতে হয় বেশ কয়েকদিন। কিন্তু এই কয়েকদিনের মধ্যে তাদের দুজনকেই নানাভাবে অত্যাচার করা হয় কারাগারের ভিতরে।
দীর্ঘ কয়েকবছর ধরে কারারুদ্ধ কয়েদিদের হাতে নানাভাবে শারীরিক হয়রানির শসিকার হতে হয়েছে তাদের দুজনকে। এমন-কি নগদ এক লক্ষ টাকা দেওয়া না হলে প্রাণে মারার হুমকি পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে তাকে। এ সম্পর্কে বারকয়েক জেলসুপারকে নালিশ জানিয়েও কোনো লাভ হয়নি তাদের। বাধ্য হয়ে অত্যাচার থেকে বাঁচতে ২০ হাজার টাকা দিয়েছেন কয়েক বছর থেকে হাজতবাসী জনৈক কয়েদিকে।
ময়না মিয়াঁ বলেন, বাইরে থেকে কিছু বোঝা না গেলেও কারাগারের ভেতরে গড়ে উঠেছে নিরাপদ মাদক ব্যবসার কেন্দ্র। বেশ কয়েক ধরনের সিন্ডিকেট রয়েছে ভিতরে। সিন্ডিকেটে কয়েদিরা যেমন আছেন, তেমনি বাইরে থেকেও অনেকে এ সব কারবার নিয়ন্ত্রণ করেন। নানা কৌশলে কারাগারে ঢোকানো হয় ইয়াবা, হোরাইন, গাঁজা ও মদ। অপকীর্তিতে জড়িত রয়েছেন কারাগারের একাংশ কর্মী।
টাকার বিনিময়ে আসামিদের নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধাও দেওয়া হয়। এমন-কি জামিনে মুক্তি পেয়ে বেরিয়ে আসার সময় নগদ টাকা দাবি করা হয়। তিনি নিজে দাবি মতো টাকা না দেওয়ায় তাকে দুঘণ্টা বসিয়ে রাখা হয়েছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষকে অভিযোগ জানিয়ে কোনো লাভ হয়নি।
এ সম্পর্কে করিমগঞ্জের জেলাশাসক মৃদুল যাদব বলেন, কিছু দিন পর পর জেলা কারাগার পরিদর্শন করা হয়। কোনও কয়েদির কাছ থেকে কোনও ধরনের অভিযোগ পাওয়া যায়নি। কারাগারে যদি ড্রাগস সেবন বা সরবরাহের অভিযোগ পাওয়া যায় তা-হলে প্রশাসনিকভাবে তদন্ত করা হবে, এমন-কি তিনি নিজে সারপ্রাইজ ভিজিট করবেন। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে, বলেন জেলাশাসক।
উল্লেখ্য, কয়েকমাস আগে করিমগঞ্জ জেলা কারাগার পরিদর্শন করে গিয়েছিলেন রাজ্য আইনি সহায়তা কর্তৃপক্ষ। পরিদর্শনকালে জেলা কারাগারে পরিবেশ পরিচ্ছন্নতা, জেলবন্দিদের জন্য প্রস্তুতকৃত খাবারের মান পর্যবেক্ষণ, বন্দিদের নিরাপত্তা, তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান ব্যবস্থা ইত্যাদি বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করেন রাজ্য আইনি সহায়তা কর্তৃপক্ষ। কারাগারের অভ্যন্তরও পরিদর্শন করে জেল বন্দিদের খাবারের মান, আইনি বিষয়, বন্দিদের সমস্যার কথা শুনে জেল সুপারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি।
বিভিন্ন ওয়ার্ডে গিয়ে কারাবন্দিদের সাথে কথা বলে তাদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার খোঁজ-খবরও নিয়েছেন। কারাগারের বিভিন্ন অংশে অসুবিধা সমূহ পরিদর্শন করে সে সবের সমাধান সম্পর্কিত নির্দেশনা প্রদান করেছে প্রতিনিধি দল। কিন্তু সম্প্রতি জামিনে মুক্তিপ্রাপ্ত জেল ফেরত ব্যক্তির একাধিক অভিযোগে নানা প্রশ্ন উঠছে। প্রশ্ন উঠছে জেল সুপারের ভূমিকায়ও।

